শিরোনাম
◈ সরকারি চাকরিতে মামলা চললে পদোন্নতি নয়, দণ্ড শেষেও দুই বছর অপেক্ষা ◈ ২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গে তিন জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১২৬৫ ◈ জাতিসংঘ অধিবেশনে মোদি অনুপস্থিত কেন, ভারতের কূটনীতিতে কী বার্তা? ◈ নেতানিয়াহুর ভাষণের সময় বাংলাদেশসহ ৭৭ দেশের ওয়াকআউট ◈ নভেম্বরের মাঝামাঝি হতে পারে এইচএসসির ফল প্রকাশ  ◈ মহেশখালীতে এলএনজি স্থানান্তর শুরু, দেশে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি ◈ দেশের সব ইউনিয়নের হাট-বাজারে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের নির্দেশ সরকারের ◈ জরুরি নির্দেশনা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চলাচলকারীদের জন্য ◈ গোল ক‌রে বন্দুক উদযাপনে লাল কার্ড, খেসারত দিলেন ইসরায়েলি ফরোয়ার্ড ◈ ছয় ম্যাচে ছয় হার, তবু ভারতকে হুঁশিয়ারি পাকিস্তানের!

প্রকাশিত : ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৬:৩০ বিকাল
আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:০১ বিকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

জাতিসংঘ অধিবেশনে মোদি অনুপস্থিত কেন, ভারতের কূটনীতিতে কী বার্তা?

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে এবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যাননি। তাঁর স্থলে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। নিউইয়র্কে চলা সাধারণ পরিষদের বিতর্কে আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর ভারতের হয়ে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তিনি ভারতের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বৈঠকেও অংশ নিচ্ছেন।

মোদি কেন এবার সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যাচ্ছেন না, তার কোনো সুনির্দিষ্ট সরকারি কারণ প্রকাশ করা হয়নি। তবে বিশ্লেষকেরা বিষয়টিকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করছেন।

প্রথম বিষয়টি হলো, এটি একেবারে নতুন কোনো প্রবণতা নয়। মোদি ২০২৪ সালের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিয়েছিলেন এবং নিউইয়র্কে বিভিন্ন নেতার সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। তবে ২০২৫ সালে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন জয়শঙ্কর, আর ২০২৬ সালেও একই ব্যবস্থা। অর্থাৎ, অন্তত সাম্প্রতিক দুই বছর ভারত প্রধানমন্ত্রীকে না পাঠিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মাধ্যমে সাধারণ পরিষদের মঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করানোর পথ বেছে নিয়েছে।

এর পেছনে একটি বড় কারণ হতে পারে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সীমিত কার্যকারিতা। সাধারণ পরিষদের মঞ্চে বিশ্বের প্রায় সব দেশ তাদের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরে। কিন্তু বড় সিদ্ধান্ত বা সমঝোতা অনেক সময় সাধারণ অধিবেশনের বক্তৃতার বাইরে দ্বিপক্ষীয় ও ছোট আকারের বহুপক্ষীয় বৈঠকে হয়। ভারত বিভিন্ন মঞ্চে এবং ফোরামে এ বিষয়ে তাদের অবস্থান ব্যক্ত করেছে।

advertisement

তবে ভারতের দীর্ঘদিনের একটি দাবি—জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের প্রশ্নে অগ্রগতি না হওয়াও নয়াদিল্লির হতাশার একটি কারণ। সর্বশেষ ভারত, সাধারণ পরিষদের সম্মেলন শুরুর আগেই জাতিসংঘের সংস্কার প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেছে। দিল্লি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে। সর্বশেষ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী কমিটির সদস্য হওয়ার দাবিতে ভারত ইউরোপের ভি–৪ বা ভিসেগ্রাদ গ্রুপের চার দেশের (চেক প্রজাতন্ত্র, হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড ও স্লোভাকিয়া) সমর্থন আদায় করেছে। কিন্তু জাতিসংঘ খুব শিগগির তার কাঠামো পরিবর্তন করবে এমন আশা ভারতের নেই। ফলে ভারতের কাছে শুধু মঞ্চে বক্তব্য দেওয়ার চেয়ে নির্দিষ্ট ফল পাওয়ার মতো কূটনৈতিক যোগাযোগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

