শিরোনাম
◈ ঈদের আগে স্বর্ণের দাম কমাল বাজুস ◈ ২৮ জুন একমাত্র টেস্ট, বাংলাদেশ সিরিজের সূচি ঘোষণা করলো জিম্বাবুয়ে ◈ পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে আবারও ‘সাধারণ ক্ষমা’ সুবিধা আনছে সরকার ◈ আজ ময়মনসিংহ যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী, উদ্বোধন করবেন খাল পুনঃখনন ও নজরুল জন্মজয়ন্তী ◈ শার্শায় পুত্রবধুকে ধর্ষনে শশুর গ্রেফতার ◈ সীমান্তে বিএসএফের খুঁটি বসানোর চেষ্টা ব্যর্থ করে দিলো বিজিবি ◈ দুই দিনে জমা ৩৩ মনোনয়নপত্র, এবার যাচাই-বাছাই, বি‌সি‌বির নির্বাচন ৭ জুন ◈ সারাদেশের ভূমি মালিকদের জন্য জরুরি নির্দেশনা জারি করেছে ভূমি মন্ত্রণালয় ◈ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঘোষণা হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তি: আল-আরাবিয়া ◈ দানবাক্সের টাকা চুরির অভিযোগ, ভাইরাল সেই সিদ্দিককে হাতেনাতে ধরল জনগণ (ভিডিও)

প্রকাশিত : ২৩ মে, ২০২৬, ০৯:৪৬ সকাল
আপডেট : ২৩ মে, ২০২৬, ১১:১৩ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে ধেয়ে চলেছে ভয়ংকর উষ্ণ ঢেউ, ডেকে আনছে সুপার এল নিনো

প্রশান্ত মহাসাগরের একদম তলদেশ দিয়ে উষ্ণ পানির বিশাল এক ঢেউ যেন দৈত্যাকার এক মালবাহী ট্রেনের মতো ধেয়ে চলছে। সমুদ্রের গভীরে বয়ে চলা স্রোতের এই ঢেউকে বিজ্ঞানীরা বলেন 'কেলভিন ওয়েভ'।

বর্তমানে প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে এই ঢেউটির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে রেকর্ড ৭.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১৩.৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট) বেশি মাপা হয়েছে।

তলদেশের পানি ডাঙার চেয়ে অনেক ধীরে উত্তপ্ত এবং শীতল হয়, তাই সাগরের তলদেশে পানির এই অস্বাভাবিক উত্তাপ বিশ্বের জলবায়ুতে এক ভয়ংকর পরিবর্তনের আগাম বার্তা দিচ্ছে।

এই উত্তপ্ত ঢেউয়ের কারণে এ বছরের শেষের দিকেই ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী একটি 'সুপার এল নিনো' দেখা দিতে পারে।

এর ফলে ২০২৭ সাল জুড়ে বিশ্বব্যাপী খরা, প্রবল বৃষ্টিতে বন্যা এবং রেকর্ড পরিমাণ তাপ ও আর্দ্রতা বৃদ্ধির চরম শঙ্কা রয়েছে। এর সাথে গত কয়েক বছরে হয়ে যাওয়া একাধিক 'লা নিনা' এবং জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব যুক্ত হয়ে এবারের এল নিনোকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে।

এল নিনো মূলত কয়েক বছর পরপর প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের উপরিভাগের পানিকে মারাত্মক উষ্ণ করে তোলে।

ঠিক উল্টো পরিস্থিতি, অর্থাৎ যখন সাগরের পানি গড়ের চেয়ে অনেক শীতল হয়ে যায়, তাকে 'লা নিনা' বলা হয়। বিজ্ঞানীদের শঙ্কা, এবার সমুদ্রের তাপমাত্রা গড়ের চেয়ে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে।

সাগরের নিচের এই উষ্ণ ঢেউ কতটা ভয়ংকর? 

কেলভিন ওয়েভ মূলত পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণতম পানি প্রায় ৯ হাজার মাইল দূরত্ব পাড়ি দিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলে ঠেলে নিয়ে আসে।

যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়া গবেষণা সংস্থা 'এনওএএ'-র বিজ্ঞানী মিশেল এল'হিউরেক্স জানান, বর্তমানের কেলভিন ওয়েভটি খুবই ভয়ংকর, যা অনেকটাই ১৯৯৭ সালের মারাত্মক সেই কেলভিন ওয়েভের সাথে পাল্লা দিচ্ছে।

১৮৫০ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত এমন সুপার এল নিনোর দেখা মিলেছে মাত্র ৬ বার। ১৯৯৭-৯৮ সালের এল নিনোয় বিশ্বে প্রায় ৯ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছিল। তবে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ছিল ১৮৭৭-৭৮ সালের এল নিনো, যা কেড়ে নিয়েছিল লাখ লাখ মানুষের প্রাণ।

বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, আজকের সমুদ্র অতীতের চেয়ে অনেক বেশি উষ্ণ হয়ে গেছে। আর এই অতিরিক্ত উত্তাপ নতুন দানা বাঁধতে থাকা এল নিনোকে আগের চেয়ে অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক শক্তি জোগাচ্ছে।

কী প্রভাব পড়বে বিশ্বে?

