শিরোনাম
◈ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল সংকট: চীনের তেলে রহস্যজনক অনাগ্রহ, ভারতকে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি ◈ ওসমান হাদি হত্যা মামলার ২ আসামিকে ফেরত পাঠাতে সম্মত ভারত ◈ শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে ফেরত চেয়েছে বাংলাদেশ ◈ দর্শক‌দের মুসলিমবিদ্বেষী স্লোগান, ফিফার শাস্তিমূলক তদন্তের মুখে স্পেন ◈ রাষ্ট্রীয় সফরে ভারত যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কোন্নয়নসহ আলোচনায় ৩ চুক্তি ◈ হামের উপসর্গ নিয়ে একদিনে আরও ১০ শিশুর মৃত্যু ◈ দিল্লি না ঢাকা'-র রেশ কাটিয়ে দিল্লি ও ঢাকা কি কাছাকাছি আসতে পারবে? ◈ ক্রিকেট বো‌র্ডে ক্রিকেট নেই, আ‌ছে সার্কাস: আফতাব আহ‌মেদ ◈ বি‌সি‌বি‌তে তামিম ইকবা‌লের নেতৃত্ব নিয়ে আশাবাদী ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড ◈ ঢামেক চিকিৎসকদের সঙ্গে ঢাবি শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ, জরুরি সেবা বন্ধ

প্রকাশিত : ০৮ এপ্রিল, ২০২৬, ০৬:৫৫ বিকাল
আপডেট : ০৮ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ডলারের বিকল্প গড়ে তুলতে হরমুজ ঘিরে চীন-ইরানের মহাপরিকল্পনা: আলজাজিরার বিশ্লেষণ

ইরানের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে অস্থির করে তুলেছে। এমন সময়ে এসে আজ বুধবার (৮ এপ্রিল) দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এই পরিস্থিতির মধ্যেই আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার একটি পুরোনো বিতর্ককে সামনে এনে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে ইরান ও চীন।

ইরান ও চীনের অভিযোগ, বিশ্ব অর্থনীতিতে মার্কিন ডলারের আধিপত্য বা ‘ডলার হেজেমনি’ শেষ হওয়া উচিত।

এ ছাড়া মার্কিনিদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের প্রাধান্য ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিপক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে আসছে।

২০২৩ সালে জেপি মর্গান চেজের একটি অনুমান অনুযায়ী, বৈশ্বিক তেল বাজারের প্রায় ৮০ শতাংশ লেনদেন এখনো ডলারে নিষ্পত্তি হয়, যা এই মুদ্রার বৈশ্বিক আধিপত্যকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

হরমুজ প্রণালি ও ‘ইউয়ান’ ব্যবহারের উদ্যোগ

বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হলো হরমুজ প্রণালি, যেখান দিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। এই প্রণালি নিয়ন্ত্রণের অবস্থান কাজে লাগিয়ে চীনা মুদ্রা ইউয়ানকে বিকল্প হিসেবে সামনে আনতে চাইছে ইরান ও চীন।

বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ইরান এখন কার্যত একটি ‘টোল বুথ’ ব্যবস্থা চালু করেছে, যেখানে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে ইউয়ানে ট্রানজিট ফি পরিশোধ করতে হচ্ছে। যদিও কতগুলো জাহাজ ইতিমধ্যে এই অর্থ পরিশোধ করেছে তা স্পষ্ট নয়, তবে অন্তত দুটি জাহাজ ২৫ মার্চ পর্যন্ত ইউয়ানে অর্থ পরিশোধ করেছে বলে জানিয়েছে লয়েডস লিস্ট।

চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে এই তথ্যের ইঙ্গিতপূর্ণ স্বীকৃতি দিয়েছে।

এদিকে ইরানের জিম্বাবুয়ের দূতাবাস এক পোস্টে জানিয়েছে, বৈশ্বিক তেল বাজারে ‘পেট্রোইউয়ান’ যুক্ত করার সময় এসেছে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে বুধবার থেকে পরবর্তী দুই সপ্তাহ হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার কথা বলেছে তেহরান। তবে এ বিষয়ে চীন বা ইরান কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ ও সাবেক আইএমএফ প্রধান অর্থনীতিবিদ কেনেথ রোগফ বলেন, ‘একদিকে ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে রাজনৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জ জানাতে ইউয়ান ব্যবহারের বিষয়টি সামনে আনছে, অন্যদিকে এটি নিষেধাজ্ঞা এড়ানো এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরো গভীর করার কৌশল।’

‘বহু মেরুকেন্দ্রিক’ আর্থিক ব্যবস্থার ধারণা

ইরান ও চীনের মতে, ইউয়ানের ব্যবহার উভয় দেশের জন্যই লাভজনক। এতে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা-নির্ভর আর্থিক ব্যবস্থাকে পাশ কাটানো সহজ হয় এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের খরচও কমে।

