শিরোনাম
◈ তনুর পোশাকে চার পুরুষের ডিএনএ, তদন্তে নতুন গতি পেল পিবিআই ◈ টানা পাঁচ জয়ে রেকর্ড বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সিনেটর শেখ রহমানের: জর্জিয়া স্টেট সিনেট নির্বাচন ◈ মাদক-জুয়ায় জড়িয়ে গ্রামছাড়া, শেষ পরিণতিতে প্রকাশ্যে এলো শিশু রামিসার খুনি সোহেল যত অপকর্ম ◈ শিশু রামিসা হত্যা মামলায় আসামিপক্ষে লড়বেন না ঢাকা বারের কোনো আইনজীবী ◈ রাস্তার পাশে কাঁদতে থাকা দুই শিশু উদ্ধার, মা ও সৎ বাবা গ্রেপ্তার ◈ এবার নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মচারীদের জন্য যে সুখবর জানালো সরকার ◈ বিশ্বব্যাংকের গবেষণা: রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো বছরে লোকসান গুণছে ৮৮ হাজার ২০০ কোটি টাকা ◈ ‌সৌ‌দি প্রো লি‌গে চ্যাম্পিয়ন রোনাল‌দোর আল নাস্‌র ◈ ২৪ দিন পর উদ্ধার কলাবাগান থানার সেই নিখোঁজ এসআই ◈ বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন মাইলফলক অর্জন করল বাংলাদেশ

প্রকাশিত : ২২ মে, ২০২৬, ১০:১৭ দুপুর
আপডেট : ২২ মে, ২০২৬, ০১:০০ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

সমুদ্রের বুকে ভাসমান বিদ্যুৎকেন্দ্র ‘পাওয়ারশিপ’, যেভাবে বদলে দিচ্ছে জ্বালানি সমীকরণ

স্থলভাগে মাইলের পর মাইল জমি অধিগ্রহণ, বছরের পর বছর ধরে অবকাঠামো নির্মাণ আর গ্রিড লাইনের দীর্ঘসূত্রতা—একটি প্রথাগত বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর চিরচেনা চিত্র এটি। কিন্তু বর্তমান বিশ্বের তীব্র জ্বালানি সংকট ও দ্রুত বর্ধনশীল বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে এই চেনা সমীকরণ বদলে দিচ্ছে এক অভিনব প্রযুক্তি: ‘পাওয়ারশিপ’ বা ভাসমান বিদ্যুৎকেন্দ্র। বিশাল আকৃতির একেকটি জাহাজ, যার পেটের ভেতর লুকিয়ে আছে আস্ত একটি আধুনিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। সমুদ্রের বুকে নোঙর ফেলেই যা নিমিষে আলো ছড়াতে পারে পুরো একটি বড় শহরে।

বিশ্বজুড়ে যখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট তীব্র রূপ নিচ্ছে, তখন এই ভাসমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো হয়ে উঠেছে তাৎক্ষণিক ও কার্যকর সমাধানের এক বড় হাতিয়ার। আর এই প্রযুক্তির একেবারে শিখরে অবস্থান করছে বিশ্বের বৃহত্তম পাওয়ারশিপ ‘এমভি কারাদেনিজ পাওয়ারশিপ ওসমান খান’।

সমুদ্রের বুকে ৪৭০ মেগাওয়াটের দানব

লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী ও তুর্কি জায়ান্ট ‘কারপাওয়ারশিপ’-এর মালিকানাধীন এই জাহাজটি প্রকৌশলবিদ্যার এক অনন্য বিস্ময়। প্রায় ৩০০ মিটার দীর্ঘ এবং ৫০ মিটার চওড়া ভাসমান বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদন ক্ষমতা শুনলে চমকে উঠতে হয়—৪৭০ মেগাওয়াট।

সহজ কথায়, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার মতো একটি মেগাসিটির বড় অংশের এককালীন লোডশেডিং দূর করতে বা আফ্রিকার একটি ছোট দেশের মোট চাহিদার এক-চতুর্থাংশ মেটাতে এই একটি জাহাজই যথেষ্ট। বর্তমানে ঘানার ২৩ শতাংশ বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করছে ভাসমান বিদ্যুৎকেন্দ্রটি।

