আগামী বাজেটে সরকার অর্থ পাচারকারীদের জন্য আবারও 'সাধারণ ক্ষমা' সুবিধা চালুর পরিকল্পনা করছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারা। এই সুবিধা দেওয়া হলে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ বিনা প্রশ্নে ফেরত আনার সুযোগ মিলবে।
এই উদ্যোগের আওতায়, দেশে ফেরত আনা অর্থ যদি অগ্রাধিকারমূলক খাতগুলোতে—বিশেত উৎপাদনশীল শিল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে—বিনিয়োগ করা হয়, তবে ওই অর্থের সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা হবে না।
তবে এই অর্থের করহার হতে পারে স্বাভাবিক করহারের চেয়ে কিছুটা বেশি।
প্রস্তাবটি সম্পর্কে অবগত এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, মূলত দেশ থেকে পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনার পথ তৈরি করতে এ উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার।
নাম না প্রকাশের শর্তে এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, 'বিদেশ থেকে টাকা এনে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা হলে অ্যামনেস্টি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। মূলত বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর স্বার্থে ও অর্থনীতিতে গতি আনার স্বার্থে এ বিষয়টি চিন্তা করা হচ্ছে।'
তিনি আরও বলেন, এই সুযোগ যে কেবল পাচারকারীদের জন্য, তা নয়। বরং বিদেশে বৈধভাবে অর্জন করা সম্পদকেও এই সুযোগের আওতায় আনা যাবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তৈরি করা শ্বেতপত্রের তথ্য অনুয়ী, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে দেশ থেকে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে।
এর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ৭ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কর পরিশোধ করে বিদেশে থাকা সম্পদ বৈধ করার সুযোগ দিয়েছিল। তবে ওই উদ্যোগে বিশেষ ফল আসেনি। পরবর্তী বাজেটে এ সুযোগও আর রাখা হয়নি।
আগামী ১১ জুন সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপনের কথা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
ব্যবসায়ী এবং ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অভ বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
তিনি টিবিএসকে বলেন, 'দেশে এখন বিনিয়োগের খরা চলছে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের পরিমাণ জিডিপি'র ২২ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে, যা ২৮ শতাংশ হওয়া দরকার।'
তিনি আরও বলেন, 'পাচার হওয়া অর্থ যদি উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়, তা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে গতি আনতে সহায়ক হবে বলে মনে হয়।'
অবশ্য আরেক ব্যবসায়ী নেতা, ঢাকা চেম্বার অভ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ মনে করেন, পাচার হওয়া অর্থ বিনা প্রশ্নে দেশে ফিরিয়ে আনার সুযোগ না দিয়ে বরং সরকারের উচিত পুঁজি পাচার ঠেকানোতে গুরুত্ব দেওয়া।
টিবিএসকে তিনি বলেন, 'পাচার হলে ওই টাকা ফেরত আনা কঠিন, অতীতে আমরা তা-ই দেখেছি। এটি না করে বরং যারা দেশে ব্যবসা করছেন, তাদের জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং টাকা যাতে পাচার করতে না হয়—সেই পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া দরকার।'
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকার যদি সত্যিকার অর্থেই পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার উদ্দেশ্যে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে থাকে, তবে তাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, কোনো কোনো দেশে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার এই পদ্ধতি আছে। 'যেহেতু যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এই ধরনের অর্থ দেশে আনা কঠিন, সেজন্য বিকল্প হিসেবে এই পদ্ধতি সরকার প্ররগ করে দেখতে পারে।'
তবে ইফতেখারুজ্জামান সতর্ক করে দিয়ে বলেন, নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুসরণ করে, নির্ধারিত করহারের চেয়ে বাড়তি করহার দিয়ে এবং সবার জন্য সমান সুযোগ দিয়ে এ ধরণের অর্থ আনার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
'সেইসঙ্গে যারা অবৈধ অর্থ উপার্জন করে পাচার করেছেন, তারা যাতে এ সুযোগ না নিতে পারেন এবং তাদের বিরুদ্ধে যাতে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচারকাজ সম্পন্ন হয়, তা খেয়াল রাখতে হবে,' বলেন তিনি।
সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা