শিরোনাম
◈ নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার মধ্যেই রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাচ্ছে মালয়েশিয়া ◈ নিখোঁজের ২ দিন পর চট্টগ্রামে স্বর্ণ ব্যবসায়ী পিন্টু দাসসহ ৪ জন উদ্ধার ◈ প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশকে নেওয়ার বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করল পাকিস্তান ◈ আকস্মিক বন্যায় ভেসে আসা মৃতদেহ থেকে কানের দুল চুরি, ভিডিও ভাইরাল! ◈ নেপালে ভয়াবহ বন্যায় নিহত বেড়ে ৪৭৫, নিখোঁজ ৯০০; নতুন বিপর্যয়ের শঙ্কা ◈ অনুমোদন পেলে বৃহস্পতিবারের মধ্যে নবম পে স্কেলের প্রজ্ঞাপন: মন্ত্রিসভা বৈঠক সোমবার ◈ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিল্লিতে নিতে কেন এত মরিয়া ভারত? ◈ রংপুরের চাঞ্চল্যকর চার খুন নিয়ে এত সন্দেহ ও অবিশ্বাস কেন? ◈ সংকটের প্রকৃত কারণ জনগণকে জানাতে এমপিদের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর ◈ বারবার প্রতিশ্রুতি, তবু থামছে না সীমান্ত হত্যা : প্রতিমাসে একজন করে মারা যায় গুলিতে

প্রকাশিত : ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ১২:৪৭ দুপুর
আপডেট : ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ১২:৫১ দুপুর

প্রতিবেদক : আর রিয়াজ

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ৬ মাস: বিশ্ববাজারে জ্বালানি, খাদ্য ও অর্থনীতিতে বড় চাপ

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ছয় মাস পূর্ণ হলো আজ। সংঘাতের জেরে গত ১৮১ দিনে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জ্বালানি সরবরাহ। অস্থির হয়েছে তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির বাজার। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে খাদ্য ও সার সরবরাহেও। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী আর্থিক বাজারেও তৈরি হয়েছে নানা ধরনের চাপ। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বিশ্লেষণে বিশ্বজুড়ে আর্থিক বাজারে যুদ্ধের ছয় মাসের প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে। অনুবাদ: বণিক বার্তা

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমা হামলার মধ্য দিয়ে সংঘাত শুরু হয় ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে। এর পর থেকেই বিশ্ববাজারে তৈরি হয় বড় ধরনের অনিশ্চয়তা। উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি তেল উৎপাদন ব্যাহত হয়। একই সময় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কমে যায়। ফলে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে, যা এখনো কমেনি। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির দামে।

যুদ্ধের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে জ্বালানি বাজারে। উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তোলন ব্যাহত হওয়া ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন কমে যাওয়ায় অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। চলতি বছরের এপ্রিলে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সাময়িকভাবে ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত পণ্যটির গড় দাম প্রায় ৯০ ডলার। গত বছর এ দাম ছিল প্রায় ৭০ ডলার।

তবে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের চেয়েও বেশি চাপ তৈরি হয় পরিশোধিত জ্বালানির বাজারে। বিশেষ করে ডিজেলের দাম বাড়ে দ্রুত। বাজারে মিডল ডিস্টিলেটস বা ডিজেল-জাতীয় জ্বালানির ঘাটতি তৈরি হয়। এর সঙ্গে রাশিয়ার বিভিন্ন শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলার কারণে ব্যাহত হয় উৎপাদন। এ সময় উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি রফতানিও কমেছে।

জ্বালানির কারণে উড়োজাহাজের বাজারেও শুরুতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। উপসাগরীয় অঞ্চল বৈশ্বিক জেট ফুয়েল সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হওয়ায় যুদ্ধের শুরুতে এ খাতে উদ্বেগ বেড়ে যায়। তবে পরে যুক্তরাষ্ট্রের শোধনাগারগুলোয় উৎপাদন বাড়ানো হয়। একই সঙ্গে দেশটি জেট ফুয়েল রফতানিও বাড়াতে থাকে। এতে সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা কিছুটা কমে আসে।

