শিরোনাম
◈ ঢালাও ভিসা-মুক্ত প্রবেশ মেয়াদ কমাচ্ছে থাইল্যান্ড, ফিরছে কঠোর নিয়ম ◈ মোদিকে প্রশ্ন করে ভাইরাল হওয়া সেই সাংবাদিক সম্পর্কে যা জানা গেল (ভিডিও) ◈ রংপুরে গরুর থাকছে আবাসিক হোটেলে, মিলছে নিরাপদ আশ্রয়, গরুপ্রতি ৫০ টাকা নেওয়া হয় ◈ গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে কাজ করছে সরকার: আনসার-ভিডিপি সমাবেশে তারেক রহমান ◈ ভারতে যেভাবে কামাল মাওলা মসজিদ হয়ে গেল মন্দির: আল জাজিরা অনুসন্ধান ◈ ইরান কি বিশ্বকাপে খেলবে, কী করতে চাইছে ফিফা ও যুক্তরাষ্ট্র? ◈ চট্টগ্রাম-ঢাকা তেল পাইপলাইনের কাজ শেষ, জুনের শেষে পুরোদমে জ্বালানি সরবরাহ ◈ হাম ও হামের উপসর্গে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু ◈ সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কত, কোন গ্রেডে কী কী ভাতা ও সুবিধা ◈ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় তিস্তা প্রকল্পে আসছে বড় সংশোধন

প্রকাশিত : ১৯ মে, ২০২৬, ০৭:২৮ বিকাল
আপডেট : ১৯ মে, ২০২৬, ১১:৪৯ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

আন্দামানে কেন মেগাপোর্ট বানাচ্ছে ভারত?

আন্দামান সাগরের এক প্রত্যন্ত দ্বীপে বুলডোজার দিয়ে উপড়ে ফেলা হচ্ছে আদিম অরণ্য। সেখানে নির্মাণ করা হচ্ছে ৯ বিলিয়ন (৯০০ কোটি) ডলারের একটি মেগাপোর্ট ও উপশহর। পাশাপাশি সামরিক ও বেসামরিক- উভয় খাতে ব্যবহারের জন্য আধুনিকায়ন ও নতুন করে নির্মাণ করা হবে রানওয়ে।

প্রত্যন্ত এই দ্বীপটির নাম গ্রেট নিকোবর। প্রশ্ন হলো- ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি থেকে প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার দূরের এই দ্বীপে কেন আধুনিকায়নের তোড়জোড়? ভারত মহাসাগরে এর কৌশলগত গুরুত্বই বা কী? এটি কি চীনের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ নীতিকে মোকাবিলার কৌশল? 

এসব প্রশ্নের উত্তরের আগে ফিরতে হবে গত বছরের জানুয়ারিতে। সে মাসে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে ভারতীয় গণমাধ্যম টিভি নাইন বাংলা। শিরোনাম ছিল- ‘সব দিক দিয়ে ভারতকে ঘিরতে চাইছে চীন, শুরু করেছে স্ট্রিং অব পার্লস’। ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, রপ্তানির উদ্দেশে শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরে তেল শোধনাগার তৈরি করবে চীন। বন্দর নিয়ে দুই দেশের মধ্যে চুক্তিও হয়েছে। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে শঙ্কা করা হচ্ছে, বেইজিং সেখানে সামরিক ঘাঁটিও বানাতে পারে। 

একই বছরের মে মাসে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে লন্ডনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস)’। এতে বলা হয়, চীনের জ্বালানি পরিবহনের জন্য ভারত মহাসাগর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ভারত মহাসাগরের গুরুত্ব আছে।

চীনের এই ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নিয়ে ভারত আগে থেকেই উদ্বিগ্ন ছিল। কয়েক মাস আগে দ্য ডিপ্লোম্যাটের এক নিবন্ধে (সেপ্টেম্বর, ২০২৫) নয়াদিল্লির ‘সেন্টার ফর এয়ার পাওয়ার স্টাডিজের’ গবেষণা সহযোগী রাধে তাম্বি লিখেন, ‘বেইজিং ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার আগেই ভারতের উচিত সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া।’

