ঢাকার একটি সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা রুহুল আমীনের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায়। সেখানে তিন রুমের একটি পাকা বাড়ি তার। নিয়মিত লোডশেডিং হওয়ায় গ্রামে বাবা-মা গরমে কষ্ট পান। এসি থাকলেও বেশি কাজে আসে না। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বড় পরিসরে সোলার প্যানেল বসানোর, যাতে চলবে এসি, টিভি, ফ্রিজও।
আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের অনেকেই এখন সোলারের সুবিধা নিচ্ছেন দেখে বৃদ্ধ মা-বাবার স্বস্তি ফেরাতে একটি স্থায়ী উদ্যোগের খোঁজে গুলিস্তান সোলার পণ্যের বাজারে এসেছেন তিনি। দেড় থেকে দুই লাখ টাকার মধ্যে ভারী এসব ইলেকট্রনিক্স পণ্য চালানো যাবে জেনে বেশ খুশি তিনি।
শুধু রুহুল আমীন নন, তার মতো শহরের অনেক বাসিন্দা সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে নিজেদের বিদ্যুৎ সংকটের স্থায়ী সমাধান করছেন। কারণ সাপ্লাই বিদ্যুৎ থাক বা না থাক সোলার প্যানেলে একবার বিনিয়োগ করতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ খরচ সাশ্রয় করা সম্ভব।
সোলার বা সৌরবিদ্যুৎ এখন আগের ধারণায় নেই। আগে ছোট একটি প্যানেল আর টিমটিম করে জ্বলা একটি বাতিতেই সন্তুষ্ট থাকতো মানুষ। জীবাশ্ম জ্বালানির অপ্রতুলতা ও প্রাপ্যতা কমায় গোটা বিশ্ব পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ঝুঁকছে। বাংলাদেশেও সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায়ে বাড়ছে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার।
‘সোলার হাইব্রিড সিস্টেমে’ চলবে এসি-ফ্রিজ
ঢাকা শহরের বহুতল ফ্ল্যাট বাড়ি থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামের টিনের ঘর বা পাকা বাড়ি, সর্বত্রই এখন এক টেকসই সমাধান হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ‘সোলার হাইব্রিড সিস্টেম’। শুধু জরুরি লাইট বা ফ্যান নয়, প্রযুক্তির কল্যাণে এখন ঘরের এসি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন ও টিভির মতো ভারী ইলেকট্রনিক্স পণ্যও অনায়াসে চলছে সৌরশক্তিতে।
দিন দিন এই পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী প্রযুক্তির চাহিদা এতটাই বাড়ছে যে, রাজধানীর প্রধান সোলার মার্কেটগুলোতে এখন নিয়মিত ক্রেতাদের ভিড় দেখা যায়। সাধারণ মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত- সবাই হিসাব কষছেন, এককালীন কিছুটা বেশি বিনিয়োগ করলে কীভাবে আগামী ২০-২৫ বছরের জন্য বিদ্যুৎ বিলের দুশ্চিন্তা থেকে কিছুটা মুক্তি পাওয়া যায়।
খরচ কত?