এক লাখ টনেরও বেশি ওজনের এই দানবীয় জাহাজে বসানো রয়েছে ২৪টি ডুয়েল-ফিউয়েল ইঞ্জিন এবং শক্তিশালী স্টিম টারবাইন, যা কম সময়ে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম।

মালবাহী জাহাজ থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্র

‘ওসমান খান’ জাহাজটির জন্ম কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে হয়নি। ২০০০ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং শিপবিল্ডিং ইয়ার্ডে যখন এটি প্রথম পানিতে ভাসে, তখন এর পরিচয় ছিল ‘প্যাসিফিক ট্রায়াঙ্গেল’ নামে একটি সাধারণ বাল্ক ক্যারিয়ার বা মালবাহী জাহাজ। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে মহাসমুদ্রে কয়লা বা আকরিক লোহা বয়ে বেড়ানোই ছিল এর কাজ।

২০১৬ সালে জাহাজটির ভাগ্য বদলে যায়। তুরস্কের কারাদেনিজ হোল্ডিং এটি কিনে নেয় এবং নিজেদের ‘হাট-সান’ শিপইয়ার্ডে শুরু হয় এক অবিশ্বাস্য রূপান্তর প্রক্রিয়া। জাহাজের ভেতরের বিশালাকার মাল রাখার জায়গাগুলো (হোল্ড) কেটে সেখানে বসানো হয় আধুনিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিট, ট্রান্সফরমার ও কন্ট্রোল রুম। একটি সাধারণ কার্গো জাহাজ রূপ নেয় বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী ভাসমান বিদ্যুৎকেন্দ্রে।

ঘানার অন্ধকার দূর করার কারিগর

এই অভিনব বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উপযোগিতা সবচেয়ে ভালোভাবে টের পেয়েছে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ ঘানা। তীব্র বিদ্যুৎ ঘাটতি এবং লোডশেডিংয়ে দেশটির অর্থনীতি যখন বিপর্যস্ত, তখন ঘানা সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগ (ইসিজি) কারপাওয়ারশিপের সঙ্গে ১০ বছরের একটি চুক্তি করে।

২০১৭ সালে ‘ওসমান খান’ ঘানার তেমা বন্দরে পৌঁছায়। এটি চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেশটির বিদ্যুৎ সংকটের এক বড় সমাধান আসে। বর্তমানে জাহাজটি ঘানার মোট জাতীয় বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ২৫ শতাংশ একাই সরবরাহ করছে।

প্রথমে এটি ভারী জ্বালানি তেল (এইচএফও) দিয়ে চালানো হলেও ২০১৯ সালে জাহাজটিকে ঘানার ‘সেকোন্দি নেভাল বেস’-এ স্থানান্তর করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল, দেশটির নিজস্ব উপকূলীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরাসরি ব্যবহার করা। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ যেমন নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে, তেমনি কার্বন নিঃসরণ কমে পরিবেশের ক্ষতিও কমেছে।

সংকট মেটাতে কেন এই অভিনব সমাধান?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রথাগত স্থলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় পাওয়ারশিপের কিছু অনন্য সুবিধা রয়েছে, যা একে বর্তমান বিশ্বের জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্থাপন: একটি ৪০০ মেগাওয়াটের স্থলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করতে জমি অধিগ্রহণ, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং নির্মাণকাজ মিলিয়ে কমপক্ষে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগে। সেখানে কারপাওয়ারশিপের তৈরি এই জাহাজগুলো যে কোনো দেশের বন্দরে পৌঁছানোর মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করতে পারে।

বিনিয়োগের ঝুঁকিহীনতা: উন্নয়নশীল বা অর্থনৈতিক সংকটে থাকা দেশগুলোর জন্য এককালীন বিশাল পুঁজি খাটিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা বড় বোঝা। পাওয়ারশিপের ক্ষেত্রে দেশগুলোকে কোনো স্থায়ী অবকাঠামো তৈরি করতে হয় না। তারা শুধু উৎপাদিত বিদ্যুতের মূল্য পরিশোধ করে। চুক্তি শেষ হলে জাহাজ আবার অন্য দেশে চলে যায়।

