বিশ্ববাজারে গত দুই বছরে স্বর্ণের দাম রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে। বিলাসিতার এই বস্তু যদি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাওয়া যায়, তবে কেমন হয়? ঠিক এমন এক অবিশ্বাস্য খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আফ্রিকান দেশ কেনিয়ার এক দুর্গম গ্রামে তৈরি হয়েছে চরম উত্তেজনা।
নদীর বালুচরে ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় দিন-রাত এক করছেন হাজার হাজার মানুষ। উদ্দেশ্য একটাই—যদি এক টুকরো স্বর্ণ মিলে যায়! কেনিয়ার পশ্চিম পকোট কাউন্টির কাপেনগুরিয়া নির্বাচনি এলাকার কানিয়ারকওয়াত অঞ্চলের 'চেপোরোর' নামের একটি ছোট্ট গ্রামে এখন চলছে অভূতপূর্ব স্বর্ণ খোঁজার হিড়িক। গত দুই সপ্তাহে সেখানে ভিড় জমিয়েছেন হাজার হাজার মানুষ।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হঠাৎ করে শুরু হওয়া এই 'গোল্ড রাশ' বা স্বর্ণ খোঁজার প্রবণতা কিন্তু আকস্মিক নয়। গ্রামের এক ছাগল পালকের দুর্ঘটনাবশত কুড়িয়ে পাওয়া এক টুকরো স্বর্ণই এই বিশাল উন্মাদনার অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
যেভাবে শুরু রহস্যময় আবিষ্কার
৩৩ বছর বয়সি ছাগল পালক মানাসে লোমাচার কয়েক সপ্তাহ আগে নিজের হারিয়ে যাওয়া ছাগল খুঁজতে বের হয়ে নদীর তীরে একদল নারীকে নদীর বালু থেকে স্বর্ণ ছাঁকার কাজ করতে দেখেন।
বিবিসি-কে লোমাচার বলেন, ‘আমি তাদের সঙ্গে যোগ দিই। আর ঠিক তখনই আমরা বুঝতে পারি যে এই অঞ্চলে সত্যিই স্বর্ণ রয়েছে।’
লোমাচার সেখানে মাত্র ৩ গ্রাম ওজনের একটি স্বর্ণ টুকরো খুঁজে পান। কয়েক সপ্তাহ আগে তিনি সেটি ৩৬ হাজার কেনীয় শিলিংয়ে (প্রায় ২৬,৬১৫ ভারতীয় রুপি) বিক্রি করেন।
লোমাচারের মতে, তার এই আবিষ্কারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরেই শান্ত গ্রামটিতে স্বর্ণ সন্ধানী মানুষের ঢল নামে। তবে কেবল এই একটি আবিষ্কারই কি এত বড় উন্মাদনার কারণ, নাকি সম্প্রতি আরো স্বর্ণ পাওয়া গেছে—তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।
১০ হাজার মানুষের আগমন, বাড়ছে সীমান্ত পারাপার
স্থানীয় প্রশাসনের মতে, এই উন্মাদনার চরম মুহূর্তে চেপোরোর গ্রামে প্রায় ১০ হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। এদের একটি বড় অংশ এসেছেন কেনিয়ার বিভিন্ন এলাকা থেকে এবং বাকিরা প্রতিবেশী দেশ উগান্ডা থেকে সীমান্ত পেরিয়ে এসেছেন।
এমনিতে এই অঞ্চলে স্থানীয়রা মাঝে মাঝে নদী থেকে স্বর্ণ ছাঁকার চেষ্টা করলেও বড় ধরনের কোনো সন্ধান সচরাচর মেলে না। কিন্তু এবার মানুষ সব বাধা তোয়াক্কা না করে ছুটে আসছেন। স্বর্ণের সামান্য পরিমাণও এই সাধারণ মানুষের জন্য ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিতে পারে। অনেকেই জানিয়েছেন, এখান থেকে বাড়তি কিছু আয় হলে তারা তাদের পরিবারকে সচ্ছলভাবে চালাতে পারবেন।
প্রশাসনের মন্তব্য ও সংশয়
পশ্চিম পকোট কাউন্টির ডেপুটি কমিশনার স্যামুয়েল কিয়ারি বিবিসি-কে জানান, ‘তরুণদের একটি দল প্রথমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সোনা পেয়েছিল। এর পরদিন নারীরা একই এলাকায় আরেকটি বড় সন্ধান পান।’
কর্মকর্তাদের মতে, এই দুটি মূল আবিষ্কারই সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মানুষের আগমন বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কিয়ারি জানান, স্থানীয় ছোট স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা তাদের জানিয়েছেন যে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১০০ জন বিক্রেতা তাদের কাছে আসছেন। তবে তারা যে চকচকে ধাতুটি খুঁজে পাচ্ছেন, তা আসলেই সোনা কি না—তা শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ভূ-প্রাকৃতিক দিক থেকে এই অঞ্চলে সুনির্দিষ্ট বা বড় কোনো স্বর্ণের খনি রয়েছে কি না, তা-ও এখনো প্রমাণিত নয়।
অর্থনীতির নতুন সুযোগ ও সংকট
কারো কপালে স্বর্ণ জুটছে, কেউ বা আশায় দিন গুনছেন—এই সুযোগে গ্রামে গড়ে উঠেছে নতুন ব্যবসা। হাজার মানুষের উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে গ্রামটিতে খাবার, পানি ও প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির প্রায় ২০০টিরও বেশি সাময়িক দোকান গড়ে উঠেছে। এতে স্থানীয়দের এক ধরণের আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে হঠাৎ করে হাজার হাজার বহিরাগত মানুষের আগমনে ছোট্ট এই গ্রামটির পরিকাঠামো চরম হুমকির মুখে পড়েছে। তীব্র পানীয় জলের সংকট দেখা দিয়েছে এবং সঠিক পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় স্বাস্থ্য ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে।
সূত্র: এনডিটিভি, আমার দেশ