ইসলামে জাকাত একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ইবাদত, যা সমাজে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকা রাখে। ধনী ও সচ্ছল মানুষের সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত মানুষের জন্য নির্ধারিত—এটাই জাকাতের মূল দর্শন। এর মাধ্যমে সম্পদ শুধু ধনীদের হাতেই সীমাবদ্ধ না থেকে সমাজের বিভিন্ন স্তরে সুষমভাবে বণ্টিত হয়। একই সঙ্গে জাকাত মানুষের সম্পদকে পবিত্র করে এবং তার হৃদয়ে মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত করে।
অনেক সময় কোনো ব্যক্তি ঋণগ্রস্ত অবস্থায় থাকতে পারেন। তখন জাকাত আদায় নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি বিশেষভাবে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। ইসলামের বিধান অনুযায়ী ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জাকাত আদায়ের বিষয়টি বোঝা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়ক।
ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জাকাতের বিধান
জাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির প্রথম দায়িত্ব হলো তার ঋণ পরিশোধ করা। ঋণ পরিশোধের পর যদি তার কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ অবশিষ্ট থাকে, তবে সেই সম্পদের ওপর জাকাত আদায় করতে হবে। সাহাবি হজরত উসমান (রা.) রমজান মাসে জাকাত প্রসঙ্গে বলেন—
هَذَا شَهْرُ زَكَاتِكُمْ، فَمَنْ كَانَ عَلَيْهِ دَيْنٌ فَلْيُؤَدِّ دَيْنَهُ، حَتَّى تَحْصُلَ أَمْوَالُكُمْ فَتُزَكُّوهَا
‘এটি তোমাদের জাকাতের মাস। অতএব, কারো ওপর যদি ঋণ থাকে, তবে সে যেন প্রথমে তার ঋণ পরিশোধ করে। এরপর অবশিষ্ট সম্পদ নিসাব পরিমাণ হলে তার জাকাত আদায় করবে।’ (মুয়াত্ত্বা মালেক ৮৭৩)
তবে কেউ যদি ঋণ পরিশোধ না করে সেই সম্পদ নিজের কাছে রেখে দেয়, তাহলে তার সব জাকাতযোগ্য সম্পদের ওপর জাকাত আদায় করা ফরজ হবে। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন—
خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا
‘তাদের সম্পদ থেকে সদকাহ গ্রহণ কর, যার মাধ্যমে তুমি তাদেরকে পবিত্র করবে এবং পরিশুদ্ধ করবে।’ (সুরা আত-তওবা: আয়াত ১০৩)
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইবনু ওমর (রা.)-এর বর্ণিত এক হাদিসে বলেন—
مَنِ اسْتَفَادَ مَالًا فَلَا زَكَاةَ عَلَيْهِ حَتَّى يَحُولَ عَلَيْهِ الْحَوْلُ
‘যে ব্যক্তি কোনো সম্পদ অর্জন করে, সেই সম্পদের ওপর এক বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তার ওপর জাকাত ফরজ হবে না।’ (তিরমিজি ৬৩২)
এছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) মুআয ইবনু জাবাল (রা.)-কে ইয়ামেনে পাঠানোর সময় বলেন—
فَأَعْلِمْهُمْ أَنَّ اللَّهَ افْتَرَضَ عَلَيْهِمْ صَدَقَةً فِي أَمْوَالِهِمْ تُؤْخَذُ مِنْ أَغْنِيَائِهِمْ فَتُرَدُّ عَلَى فُقَرَائِهِمْ
‘তাদেরকে জানিয়ে দাও, আল্লাহ তাদের সম্পদের মধ্যে সদকাহ ফরজ করেছেন, যা তাদের ধনীদের কাছ থেকে নেওয়া হবে এবং দরিদ্রদের মধ্যে বণ্টন করা হবে।’ (বুখারি ১৩৯৫)
এ প্রসঙ্গে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, বৃষ্টি বা ঝর্ণার পানিতে সিক্ত জমিতে উৎপাদিত ফসলের ওপর দশ ভাগের এক ভাগ জাকাত এবং সেচের মাধ্যমে উৎপাদিত ফসলের ওপর বিশ ভাগের এক ভাগ জাকাত ওয়াজিব হয়।
فِيمَا سَقَتِ السَّمَاءُ وَالْعُيُونُ أَوْ كَانَ عَثَرِيًّا الْعُشْرُ، وَفِيمَا سُقِيَ بِالنَّضْحِ نِصْفُ الْعُشْرِ
‘যে জমি বৃষ্টি বা ঝর্ণার পানিতে সেচ পায়, তার ফসলের ওপর দশভাগের এক ভাগ; আর যে জমি কৃত্রিম সেচে সেচ দেওয়া হয়, তার ফসলের ওপর বিশভাগের এক ভাগ জাকাত।’ (বুখারি ১৪৮৩)
উল্লিখিত কুরআনের আয়াত ও হাদিসগুলো থেকে বোঝা যায়, জাকাত মূলত সম্পদের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ইবাদত। অর্থাৎ, সম্পদ নিসাব পরিমাণে পৌঁছালে জাকাত ওয়াজিব হয়। ব্যক্তির ঋণজনিত পরিস্থিতি এ বিধানের মূল ভিত্তি নয়।
لَيْسَ فِي مَالٍ زَكَاةٌ حَتَّى يَحُولَ عَلَيْهِ الْحَوْلُ
‘কোনো সম্পদের ওপর এক বছর অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত তাতে জাকাত নেই।’ (মুসলিম ১০৪৫)
সুতরাং ইসলামের দৃষ্টিতে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য জাকাত আদায়ের বিধান সুস্পষ্ট। প্রথমে তার দায়িত্ব হলো ঋণ পরিশোধ করা। ঋণ পরিশোধের পর যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদ অবশিষ্ট থাকে এবং তার ওপর এক বছর অতিবাহিত হয়, তাহলে সেই সম্পদের ওপর জাকাত আদায় করা ফরজ। ইসলামের এই বিধান একদিকে যেমন মানুষের আর্থিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করে, তেমনি সমাজে সম্পদের ন্যায়সঙ্গত বণ্টনের মাধ্যমে দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করে।