অভাবনীয় গতিশীলতা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা: ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক কারণে কোনো দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে বা যুদ্ধ-বিগ্রহ, ভূমিকম্প ও তীব্র বন্যার কারণে স্থলভাগের বিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে পাওয়ারশিপ দ্রুত সেই অঞ্চলে গিয়ে জরুরি ব্যাকআপ দিতে পারে। আবার কোনো দেশের নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বেড়ে গেলে চুক্তি শেষে জাহাজটি অন্য কোনো অভাবী অঞ্চলে চলে যেতে পারে।

পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ ও ডুয়েল-ফিউয়েল প্রযুক্তি

পাওয়ারশিপ নিয়ে পরিবেশবাদীদের মনে দীর্ঘদিনের একটি প্রশ্ন ছিল—এগুলোর কার্বন নিঃসরণ মাত্রা। তবে আধুনিক প্রযুক্তি এই উদ্বেগেরও বড় সমাধান এনেছে। ‘ওসমান খান’-এর মতো আধুনিক পাওয়ারশিপগুলো ‘ডুয়েল-ফিউয়েল’ বা দ্বিমুখী জ্বালানি প্রযুক্তিতে চলে।

এর মানে হলো, এটি যেমন তরল জ্বালানিতে চলতে পারে, তেমনি এটি শতভাগ প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজিতেও চলতে সক্ষম। প্রাকৃতিক গ্যাসে চলার কারণে এই জাহাজগুলো থেকে ক্ষতিকারক সালফার নিঃসরণ প্রথাগত কয়লা বা তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ কম হয়। এর গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের মাত্রাও তুলনামূলক কম।

সংকটের নতুন সমাধান

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও বর্তমান ইরান যুদ্ধের জেরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার যখন চরম অস্থির, তখন অনেক উন্নত দেশও এখন এই ভাসমান সমাধানের দিকে ঝুঁকছে। ইউরোপের বেশ কিছু দেশ শীতকালে তাদের সম্ভাব্য বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলায় কারপাওয়ারশিপের সঙ্গে আলোচনা করছে।

২০২২ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের চার সদস্য প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট (২ গিগাবাইট) বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য কারপাওয়ারশিপের সঙ্গে আলোচনা চালায়। এই পরিমাণ বিদ্যুৎ দিয়ে ইউরোপের প্রায় ৫০ লাখ পরিবারকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব। এছাড়া, রুশ হামলায় ইউক্রেনের বিদ্যুৎ গ্রিড ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে, ২০২৪ সালের শীতকালীন সংকট মোকাবিলায় এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সচল রাখতে ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি ও প্রতিবেশী দেশ মলদোভার মাধ্যমে কারপাওয়ারশিপের সঙ্গে আলোচনা বহুদূর এগিয়ে নেওয়া হয়।

এমনকি, জার্মানির মতো বড় শিল্পোন্নত দেশও তাদের পারমাণবিক ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করার প্রক্রিয়ার মাঝে আকস্মিক গ্যাস সংকট দেখা দিলে জরুরি ব্যাকআপ হিসেবে এ ধরনের ভাসমান পাওয়ারশিপ ব্যবহারের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখেছে।

কারপাওয়ারশিপ দাবি করেছিল, তারা মাত্র ৩০ দিনের মধ্যে জাহাজগুলোকে ইউরোপের বন্দরে নোঙর করিয়ে গ্রিডে যুক্ত করতে পারবে। এছাড়া ইউরোপের তৎকালীন আকাশচুম্বী বাজারদরের তুলনায় তারা প্রায় অর্ধেক দামে (২৫ সেন্ট প্রতি কিলোওয়াট/ঘণ্টা) বিদ্যুৎ দেওয়ার প্রস্তাব করেছিল।

বর্তমানে ‘এমভি কারাদেনিজ পাওয়ারশিপ ওসমান খান’ কেবল একটি জাহাজ নয়, এটি বিশ্বের পরিবর্তিত জ্বালানি রাজনীতির এক চলমান প্রতীক। স্থলভাগের সীমাবদ্ধতাকে জয় করে সমুদ্রের বুক থেকে বিদ্যুৎ এনে দেওয়ার এই অভিনব সমাধান আগামী দিনগুলোতে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বড় আশার আলো হয়ে থাকবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

সূত্র: উইকিপিডিয়া, ব্লুমবার্গ, ইউরোনিউজ, পাওয়ার ম্যাগাজিন, কারপাওয়ারশিপ

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়