মঙ্গলবার (১৯ মে) বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত রাজধানীর বৃহৎ সোলার মার্কেট গুলিস্তানের সুন্দরবন স্কয়ার সুপার মার্কেট ও কাপ্তানবাজার কমপ্লেক্স ঘুরে দেখা যায়, সোলার সামগ্রী বিক্রির চাহিদা তুঙ্গে। তেল সংকটকালীন এই চাহিদা আরও বেশি ছিল।
ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একটি মাঝারি ও বড় পরিবারের যাবতীয় চাহিদা- যেমন একটি এসি (১ বা ১.৫ টন), একটি ফ্রিজ, একটি টেলিভিশন, পাঁচটি ফ্যান ও ১০টি এলইডি লাইট চালানোর জন্য চাহিদা এবং পণ্যের মানভেদে দেড় লাখ থেকে দুই লাখ টাকার মধ্যে একটি সম্পূর্ণ প্যাকেজ পাওয়া সম্ভব। তবে কেউ যদি আরও বড় পরিসরে অর্থাৎ ৫ কিলোওয়াট (৫০০০ ওয়াট) সিস্টেম নিতে চান, তবে ব্যাটারির ধরন ও প্যানেলের ব্র্যান্ডভেদে খরচ কিছুটা বাড়তে পারে।
কাপ্তানবাজার কমপ্লেক্সের অন্যতম বৃহৎ সোলার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘সংযোগ পাওয়ার প্যাক’র স্বত্বাধিকারী সাইফুল ইসলাম জাগো নিউজকে জানান, তারা সরাসরি চীন থেকে লিথিয়াম ব্যাটারি, সোলার প্যানেল ও হাইব্রিড ইনভার্টার আমদানি করে বাংলাদেশের ৬৪টি জেলায় সোলার এনার্জি সিস্টেম সরবরাহ করছেন। তাদের মূল ব্র্যান্ড ‘ডিজিডিসি ডংজিন গ্রুপ’ ।
সাইফুল ইসলাম তার প্রতিষ্ঠানের তিন রুম ও একটি ডাইনিং সম্বলিত ফ্ল্যাট বা বাড়ির জন্য দেড় লাখ টাকার বিশেষ হাইব্রিড একটি সেটআপের কার্যকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন।
এই সিস্টেমের মূল সুবিধা হলো, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সূর্যের আলো ব্যবহার করে বাসার লাইট, ফ্যান, টিভি ও এসি সম্পূর্ণ সোলার প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে সরাসরি চলবে। একই সঙ্গে সোলার থেকে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গিয়ে ব্যাটারি সম্পূর্ণ রিচার্জ করবে। ফলে দিনের বেলা গ্রিডের বিদ্যুৎ এক ইউনিটও খরচ হবে না এবং বিদ্যুৎ বিল কমে আসবে।
বিকেলের পর যখন সূর্যের আলো কমে যাবে, তখন এই আধুনিক সিস্টেমটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরকারি গ্রিডের লাইনের বিদ্যুতের সঙ্গে মিশে গিয়ে লোড সামাল দেবে। রাতে যদি বিদ্যুৎ চলে যায় বা লোডশেডিং হয়, তাহলে এই সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত লিথিয়াম ব্যাটারি থেকে এসি, ফ্রিজসহ ঘরের সব সরঞ্জাম টানা দু-তিন ঘণ্টা পর্যন্ত ব্যাকআপ দেবে।
তার প্রতিষ্ঠানে এমন চাহিদার দেড় লাখ টাকার একটি প্যাকেজে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যেখানে একটি ২.৪.২ কিলোওয়াট সোলার হাইব্রিড এমপিপিটি ইনভার্টার (যার ওপর রয়েছে দুই বছরের গ্যারান্টি), একটি ২৫ আরএম মাইনাস-প্লাস ক্যাবল এবং ডিজিডিসি কোম্পানির একটি ২৪ ভোল্ট ১০০ অ্যাম্পিয়ার লিথিয়াম আয়রন ফসফেট ব্যাটারি (যার ওপর রয়েছে পাঁচ বছরের গ্যারান্টি)। প্যানেল হিসেবে দেওয়া হচ্ছে ডিজিডিসি কোম্পানির সর্বাধুনিক সোলার প্যানেল, যা মোট ৩৫৪০ ওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম। এই সিস্টেমের মাধ্যমে দিনে সরাসরি সোলার থেকে ৩০০০ থেকে ৩৫০০ ওয়াট পর্যন্ত লোড চালানো সম্ভব।
