ডেস্ক রিপোর্ট: বাজারে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছিল তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)। ব্যবসায়ীদের সেই অনিয়ম বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বদলে উল্টো খুচরা পর্যায়ে এলপিজির দাম বাড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এতে নতুন করে ভোগান্তিতে পড়েছেন ভোক্তারা।
গতকাল নভেম্বর মাসের জন্য ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের সরকারি দাম ২২৩ টাকা বাড়িয়ে ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করেছে বিইআরসি। এই প্রথম ১২ কেজি সিলিন্ডারের সরকারি দাম ২ হাজার টাকার গণ্ডি ছাড়াল। অথচ গত মার্চ থেকেই বাজারে এই সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায়।
বাজার পরিস্থিতি নিয়ে গত সেপ্টেম্বর থেকে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দ্য ডেইলি স্টার। এসব প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ওই সময়ে ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। অথচ সরকারি নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ থেকে ১ হাজার ৮৩৭ টাকার মধ্যে। সর্বশেষ মূল্যবৃদ্ধির ফলে মাত্র দুই মাসে সিলিন্ডারপ্রতি সরকারি দাম বেড়েছে ৪৭৫ টাকা, প্রায় ৩০ শতাংশ।
বিইআরসির এই সিদ্ধান্তে সংস্থাটির নিয়ন্ত্রক ভূমিকা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। ভোক্তার স্বার্থ রক্ষার বদলে এলপিজি ব্যবসায়ীদের দাবি পূরণকেই কমিশন অগ্রাধিকার দিচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
ব্যবসায়ীদের দেশব্যাপী এলপিজি বিক্রি ও সরবরাহ বন্ধের হুমকি, দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গণশুনানির আয়োজন এবং কমিশনসহ বিভিন্ন খাতে বাড়তি অর্থ আদায়ের দাবির পরই এই মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত এসেছে। নতুন মূল্যকাঠামোয় এলপিজি সরবরাহব্যবস্থার তিনটি ধাপেই চার্জ বাড়ানো হয়েছে।
এলপিজি সংরক্ষণ ও বোতলজাতকরণ খরচ প্রতি কেজিতে ১৬ টাকা ৭৪ পয়সা থেকে ৪০ শতাংশ বাড়িয়ে ২৩ টাকা ৪৮ পয়সা করা হয়েছে। পরিবেশকদের চার্জ ৪ টাকা ১৭ পয়সা থেকে ৭ টাকা ৮ পয়সা, অর্থাৎ ৭০ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে খুচরা বিক্রেতাদের চার্জ ৩ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে ৫ টাকা ৮৩ পয়সা করা হয়েছে, যা ৫৫ শতাংশ বেশি।
১২ কেজির একটি সিলিন্ডারে পরিবেশকদের চার্জ ৫০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৮৫ টাকা। খুচরা বিক্রেতাদের ক্ষেত্রে তা ৪৫ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ টাকায়।
তবে নতুন মূল্যকাঠামোয় বাসায় সিলিন্ডার পৌঁছে দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো ডেলিভারি চার্জ রাখা হয়নি। ফলে বাড়িতে এলপিজি সরবরাহ নেওয়া গ্রাহকদের নির্ধারিত ২ হাজার ৬০ টাকার চেয়েও অনেক বেশি অর্থ গুনতে হতে পারে।
বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি গণশুনানিতে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৯৭৬ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছিল। কমিশন শেষ পর্যন্ত তার চেয়েও বেশি দাম নির্ধারণ করেছে।
কমিটির প্রস্তাবের সময় সৌদি আরামকোর গড় কন্ট্রাক্ট প্রাইস (সিপি) ছিল প্রতি টন ৭১২ ডলার। পরে তা বেড়ে ৭৫৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সৌদি আরামকোর এই দর বিবেচনায় নিয়েই দেশে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে বিইআরসি। তবে নভেম্বর মাসে প্রতি টন এলপিজির পরিবহন ব্যয় আগের মাসের মতোই ২৫০ ডলার রাখা হয়েছে।
এর আগে গত ১২ অক্টোবর এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠন এলপি গ্যাস ট্রেডার্স কো-অপারেটিভ সোসাইটি দুই দিনের দেশব্যাপী বিক্রি ও সরবরাহ বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিল। বাজারে বেশি দামে এলপিজি বিক্রির মধ্যে ব্যবসায়ীরা কমিশন বাড়ানো, প্রশাসনিক হয়রানি বন্ধ এবং অব্যবহৃত সিলিন্ডার পুনরায় সরবরাহব্যবস্থায় যুক্ত করার অনুমতি দাবি করেন।
অথচ বিইআরসির কারিগরি কমিটির কাছে জমা দেওয়া নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অধিকাংশ এলপিজি কোম্পানিই লাভজনক অবস্থায় রয়েছে। তারপরও ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন খাতে চার্জ ও কমিশন বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।
দ্য ডেইলি স্টারকে কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেছেন, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে এলপিজি আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে। তাঁদের দাবি, আগে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এলপিজি আমদানি করা গেলেও এখন যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য উৎস থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১৭ লাখ টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে। এর গ্রাহকসংখ্যা প্রায় এক কোটি। বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোই প্রায় পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। এলপিজি ব্যবসার লাইসেন্স রয়েছে প্রায় ৩৫টি প্রতিষ্ঠানের। তবে সক্রিয় আমদানিকারক মাত্র ১০ থেকে ১২টি।
ভোক্তা প্রতিনিধিরা বলছেন, গ্রাহকেরা যখন আগে থেকেই সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ দিয়ে এলপিজি কিনছেন, তখন নতুন করে দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা কী?
এর আগে গত ২১ সেপ্টেম্বর এলপি গ্যাস বিজনেস কো-অপারেটিভ সোসাইটি বিইআরসির কাছে অভিযোগ করেছিল, কিছু কোম্পানি কমিশন নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে পরিবেশকদের কাছে এলপিজি বিক্রি করছে। ফলে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারাও গ্রাহকদের কাছ থেকে বেশি দাম আদায় করতে বাধ্য হচ্ছেন।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) উপদেষ্টা খলিলুর রহমান বলেন, নতুন করে দাম বাড়ানোর আগে কৃত্রিম সংকট তৈরি, মজুতদারি ও অতিরিক্ত দাম আদায়ের অভিযোগ তদন্ত করা প্রয়োজন।
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ২০২১ সাল থেকেই এলপিজি ব্যবসায়ীরা ‘অতিরিক্ত পরিচালন ব্যয়ের’ অজুহাতে গ্রাহকদের কাছ থেকে বাড়তি অর্থ আদায় করছেন। অথচ ২০২১ সালের পর বিদ্যুতের দাম কয়েক দফা বাড়লেও এবং জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি পেলেও তাঁরা নিজেদের চার্জ বাড়ানোর দাবি তোলেননি।
তাঁর প্রশ্ন, ‘এতে কি প্রমাণ হয় না যে তাঁদের নির্ধারিত চার্জ আগে থেকেই অনেক বেশি ছিল?’ তথ্যসূত্র, ডেইলি স্টার