এই জায়গাতেই কোয়াড, ব্রিকস, জি–২০ এবং অন্যান্য ছোট বহুপক্ষীয় কাঠামোর গুরুত্ব বাড়ছে। এসব ফোরামে তুলনামূলক কম দেশের সঙ্গে নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে সরাসরি আলোচনা করা যায়। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকেও অর্থনীতি, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও বাণিজ্যের মতো বিষয়ে বাস্তব সমঝোতার সুযোগ থাকে। ফলে মোদি নিউইয়র্ক সফরে না থাকলেও ভারতের কূটনৈতিক কার্যক্রম থেমে যাচ্ছে না।

বরং ২০২৬ সালের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে জয়শঙ্করের কর্মসূচি দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। তিনি শুধু সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেওয়ার জন্য যাচ্ছেন না, বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বৈঠকেও অংশ নিচ্ছেন। জাতিসংঘের এবারের সাধারণ বিতর্কের মূল প্রতিপাদ্যও হলো, আস্থার সংকট, পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থা এবং জাতিসংঘকে আরও কার্যকর করার প্রশ্নই এবারের আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।

এখানে জয়শঙ্করের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের পররাষ্ট্রনীতির বড় কয়েকটি লক্ষ্য হলো জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার, গ্লোবাল সাউথের (তৃতীয় বিশ্ব) নেতৃত্ব, বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান এবং ২০২৮-২৯ মেয়াদে নিরাপত্তা পরিষদের আসনের জন্য ভারতের প্রচার। এসব বিষয়ে জয়শঙ্কর নিয়মিতভাবেই ভারতের অবস্থান তুলে ধরছেন। ফলে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত উপস্থিতি ছাড়া ভারতের কূটনৈতিক বার্তা পৌঁছানো সম্ভব নয়— এমন পরিস্থিতি নেই।

আরেকটি বিষয় হলো সংবেদনশীল অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিবেশ। ২০২৬ সালের বৈশ্বিক রাজনীতিতে যুদ্ধ, জ্বালানি নিরাপত্তা, ইউক্রেন, ইরান, গাজা, পারমাণবিক নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং জাতিসংঘ সংস্কারের মতো একাধিক জটিল প্রশ্ন রয়েছে। এসব ইস্যুতে ভারতকে একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইরান, ইসরায়েল, আরব বিশ্ব এবং গ্লোবাল সাউথের সঙ্গে সম্পর্ক সামলাতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে সামনে রেখে তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত কূটনৈতিক ভাষায় অবস্থান তুলে ধরার সুবিধা থাকতে পারে।

আর ভারতে বর্তমানে মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার ব্যাপক রাজনৈতিক চাপে রয়েছে। কিছুদিন আগে প্রশ্ন ফাঁস ইস্যুতে শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগের দাবিতে সফল আন্দোলন এর অন্যতম। সেই আন্দোলন মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের নৈতিক অবস্থানকে অনেকটাই দুর্বল করে দিয়েছে। সর্বশেষ, বিরোধী দলের ‘ভোট চুরির’ অভিযোগের আগুনে হাওয়া দিয়েছে দেশটির নির্বাচন কমিশনের দুই কমিশনারের সঙ্গে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরোধ নিয়ে প্রকাশিত খবর।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বলেছে, নির্বাচন কমিশনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বাকি দুই কমিশনারকে কোনো গুরুত্বই দেন না। এর পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, ‘ভোট চুরি ভারতীয় জনগণের বিরুদ্ধে একটি অপরাধ এবং আমাদের সংবিধানের ওপর সরাসরি আক্রমণ। বিজেপি, আরএসএস (রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ) এবং যারা এটি সংগঠিত করেছে সেই নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রদ্রোহের কাজ করেছে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।’ তিনি ১৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিওও শেয়ার করেন, যেখানে তিনি নির্বাচন কমিশন ও এর কর্মকর্তাদের বলেন, ‘আপনাদের সময় আসবে। আপনারা পার পাবেন না।’