সাইফুল ইসলাম জানান, গত দুই মাসের মধ্যে সারাদেশে খুব ভয়াবহ লোডশেডিং গেছে। তারা প্রতি মাসে মোটামুটি এই প্যাকেজগুলো চার-পাঁচশ পিসের ওপর বিক্রি করছেন। সারাদেশে এটার একটা বিশাল ডিমান্ড তৈরি হয়েছে। যারা বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয় করতে চান এবং ব্যাকআপ চান, তাদের জন্য এটি অত্যন্ত লাভজনক।
গুলিস্তানের সুন্দরবন স্কয়ার সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ী মোতালেব হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, গ্রাহক যদি আরও শক্তিশালী ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যাকআপের জন্য ৫ কিলোওয়াটের (৫০০০ ওয়াট) একটি পূর্ণাঙ্গ সেটআপ নিতে চান, তবে তার হিসাবটি কিছুটা ভিন্ন হবে। এক্ষেত্রে জিঙ্কো বা লনজি ব্র্যান্ডের প্যানেল ব্যবহার করতে পারেন।
তার দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ৫ কিলোওয়াটের একটি হাইব্রিড ইনভার্টারের দাম পড়বে প্রায় ৩৮ হাজার টাকা। ৪ থেকে ৫ কিলোওয়াটের প্যানেলের খরচ পড়বে প্রায় ৮৪ হাজার টাকা। এর সঙ্গে সাকো বা এলফি টাপসোন কোম্পানির ওয়াল মাউন্ট সিস্টেমের ৪৮ ভোল্ট ১০০ অ্যাম্পিয়ারের লিথিয়াম ব্যাটারির দাম পড়বে প্রায় ৯৮ হাজার টাকা।
মাউন্টিং স্ট্রাকচার, ক্যাবল ও অন্য আনুষঙ্গিক জিনিসের জন্য ১০-১২ হাজার টাকা এবং দক্ষ টেকনিশিয়ানের মজুরি বাবদ আরও ১২ হাজার টাকা খরচ হবে। সব মিলিয়ে মানসম্মত বড় সেটআপের ক্ষেত্রে খরচ দুই লাখ টাকা বা তার কিছু বেশি হতে পারে। তবে এটি দীর্ঘ ২০ থেকে ২৫ বছর অনায়াসে সেবা দেবে বলে জানান বিক্রেতারা।
একই মার্কেটের পাবনা ইলেকট্রিক অ্যান্ড সোলার দোকানের স্বত্বাধিকারী মো. আল-আমিন বলেন, বর্তমানে ঢাকার পাশাপাশি মফস্বল ও জেলা শহরগুলোতে সোলারের বিপুল চাহিদা তৈরি হয়েছে। গ্রাহকরা এখন আর সস্তা বা নিম্নমানের সোলার কেনেন না, তারা চান ওয়ান-টাইম ইনভেস্টমেন্ট।
তিনি জানান, একটি ভালো মানের ২ থেকে ৫ কিলোওয়াট সিস্টেমের জন্য দেড় থেকে দুই লাখ টাকা খরচ হলেও এর স্থায়িত্ব অনেক বেশি। গ্রাহকদের ২০ বছরের প্যানেল ওয়ারেন্টি ও ব্যাটারিতে ৫ বছরের গ্যারান্টি দিচ্ছেন। ৪৮ বা ৬০ ভোল্টের ১০০ অ্যাম্পিয়ার লিথিয়াম ব্যাটারিগুলো দিনে সোলার থেকে চার্জ হয়ে রাতে লোডশেডিংয়ের সময় নিরবচ্ছিন্ন ব্যাকআপ নিশ্চিত করে। ফলে একবার টাকা খরচ করলে গ্রাহক দীর্ঘদিনের জন্য নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।
ক্রেতারা যা বলছেন
গুলিস্তানের কাপ্তানবাজার কমপ্লেক্সের এক দোকানে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন ব্যাটারি ও ইনভার্টারের ক্ষমতা দেখছিলেন ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা প্রকৌশলী তানভীর আহমেদ। দোকানির সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ ধরে হিসাব মিলিয়ে দেখছিলেন কত ইউনিট বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে, আর কত দিনের মধ্যে বিনিয়োগ উঠে আসতে পারে।
