প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শনিবার ভোরে ইরান হামলা শুরু করা হয়েছিল অত্যন্ত সুক্ষ্ম হিসাব-নিকাশ করে। ওই সময় এশিয়ার বাজার এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফিউচার মার্কেট বন্ধ থাকায় টানা ৩৬ ঘণ্টা হামলার সুযোগ পায় ওয়াশিংটন, যার ফলে সোমবার বাজার খোলার আগেই প্রাথমিক ধাক্কা সামলে নেওয়ার সুযোগ পায় বিনিয়োগকারীরা। এমনকি ওই সপ্তাহান্তে বিটকয়েনের অস্বাভাবিক উত্থানও অনেককে বিস্মিত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান যুদ্ধের প্রতিটি পদক্ষেপ কি তবে সুপরিকল্পিতভাবে শেয়ার বাজারকে কেন্দ্র করে সাজানো হচ্ছে? সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধ পরিচালনার কৌশল এবং বিশ্ববাজারের উঠানামা বিশ্লেষণ করে এমনটাই দাবি করছেন বিশেষজ্ঞরা।
যুদ্ধের দ্বিতীয় সপ্তাহে যখন তেলের দাম বৃদ্ধি এবং স্টক মার্কেটে ধস শুরু হয়, তখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তড়িঘড়ি করে দাবি করেন যে যুদ্ধ ‘শিডিউলের চেয়েও আগে’ শেষ হবে। তার এই মন্তব্যের পরপরই এসএন্ডপি (S&P) ইনডেক্স ঘুরে দাঁড়ায় এবং তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৯০ ডলারের নিচে নেমে আসে।
২০২৬ সালের মে মাসের তথ্যানুযায়ী, ট্রাম্পের জ্বালানি নীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনা (ইরান যুদ্ধ) বিশ্ববাজারে তেলের দামের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। ট্রাম্পের বক্তব্য ও ভেনেজুয়েলা বা মধ্যপ্রাচ্য সংক্রান্ত পদক্ষেপের পর মার্কিন তেল শেয়ারের দর ওঠানামা করছে।
ইরান কর্তৃক কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার ঘোষণার ঠিক আগমুহূর্তে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে প্রায় ৭৬০ মিলিয়ন ডলারের এক রহস্যময় লেনদেনের তথ্য ফাঁস হয়েছে। রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণার মাত্র ২০ মিনিট আগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অপরিশোধিত তেলের দাম কমার পক্ষে এই বিশাল বাজি ধরেন।
লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপ (LSEG)-এর তথ্যানুযায়ী, গ্রিনিচ মান সময় ১২:২৪ থেকে ১২:২৫ মিনিটের মধ্যে মাত্র এক মিনিটের ব্যবধানে একাধিক বিনিয়োগকারী প্রায় ৭,৯৯০ লট ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার বিক্রি করে দেন। এই লেনদেনের সময়োচিত ধরন দেখে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার প্রতিনিধি স্যাম লিকার্ডো একে 'ইনসাইডার ট্রেডিং' বা আগাম তথ্য ফাঁসের ঘটনা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি এ বিষয়ে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (SEC) চেয়ারম্যান পল অ্যাটকিনসের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠিও দিয়েছেন।
এদিকে, এই ঘটনা নিয়ে সরব হয়েছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) এক বার্তায় তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের অসারতা তুলে ধরে বলেন, তেলের একটি নিজস্ব বাস্তব বাজারমূল্য (Dated Brent) রয়েছে, যা শিপমেন্টের মাধ্যমে প্রমাণিত। কিন্তু মার্কিন ট্রেজারি বা সরকারি বন্ডগুলো বর্তমানে কেবল 'অনুমান' বা 'সেন্টিমেন্টের' ওপর ভিত্তি করে টিকে আছে। গালিবাফ আরও অভিযোগ করেন যে, ওয়াল স্ট্রিটের কিছু অসাধু চক্র তেহরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নীতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে এবং তিনি এই চক্রের মুখোশ উন্মোচন করারও হুঁশিয়ারি দেন।
ট্রাম্প এর আগে ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ করার হুমকি দিলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম তাৎক্ষণিকভাবে ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। তবে পরের দিন সুর নরম করে তিনি একে ‘অস্তিত্বহীন কূটনৈতিক সাফল্য’ হিসেবে অভিহিত করেন। প্রেসিডেন্টের এই আকস্মিক ডিগবাজির ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ায় এবং অপরিশোধিত তেলের ফিউচার মার্কেটে ব্যাপক দরপতন ঘটে।
বিশ্লেষকরা এই ঘটনাকে ট্রাম্পের সেই পুরোনো রণকৌশল হিসেবে দেখছেন, যেখানে তিনি প্রথমে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করেন এবং পরে কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই পিছু হটেন। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ভূ-রাজনৈতিক এই অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। সূত্র: বিবিসি, বিজনেস ইনসাইডার, নিউ রিপাবলিক।