তবে জ্বালানি বাজারের ঝুঁকি এখনো পুরোপুরি কাটেনি। সামনে শীত আসছে উত্তর গোলার্ধে। এ সময় হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহনে নতুন করে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটলে পরিস্থিতি আরো কঠিন হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার ঝুঁকিও রয়েছে। এ দুই বিষয় একসঙ্গে ঘটলে হিটিং অয়েলের দাম বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে মূল্যস্ফীতিতেও।

এদিকে সংকটের সময় বিনিয়োগকারীরা যেসব সম্পদকে সাধারণত নিরাপদ মনে করেন, সেগুলো এবার আগের মতো নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে কাজ করেনি। স্বর্ণ, ডলার ও উচ্চমানের সরকারি বন্ড—কোনোটিই পুরো সময়ে প্রচলিত নিরাপদ আশ্রয়ের ভূমিকা রাখতে পারেনি বলে উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।

যুদ্ধ শুরুর পর প্রধান কয়েকটি মুদ্রার বিপরীতে ডলারের দাম ১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এ প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে জাপানি ইয়েনের দুর্বলতার কারণে। অর্থাৎ ডলারের শক্তিশালী অবস্থানের পেছনে যুদ্ধের প্রভাবের পাশাপাশি অন্য মুদ্রার দুর্বলতাও কাজ করেছে।

মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চাপ দেখা গেছে। সাধারণত বৈশ্বিক সংকটের সময়ে বিনিয়োগকারীরা এসব বন্ডে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ঝোঁকেন। কিন্তু এবার মার্কিন মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কায় সুদহার কমানোর প্রত্যাশা কমেছে। এতে ট্রেজারি বন্ডের রিটার্ন কমেছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) নতুন প্রধান কেভিন ওয়ারশকে ঘিরে উদ্বেগ। পাশাপাশি ওয়াশিংটনের আকস্মিক ঋণ পুনঃক্রয় পরিকল্পনাও বাজারে চাপ তৈরি করেছে। ফলে ট্রেজারি বন্ড এবার বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশিত নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠতে পারেনি।

যুদ্ধের আরেকটি বড় প্রভাব পড়েছে খাদ্য ও সারের বাজারে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সার পরিবহনে ব্যাঘাত তৈরি হয়। বৈশ্বিক খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ একটি উপকরণ সার। ফলে পণ্যটি সরবরাহে জটিলতা তৈরি হলে এর প্রভাব সরাসরি কৃষি উৎপাদনে পড়ার ঝুঁকি থাকে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শক্তিশালী এল নিনো। একই সময় ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে শস্য পরিবহনেও নতুন করে ব্যাঘাত তৈরি হয়। এসব ঘটনা একসঙ্গে বৈশ্বিক কৃষি উৎপাদনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে।

এরই মধ্যে জুলাইয়ে বিশ্বজুড়ে খাদ্যের দাম তিন বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে বলে জানায় জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)। তবে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যুদ্ধের পুরো প্রভাব এখনো বাজারে আসেনি। সামনে খাদ্য মূল্যস্ফীতির নতুন ধাক্কা আসতে পারে।

এফএও সতর্ক করে জানায়, বিশ্ব ফের খাদ্য মূল্যস্ফীতির একটি নতুন পর্যায়ের দিকে এগোতে পারে। জেপিমরগ্যানের হিসাব অনুযায়ী, শুধু শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবেই বিশ্বে খাদ্য মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রায় দশমিক ৭ শতাংশ বাড়তে পারে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ার আশঙ্কা এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকায়।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সরাসরি ধাক্কা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে উপসাগরীয় অর্থনীতিতে। যুদ্ধের কারণে সৌদি আরবের রফতানি দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) তুলনায় ১০ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ জ্বালানি ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে সংঘাতের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

দুবাইয়ের আবাসন খাতেও বড় ধাক্কা লেগেছে। জেপি মরগ্যানের হিসাবে, সেখানে সম্পত্তি বিক্রি ৭০-৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। অর্থাৎ যুদ্ধের প্রভাব শুধু জ্বালানি ও শেয়ারবাজারে সীমাবদ্ধ নেই। অঞ্চলটির আবাসন ব্যবসায়ও এর বড় প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

  • সর্বশেষ