কথা বলতে গিয়ে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, কয়েক মাস ধরেই বাসার জন্য একটি বড় সোলার সেটআপ নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। কারণ গরমে এসি, ফ্রিজ ও অন্য বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালাতে গিয়ে বিদ্যুৎ বিল অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
তানভীর আহমেদ বলেন, আমার চার রুমের ফ্ল্যাট। আগে গরমের সময় প্রতি মাসে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিল আসতো। এখন হিসাব করে দেখছি, যদি ৩ থেকে সাড়ে ৩ কিলোওয়াটের একটা ভালো হাইব্রিড সিস্টেম লাগাই, তাহলে দিনের বেলা পুরো এসি আর ফ্রিজ সোলারে চালানো যাবে।
আজ বিভিন্ন দোকান ঘুরে খোঁজ নিচ্ছি। প্রায় দুই লাখ টাকার মতো খরচ পড়বে বলছে। তবে বিদ্যুৎ বিল যেভাবে বাড়ছে, তাতে দু-তিন বছরের মধ্যেই টাকাটা উঠে আসবে বলে মনে করেন তিনি।
দোকানে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন প্যানেলের মান যাচাই করছিলেন কুমিল্লার লাকসামের ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানও। গ্রামের বাড়ি ও দোকানের জন্য বড় ধরনের একটি সেটআপ নিতে চান তিনি।
তিনি বলেন, আমাদের এলাকায় দিন-রাত মিলিয়ে চার-পাঁচ ঘণ্টা লোডশেডিং এখন নিয়মিত ঘটনা। দোকানে ফ্রিজের জিনিস নষ্ট হয়, বাসায়ও খুব সমস্যা হয়। তাই এবার ভালো একটা হাইব্রিড সিস্টেম নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
সুন্দরবন স্কয়ার সুপারমার্কেটের আরেক দোকানে লিথিয়াম ব্যাটারি সম্পর্কে বিস্তারিত জানছিলেন সাভারের গৃহিণী রাবেয়া খাতুন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করেই সোলার নেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতে এসেছেন তিনি।
রাবেয়া খাতুন বলেন, গরমে বাচ্চাদের খুব কষ্ট হয়। রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে ঘুমাতে পারে না, পড়াশোনাও ব্যাহত হয়। তাই ভাবছি এবার একটা ভালো মানের সেটআপ করবো।
তিনি বলেন, বাজারে অনেক ধরনের সিস্টেম আছে। কিন্তু আমরা চাই লিথিয়াম ব্যাটারি আর ভালো হাইব্রিড ইনভার্টার দিয়ে করতে। দোকানিরা বলছেন, প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার মতো খরচ হবে।
আইপিএসের তুলনায় এই সিস্টেম দীর্ঘমেয়াদে বেশি সুবিধাজনক বলেও মনে করেন তিনি।
তার ভাষায়, আইপিএসের ব্যাটারি বারবার নষ্ট হয়। কিন্তু এই লিথিয়াম ব্যাটারিতে মেনটেন্যান্স কম। একবার নিলে অনেক দিন নিশ্চিন্ত থাকা যাবে।
গুলিস্তানের এই দুই মার্কেটের ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের সঙ্গে সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জ্বালানি সংকট ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সরবরাহে যে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, তার সর্বোত্তম বিকল্প হতে পারে নবায়নযোগ্য সৌরশক্তি। দীর্ঘমেয়াদে এটি মাসিক বিদ্যুৎ বিল প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনে। একই সঙ্গে এটি পরিবেশবান্ধব ও লোডশেডিংমুক্ত আধুনিক জীবনযাত্রার নিশ্চয়তা দেয়। তাই সচেতন মানুষ বিদ্যুতের অপেক্ষায় না থেকে নিজের বাড়ির ছাদকেই রূপান্তর করছেন নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে।
সূত্র: জাগো নিউস ২৪