নিউইয়র্ক টাইমস: যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে হ্যালোইন উৎসবকে কেন্দ্র করে একের পর এক বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় অন্তত ২৪ জন নিহত এবং ৯৪ জন আহত হয়েছেন। ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ডেলাওয়্যার পর্যন্ত বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে নাইট ক্লাব, পোশাকের দোকান, স্টেডিয়ামের বাইরে এবং বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের আশপাশে এসব হামলার ঘটনা ঘটে।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাতে শুরু হওয়া এসব সহিংসতার ধারাবাহিকতা পরদিন রোববার (১ নভেম্বর) সকাল পর্যন্ত গড়ায়। উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠা মানুষের ভিড়, মদ্যপান ও মাদকের ব্যবহার এবং আগ্নেয়াস্ত্রের সহজলভ্যতা পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হ্যালোইন যুক্তরাষ্ট্রে সহিংসতার ঝুঁকি বেশি থাকা দিনগুলোর একটি। নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অপরাধবিজ্ঞানী জেমস অ্যালান ফক্সের করা এফবিআইয়ের ২০০৫ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত বোস্টনের অপরাধসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বছরের সবচেয়ে সহিংস দিনগুলোর মধ্যে ৩১ অক্টোবর তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। এ তালিকায় এর আগে রয়েছে ৪ জুলাই ও ১ জানুয়ারি। শিশু-কিশোরদের জন্য দিনটি বছরের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ফক্সের ভাষ্য, হ্যালোইনের রাতে অপ্রাপ্তবয়স্করা বাইরে বের হয় এবং অপরিচিত মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করে। এতে তাদের ঝুঁকির মধ্যে পড়ার আশঙ্কা বাড়ে।
বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে প্রাণঘাতী হামলা
ডেট্রয়েটে হ্যালোইন উদ্যাপন শেষে বাড়ি ফেরার পর পাঁচ বছর বয়সি এক শিশু নিজের বাড়ির পেছনের কক্ষে খেলছিল। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয় সে। ডেট্রয়েট পুলিশ বিভাগের উপপ্রধান আর্নল্ড উইলিয়ামস জানান, শিশুটি তার মাকে বলেছিল, ‘আমার মনে হয়, আমাকে গুলি করা হয়েছে।’ বর্তমানে শিশুটি আশঙ্কামুক্ত এবং তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল।
ফ্লোরিডার জ্যাকসনভিলে দুটি পৃথক বন্দুক হামলায় ১৩ জন গুলিবিদ্ধ হন। এর মধ্যে দুজন নিহত হয়েছেন। স্থানীয় সময় ১ নভেম্বর রাত ১টা ৪০ মিনিটের দিকে হ্যালোইন পার্টিতে প্রবেশের অপেক্ষায় থাকা ১৭ বছর বয়সি এক কিশোরী গুলিতে নিহত হয়। এ ঘটনায় আহত আরও দুজনকে অনিচ্ছাকৃত হামলার শিকার বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এর কিছুক্ষণ পর রাত ৩টা ৪৫ মিনিটের দিকে শহরটির অন্য একটি স্থানে শতাধিক মানুষের অংশগ্রহণে আয়োজিত বাড়ির পার্টি রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় সেখানে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এতে ১০ জন গুলিবিদ্ধ হন। নিহত হন ২০ বছর বয়সি এক তরুণ। আহত ১৫ বছর বয়সি এক কিশোরীর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল থাকলেও একজন এখনো সংকটাপন্ন।
মিসিসিপির জ্যাকসন শহরের একটি নাইট ক্লাবে বন্দুক হামলায় দুজন নিহত এবং চারজন আহত হন। অন্যদিকে উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার একটি পোশাকের দোকানে বন্দুকধারীর হামলায় চার সন্তানের এক অন্তঃসত্ত্বা মা নিহত হন। এ ঘটনায় আহত হন আরও ছয়জন। তাদের মধ্যে দুই কিশোরের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
ওকলাহোমা সিটির একটি ট্রেলার পার্কে হ্যালোইন পার্টিকে কেন্দ্র করে গোলযোগের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। সেখানে একজনের পায়ে একাধিক গুলি লাগে। তবে তিনি বেঁচে যাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এ ছাড়া ঘটনাস্থলে গাড়ির ধাক্কায় দুজন নিহত হন। তবে কীভাবে তাদের মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে তখনো বিস্তারিত নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের আশপাশেও গুলিবর্ষণ