একই মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর এক ভাষণে গ্রেট নিকোবর দ্বীপে মেগা প্রকল্পের কথা উল্লেখ করেন। তিনি ঘোষণা দেন,  ‘প্রকল্পটি কৌশলগত, প্রতিরক্ষা এবং জাতীয় নিরাপত্তার দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি ভারত মহাসাগরীয় এলাকায় জলপথ ও আকাশপথে যোগাযোগের কেন্দ্রে পরিণত হবে।’

কেন গ্রেট নিকোবর: কৌশলগত দিক

মূলত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই ৯১০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দ্বীপটি গুরুত্বপূর্ণ। এটি বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত জলপথ মালাক্কা প্রণালির প্রবেশদ্বারে অবস্থিত। এই প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ সম্পন্ন হয়। এই জলপথটি ‘ইস্ট-ওয়েস্ট ট্রান্সপোর্ট করিডর’ বা পূর্ব-পশ্চিম নৌপথের সংযোগস্থল হিসেবে পরিচিত।

চলতি মাসের শুরুতে (১ মে) ভারতের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো (পিআইবি) তাদের ওয়েবসাইটে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, গ্রেট নিকোবর ‘ইস্ট-ওয়েস্ট ট্রান্সপোর্ট করিডরের’ প্রায় কাছাকাছি হওয়ায় ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে দ্বীপটিকে কৌশলগত সামুদ্রিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রে রূপান্তর করা সম্ভব।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে চীন, জাপান, সিঙ্গাপুর থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপগামী জাহাজ ‘ইস্ট-ওয়েস্ট ট্রান্সপোর্ট করিডর’ বা পূর্ব-পশ্চিম নৌপথ ব্যবহার করে। পিআইবি তাদের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করে, ভারতের বন্দরগুলোতে বড় জাহাজ নোঙরের জন্য পর্যাপ্ত গভীরতা নেই। এ কারণে পণ্যবাহী জাহাজগুলোকে শ্রীলঙ্কার কলম্বো ও সিঙ্গাপুর হয়ে ঘুরে যেতে হয়। এতে ভারত প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারায়। এই বাণিজ্য নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে মিয়ানমার, চীন ও শ্রীলঙ্কা ইতোমধ্যে গভীর বন্দর অবকাঠামো নির্মাণ করছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গ্রেট নিকোবরের গ্যালাথিয়া বে-তে আন্তর্জাতিক কনটেইনার খালাস বন্দর গড়ে তোলা হচ্ছে।

গ্রেট নিকোবরের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়ে সোমবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বার্তা সংস্থা এএফপি। এর একাংশে বলা হয়েছে, ভারতের উত্থান ঠেকানো এবং নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষায় চীন দীর্ঘদিন ধরে ভারত মহাসাগরের চারপাশে বিভিন্ন স্থাপনা বা বন্দর উন্নয়ন করার চেষ্টা করছে। এটি ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ নামে পরিচিত। ভারত এই কৌশলকে তাদের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতি দিয়ে মোকাবিলা করতে চাইছে।

‘স্ট্রিং অব পার্লস’ বনাম ‘অ্যাক্ট ইস্ট’

যুক্তরাজ্যভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক লিডস পলিসি ইনস্টিটিউট তাদের ওয়েবসাইটের এক নিবন্ধে লিখেছে, ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ বলতে চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে শুরু করে সুদানের দক্ষিণাঞ্চলীয় পোর্ট সুদান পর্যন্ত বিস্তৃত সামরিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা এবং সমুদ্রপথে মালার একটি নেটওয়ার্ককে বোঝায়। এই মালার প্রতিটি ‘পার্ল’ বা মুক্তা একেকটি কৌশলগত পয়েন্টকে নির্দেশ করে। বন্দর ও বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পের এই নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে চীন তাদের প্রভাব বলয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। এর ফলে তারা মালাক্কা প্রণালি এবং বাব-আল-মান্দেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে।