কেলভিন ওয়েভের যাত্রা শেষ হলে প্রশান্ত মহাসাগরের বিষুবীয় অঞ্চলে তাপমাত্রা লাফিয়ে বাড়বে এবং এর জেরে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের চিরচেনা বজ্রঝড়গুলো পূর্ব দিকে সরে যাবে।

ফলে পুরো বিশ্বের বায়ুর চাপ ও বায়ুপ্রবাহ বদলে যাবে, যা সর্বত্র ধ্বংসাত্মক আবহাওয়া বিপর্যয় ডেকে আনবে।

ঝড়গুলো সাগর থেকে ব্যাপক মাত্রায় তাপ ও আর্দ্রতা ছাড়তে শুরু করবে। আবহাওয়া বিজ্ঞানী ড্যানিয়েল সোয়ান সতর্ক করেছেন, 'গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরে যা কিছু ঘটে, তা তো কেবল সেখানে আটকে থাকে না!'

এই বিশাল তাপ ও আবহাওয়া বদলের ধাক্কায় ২০২৭ সালের মধ্যে বিশ্বে চরম উষ্ণতা এবং আর্দ্রতার নতুন এক অসহনীয় রেকর্ড হতে পারে।

কোথা থেকে আসে এত উত্তাপ?

বিজ্ঞানী লর্ড কেলভিনের নামে নাম রাখা কেলভিন ওয়েভ তৈরি হতে বছরের পর বছর সময় লাগে। এর মূল শক্তির জোগান আসে 'পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় উষ্ণ অঞ্চল' থেকে।

ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব দিকের এই বিশাল অঞ্চলটি পৃথিবীর অন্যতম বড় হিট ইঞ্জিন, যেখান থেকে সৃষ্ট বজ্রঝড় পুরো গ্রহের আবহাওয়ায় প্রভাব ফেলে।

নিরক্ষীয় অঞ্চলের এই উষ্ণ পানিতে পুব দিকের 'বাণিজ্য বায়ু' বা ট্রেড উইন্ডসের কারণে আরও প্রচুর উষ্ণ পানি এসে জমা হয়। ফলে ইকুয়েডরের চেয়ে ইন্দোনেশিয়া উপকূলে সমুদ্রপৃষ্ঠ ১ থেকে ৩ ফুট পর্যন্ত উঁচু থাকে।

বিশ্বব্যাপী দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণায়ন এবং মাত্র ছয় বছরে ৫টি লা নিনার কারণে ২০২৫ সালে এই অঞ্চলে এক হাজার ফুট গভীর পর্যন্ত রেকর্ড পরিমাণ উষ্ণ পানি জমা হয়েছে।

মিশেল এল'হিউরেক্স জানান, এর সাথে উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের ৫ হাজার মাইল জুড়ে তৈরি হওয়া সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ যুক্ত হয়ে সুপার এল নিনোর শক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বায়ুপ্রবাহের দিক পরিবর্তন ও থার্মোক্লাইন পুবালি বায়ু কয়েক বছর পরপর দুর্বল হয়ে পড়ে। চরম অবস্থায় এটি দিক পাল্টে পশ্চিম দিক থেকে বইতে শুরু করে, যাকে 'ওয়েস্টার্লি উইন্ড বার্স্ট' বলা হয়।

১৭ মে পর্যন্ত নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উষ্ণ সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দেখা যাচ্ছে, যা এল নিনোর মতো একটি পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এল নিনো পর্যবেক্ষণের চারটি প্রধান অঞ্চল আছে, তবে বৈশ্বিক আবহাওয়ার ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে ‘নিনো ৩.৪’ অঞ্চল।
তখন এটি কয়েক সপ্তাহ ধরে ঘণ্টায় প্রায় ১৫ মাইল বেগে বয়। এই বাতাসই মূলত কেলভিন ওয়েভকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আসল শক্তি দেয়।

পশ্চিমা বাতাসের এই চাপে উষ্ণ পানি প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে পূর্ব দিকে এগোয়। এ সময় সমুদ্রের উষ্ণ ও ঠান্ডা পানির সীমানা বা 'থার্মোক্লাইন' ধীরে ধীরে ওপরের স্তরে উঠতে থাকে।

উষ্ণ পানি দক্ষিণ আমেরিকার দিকে ছুটে যায় এবং সেখানকার আবহাওয়া ব্যাপকভাবে বদলে দেয়।

গত ডিসেম্বরের একটি জোরালো পশ্চিমা বাতাস প্রথম জানান দিয়েছিল যে, ২০২৬ সালে বড় এল নিনো তৈরি হতে যাচ্ছে।

এরপর এপ্রিলে তিনটি ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে রেকর্ড বাতাসের ধাক্কা এই দৈত্যাকার উষ্ণ ঢেউটিকে জাগিয়ে তুলেছে।

পানির তলদেশে ধেয়ে আসা কেলভিন ওয়েভ কেলভিন ওয়েভ সমুদ্রসৈকতে আছড়ে পড়া সাধারণ ঢেউয়ের মতো নয়।

এগুলো প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশ দিয়ে নিঃশব্দে এগোয় এবং পুরো পথ পাড়ি দিতে প্রায় দুই থেকে তিন মাস সময় নেয়। বর্তমানে এই ওয়েভ খুব দ্রুত দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূলে এসে ধাক্কা দিতে চলেছে।

পেরুর আবহাওয়া বিশ্লেষক আব্রাহাম লেভি জানান, '১৯৯৭ সালের পর আমরা এমন পরিস্থিতি আর কখনোই দেখিনি।'

ঢেউটি পেরু উপকূলে আছড়ে পড়লে সাগরের গভীর থেকে ঠান্ডা পানি ওপরে ওঠার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি থমকে যাবে। এর ফলে ওপরের পানি অস্বাভাবিক গরম হয়ে মারাত্মক এল নিনো তৈরি করবে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়