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আয়োজিত অনুষ্ঠানের আশপাশে দুই ডজনের বেশি মানুষ গুলিবিদ্ধ হন।
আলাবামার বার্মিংহামে লিজিয়ন ফিল্ডের বাইরে বন্দুক হামলায় একজন নিহত এবং আটজন আহত হন। ওই দিন মাঠটিতে আলাবামা এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটি ও আলাবামা স্টেট ইউনিভার্সিটির মধ্যে ঐতিহ্যবাহী ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
অন্যদিকে ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের ব্লুমিংটনে ইলিনয় ওয়েসলিয়ান ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসের কাছে গুলিবিদ্ধ আটজনকে উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাস্থলেই ১৯ বছর বয়সি এক তরুণীকে মৃত ঘোষণা করা হয়। আহত সাতজনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে একজনের অবস্থা সংকটাপন্ন।
একই সময়ে ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের ব্লুমিংটনে ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসের কাছে বড় একটি জনসমাগমের মধ্যে গুলির শব্দ শুনতে পান পুলিশ সদস্যরা। হ্যালোইনের পাশাপাশি সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের হোমকামিং উৎসবও চলছিল। পরে শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় গুলিবিদ্ধ কয়েকজনকে পাওয়া যায়। এ ঘটনায় সাতজনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। পালিয়ে যাওয়ার সময় প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র বহনকারী এক ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ। তবে তিনি গুলি চালিয়েছিলেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন বলছেন বিশেষজ্ঞরা
হ্যালোইনসহ বিভিন্ন উৎসবের সময় সহিংসতা প্রতিরোধ করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন অপরাধ ও বন্দুক সহিংসতা বিশেষজ্ঞরা।
মিয়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞানী এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের ব্যুরো অব জাস্টিস স্ট্যাটিস্টিকসের সাবেক পরিচালক অ্যালেক্সিস পিকেরো বলেন, প্রতিটি পানশালা বা পার্কিং এলাকায় পুলিশের উপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ফলে উৎসবের সময় সব জায়গায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন।
ডালাসে এক রাতেই তিন দফা হামলা
টেক্সাসের ডালাস শহরের ডিপ এলাম এলাকায় ১ নভেম্বর ভোরে মাত্র ৭৫ মিনিটের ব্যবধানে তিনটি পৃথক বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত চারজন নিহত এবং ১৫ জন আহত হন। হামলাগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তখনো নিশ্চিত হতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। নিহত ও আহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
ডালাস পুলিশের প্রধান ড্যানিয়েল কোমো বলেন, শনিবার রাত এবং হ্যালোইন উৎসবের বিষয়টি মাথায় রেখে পুলিশ আগে থেকেই পর্যাপ্ত সদস্য মোতায়েন করেছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওতে ডিপ এলাম এলাকার রাস্তায় মানুষের ছোটাছুটি করতে দেখা যায়। বার, রেস্তোরাঁ ও কনসার্ট ভেন্যুর জন্য পরিচিত এলাকাটিতে সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধ ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছিল। ২০২৬ সালে সেখানে অন্তত সাতটি বার ও রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে গেছে।
১ নভেম্বর সকাল নাগাদ পুলিশের ঘিরে রাখা এলাকাগুলোর রাস্তা প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে। চারপাশে ছড়িয়ে ছিল উৎসবের পরিত্যক্ত আবর্জনা। পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ডালাস পুলিশের প্রধান বলেন, ‘এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’