লিডস বলছে, এই উন্নয়নগুলো কেবল বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক প্রভাবই বাড়াচ্ছে না, বরং তাদের নৌবাহিনী মোতায়েন এবং সামরিক শক্তি প্রদর্শনের সক্ষমতাও বৃদ্ধি করছে। চীনের এই বিস্তৃত নৌ-সক্ষমতা আঞ্চলিক নিরাপত্তার সমীকরণ ওলটপালট করে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রতিষ্ঠিত নৌ-শক্তিগুলোকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা আরো বৃদ্ধির কারণ হবে।

অপরদিকে ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির লক্ষ্য এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, শুরুতে এই নীতিকে শুধু অর্থনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে নেওয়া হয়েছিল। পরে সেটি রাজনৈতিক, কৌশলগত ও সাংস্কৃতিক মাত্রা পেয়েছে। ভারত ইতোমধ্যে ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ানের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্বমূলক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।

এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রেট নিকোবর নিয়ে ভারতের পরিবেশ আদালতও বলেছেন, এলাকাটি চীনের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ কৌশলের মধ্যে অবস্থিত। তাই ভারত সরকার তাদের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির মাধ্যমে সেটিকে মোকাবিলা করতে চাইছে। নয়াদিল্লিভিত্তিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ নিতিন গোখলে বার্তা সংস্থাটিকে বলেন, দ্বীপটি ভারতের জন্য এমন এক রণতরীর মতো যা কখনো ডোবে না। ফলে এটি নতুন এক দিগন্তের সূচনা করছে।

গ্রেট নিকোবরে যা তৈরি হচ্ছে

পিআইবির বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, প্রকল্পের প্রধান অবকাঠামোগুলোর মধ্যে আছে ১ কোটি ৪২ লাখ টিইইউ ধারণক্ষমতার একটি আন্তর্জাতিক কনটেইনার খালাস টার্মিনাল। প্রতি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৪ হাজার যাত্রী যাতায়াতের সুবিধাসম্পন্ন একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং একটি পরিকল্পিত উপশহর বা টাউনশিপ।

এএফপি বলছে, এই প্রকল্পের জন্য দ্বীপটির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বনাঞ্চল কেটে সাফ করা হবে। সেখানে সব মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ আদিবাসীর বসবাস। শিকার ও সংগ্রহের ওপর নির্ভরশীল এই মানুষগুলো বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ এড়িয়ে চলেন। 

আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের গভর্নর দেবেন্দ্র কুমার যোশীর বরাত দিয়ে এএফপি জানিয়েছে, নির্মাণকাজ শেষ হলে বন্দরটি ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কনটেইনার খালাসের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। এটি সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার পোর্ট ক্লাংয়ের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।

যোশী আরো জানান, দ্বীপপুঞ্জের রাজধানী শ্রী বিজয়পুরম এবং গ্রেট নিকোবরে দুটি নতুন বিমানবন্দর তৈরি করা হবে। পুরনো রানওয়েগুলো হবে ৩ কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ। এগুলোর সবকটিই সামরিক ও বাণিজ্যিক উভয় ধরনের ফ্লাইটের জন্য ব্যবহার হবে।

‘অর্থহীন কথাবার্তা’

ভারতের লেখক মনীশ চান্ডি বিভিন্ন সময় গ্রেট নিকোবরের গ্রামগুলোতে ভ্রমণ করেছেন। তিনি এই প্রকল্পের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এএফপিকে মনীশ বলেন, এই বিশাল অংকের বিনিয়োগ কীভাবে অর্থনৈতিকভাবে তুলে আনা সম্ভব- সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট রূপরেখা নেই।

অবকাঠামো নির্মাণের জন্য দ্বীপের যে পরিমাণ বনাঞ্চল উজার করা হবে সেটির ক্ষতিপূরণ হিসেবে নতুন চারা রোপণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ভারত সরকার। তবে সে চারাগুলো লাগানো হবে নিকোবর থেকে অনেক দূরের হরিয়ানা রাজ্যে। ক্ষোভ প্রকাশ করে মনীশ চান্ডি বলেন, এসব সম্পূর্ণ অর্থহীন কথাবার্তা।

সূত্র: সমকাল

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়