এ ছাড়া, ভারতে বেকারত্ব, চাকরির পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস, জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিসহ নানা ইস্যুতে মোদির সরকার ভয়াবহ চাপে রয়েছে। ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ভারতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়া, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে প্রায় ভেঙে পড়া সম্পর্ক ইত্যাদি কারণেও ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিজেপি সরকার বেশ চাপে আছে।

আবার জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দিতে মোদির যুক্তরাষ্ট্রে না যাওয়ার পেছনে দিল্লি–ওয়াশিংটন সম্পর্কের সাম্প্রতিক টানাপোড়েনও পুরোপুরি উপেক্ষা করা যায় না। রাশিয়ার জ্বালানি কেনা নিয়ে ওয়াশিংটনের চাপ এবং বাণিজ্যিক টানাপোড়েন বর্তমানে ভারতের কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। সেপ্টেম্বরেই রুশ জ্বালানি কেনা দেশগুলোর ওপর বড় ধরনের শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়া মার্কিন আইনের বিষয়টি সামনে এসেছে। ভারত এ ক্ষেত্রে জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈচিত্র্যময় উৎস থেকে আমদানির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে।

মোদিকে ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্প একসময় বেশ গুরুত্ব দিতেন। এমনকি মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলেও ভারতের আলাদা গুরুত্ব ছিল। কিন্তু ট্রাম্প দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হিসেবে হোয়াইট হাউসে আসার পর বলা চলে ভারত–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক একপ্রকার তলানিতে পৌঁছেছে। ভারতের ওপর ট্রাম্প একাধিকবার শুল্ক আরোপ করেছেন। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে শর্তসাপেক্ষে আরও ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের আদেশে সই করে রেখেছেন।

মোদি–ট্রাম্পের সর্বশেষ দ্বিপক্ষীয় বড় বৈঠক হয়েছিল ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এরপর আর দুই নেতা একে অপরকে নিজ দেশে আতিথ্য দেননি। কিন্তু এই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক আগের তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে নিয়ে গেছেন। পাকিস্তানি নেতাদের একাধিকবার হোয়াইট হাউসে আতিথ্য দিয়েছেন ট্রাম্প। এমনকি চলতি বছরে মে মাসে ভারত–পাকিস্তানের সংক্ষিপ্ত যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্প কৃতিত্ব দাবি করলে সেটি নিয়েও ভারত ভিন্ন অবস্থান পোষণ করে। সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আগের মতো ভালো নেই।

সময়ও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ভারতের কূটনৈতিক ক্যালেন্ডার এখন একাধিক শীর্ষ সম্মেলন, দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ এবং বহুপক্ষীয় উদ্যোগে ভরা। ফলে প্রধানমন্ত্রীকে প্রতিটি আন্তর্জাতিক ফোরামে ব্যক্তিগতভাবে পাঠানোর পরিবর্তে যেখানে তাঁর উপস্থিতি রাজনৈতিকভাবে বেশি প্রয়োজন, সেখানে সময় দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। জাতিসংঘের সাধারণ বিতর্কের মতো একটি নিয়মিত বার্ষিক অনুষ্ঠানে একজন অভিজ্ঞ পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে পাঠানো সেই ব্যবস্থাপনারই অংশ হতে পারে।

ফলে, ২০২৬ সালের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন-তে মোদির অনুপস্থিতির পেছনে একক কোনো কারণ নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। সরকারি ব্যাখ্যা না থাকায় এটিকে ‘কৌশলগত সিদ্ধান্ত’ হিসেবে দেখার সুযোগ আছে। কিন্তু বিশ্লেষকেরা যেভাবে ভারত আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কূটনৈতিকভাবে খানিকটা কোণঠাসা অবস্থায় আছে বলে মনে করছেন, তা থেকে মোদির ওপর বাড়তি চাপ পড়েছে বলেই মনে হয়। তথ্যসূত্র: ডয়চে ভেলে, রয়টার্স, ভাস্কর ইংলিশ, ফ্রি প্রেস জার্নাল ও ফক্স নিউজ

 

  • সর্বশেষ