২০২১ সালে স্বাক্ষরিত ২৫ বছরের কৌশলগত অংশীদারি চুক্তির পর থেকে দুই দেশের বাণিজ্য দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।

যুক্তরাজ্যের কিল বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ বোলেন্ট গোকেই বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার গুরুত্ব বোঝে এবং ইউয়ানের ব্যবহার সেই কৌশলের অংশ।

তিনি আরো বলেন, চীনের লক্ষ্য হলো একটি ‘মাল্টিপোলার বা বহুমেরুকেন্দ্রিক আর্থিক বিশ্ব’ গঠন করা, যেখানে ডলারের একক আধিপত্যের পরিবর্তে বিভিন্ন দেশের মুদ্রা প্রভাব বিস্তার করবে।

বর্তমানে ইরানের রপ্তানি হওয়া তেলের ৮০ শতাংশেরও বেশি কিনে নেয় চীন। ইউয়ানের মাধ্যমে অনেক সময় ছাড় দেওয়া মূল্যে তা কিনে নেয় দেশটি। বিনিময়ে ইরান চীন থেকে যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক্স ও শিল্পপণ্য আমদানি করে।

ডলারের আধিপত্য কতটা শক্তিশালী

বিশ্লেষকদের মতে, ইউয়ানের ব্যবহার বাড়লেও বৈশ্বিক মুদ্রা হিসেবে ডলারের বিকল্প হওয়া এখনো অনেক দূরের বিষয়।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং ২০২৪ সালে এক বক্তব্যে ইউয়ানকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সাধারণ মুদ্রা ও ভবিষ্যতের বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে দেখতে চান বলে আশা প্রকাশ করেন।

তবে বাস্তবতা হলো, চীনের কঠোর পুঁজি নিয়ন্ত্রণের কারণে ইউয়ান এখনো সম্পূর্ণভাবে বিনিময়যোগ্য নয়। ফলে বৈশ্বিক পর্যায়ে এর গ্রহণযোগ্যতা সীমিত।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফ-এর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বৈশ্বিক রিজার্ভের ৫৭ শতাংশ ছিল ডলারে, ২০ শতাংশ ইউরোতে এবং মাত্র ২ শতাংশ ইউয়ানে। এছাড়া ২০২৪ সালে আন্ত সীমান্ত বাণিজ্যের মাত্র ৩.৭ শতাংশ ইউয়ানে নিষ্পত্তি হয়েছে, যা ২০১২ সালের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি (১ শতাংশেরও কম) হলেও এখনো সীমিত।

ন্যাটিক্সিসের এশিয়া-প্যাসিফিক প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যালিসিয়া গার্সিয়া হিরেরো বলেন, ইউয়ানের ব্যবহার বৃদ্ধি ডলারের আধিপত্যকে কিছুটা চাপ দিলেও এটি ‘ডি-ডলারাইজেশন’ ঘটানোর মতো নয়।

ধীরে ধীরে পরিবর্তনের ইঙ্গিত

ব্রাসেলসভিত্তিক ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল ইকোনমির পরিচালক হসুক লি মাকিয়ামা মনে করেন, ইরান-চীন বাণিজ্য ডলারের বিকল্প গড়ে তুলতে পারে না, তবে এটি নির্দিষ্ট খাতে প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে ডিফারেন্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ড্যান স্টেইনকব বলেন, ডলারের আধিপত্য দ্রুত শেষ না হলেও ইউয়ানের ব্যবহার ধীরে ধীরে সেই আধিপত্যকে ‘ক্ষয়’ করতে পারে।

অর্থনীতিবিদ কেনেথ রগোফ আরো বলেন, ভবিষ্যতে পরিস্থিতি নির্ভর করবে এই সংঘাতের ফলাফলের ওপর। যদি ইরান ও চীন কৌশলগতভাবে সফল হয়, তবে অনেক দেশ নিজেদেরকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থেকে রক্ষা করতে ডলার নির্ভরতা কমাবে।

বিশ্লেষকদের মতে সার্বিক চিত্র

তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এটি তাৎক্ষণিক কোনো পরিবর্তন নয় বরং দীর্ঘমেয়াদে ধীরে ধীরে ডলারের প্রভাব কমার একটি প্রক্রিয়া।

চীনের সঙ্গে ইরানের এই আর্থিক সমন্বয়কে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে একটি ‘সামান্য কিন্তু ধারাবাহিক চাপ’ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা, যা ডলারের একক আধিপত্যকে সম্পূর্ণ ভাঙার চেয়ে ধীরে ধীরে বিকল্প ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা বাড়াচ্ছে।

বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় ডলারের এই অবস্থান পরিবর্তন আদৌ কতটা সম্ভব হবে, তা নির্ভর করছে আগামী বছরগুলোর ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি ও শক্তির ভারসাম্যের ওপর।

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়