শিরোনাম
◈ কর্মপরিকল্পনার ১৮০ দিন শেষ, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন; হতে পারে দপ্তর রদবদল ◈ হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে বলাকা লাউঞ্জে আগুন ◈ ইয়েমেনে ফের উত্তেজনা, হুতিদের হামলায় নিহত ৫৮ সেনা ◈ বোমা হামলার আশঙ্কায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারির খবর, পুলিশ বলছে গুজব ◈ খাদ্যে ভয়ংকর ভেজাল, মিলেছে ভারী ধাতু ও জীবাণু ◈ শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরাতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করতে হবে: জামায়াত ◈ বাংলাদেশ থেকে আনারস নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে পাকিস্তান সরকার ◈ ঋণের কিস্তি বকেয়া পড়লেই গ্রাহককে যখন-তখন ফোন ও হুমকি দেওয়া যাবে না: আরবিআইয়ের কঠোর নীতিমালা ◈ সৌদিকে ঘিরে ইরানি মিত্রদের সমন্বিত হামলার শঙ্কা, লক্ষ্যবস্তু জ্বালানি স্থাপনা ও বন্দর ◈ ‘আপনি কি গুপ্ত আওয়ামী লীগ’, জবাবে যা বললেন রুমিন ফারহানা

প্রকাশিত : ০৮ এপ্রিল, ২০২৬, ০৩:২১ দুপুর
আপডেট : ০৭ আগস্ট, ২০২৬, ০১:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

পাঁচ কৌশলগত সমুদ্রপথেই নির্ভরশীল বৈশ্বিক বাণিজ্য

ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও কাঁচামালের বাজারে বিশাল ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে। যুদ্ধের একপর্যায়ে তেল পরিবহণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেয় ইরান। গত দুই সপ্তাহে এই সমুদ্রপথ পার হতে চেষ্টাকারী এক ডজনেরও বেশি জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইরান।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই প্রণালি নিরাপদ করার জন্য ইউরোপীয় মিত্রদের চাপ দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টাকে সমর্থন না করলে তা নেটওয়ার ভবিষ্যতের জন্য খুবই খারাপ প্রভাব ফেলবে।

পারস্য উপসাগরে সামুদ্রিক পরিবহণে বাধার কারণে ব্রেন্ট (অপরিশোধিত) তেলের দাম যুদ্ধ শুরুর আগে যা ছিল প্রতি ব্যারেল ৭০ ডলার, তা বেড়ে ১১৫ ডলার ছাড়িয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ভোক্তা পণ্য, কৃষিসংক্রান্ত কাঁচামালসহ বিশ্বের নানা ধরনের বাণিজ্যে।

কিন্তু এই যুদ্ধ আরও একটি বড় সমস্যা সামনে নিয়ে এসেছে। তা হলো, বিশ্ব বাণিজ্য অল্প কয়েকটি সরু সমুদ্রপথের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। এই পথগুলোকে সামুদ্রিক বটলনেকস বা চলাচলের সরু পথ বলা হয়। নিচে বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলো এবং সেগুলোতে বাধা তৈরি হলে সম্ভাব্য ঝুঁকির বিবরণ তুলে ধরা হলো।

হরমুজ প্রণালি

বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত জ্বালানি পথ হলো হরমুজ প্রণালি। এটি পারস্য উপসাগরকে ওমান সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৩৯ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ১৯ শতাংশ এই পথ দিয়েই পরিবহণ করা হয়। বাণিজ্যের অন্যান্য বটলনেকসের তুলনায় হরমুজ প্রণালির বৈশিষ্ট্য হলো, পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি রপ্তানির জন্য এর বিকল্প নেই।

১৯৮০ সাল থেকে ইরান মাঝে মাঝে হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি দিয়েছে। তবে গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের প্রথম ইরান ভূখণ্ডে বিমান হামলার পর জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়েছে, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর উত্তেজনা।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার মতে, এই যুদ্ধের কারণে বিশ্বের তেলের বাজারে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সরবরাহ বিপর্যয় ঘটেছে এবং ক্রুড তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে।

পারস্য উপসাগরে সামুদ্রিক পরিবহণে বাধার প্রভাব জ্বালানি খাতের বাইরেও বিস্তার করেছে। প্রতি বছর ২৬ মিলিয়ন বা ২ কোটি ৬০ লাখের বেশি কন্টেইনার এই অঞ্চলের মাধ্যমে যাতায়াত করে। বিশ্ব সার রপ্তানির উল্লেখযোগ্য অংশও হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে যায়। এই কারণে সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলে দীর্ঘমেয়াদী বাধা বিশ্ব খাদ্য উৎপাদন খরচে সরাসরি প্রভাব ফেলবে।

সুয়েজ খাল

লোহিত সাগরকে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে সুয়েজ খাল। এটি এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে যাত্রাপথ কমিয়ে দেয় অন্তত ১০ দিন। বিশ্বের মোট সামুদ্রিক বাণিজ্যের ১০ শতাংশ এই খাল দিয়ে হয়। এর মধ্যে কন্টেইনার পরিবহণের ২২ শতাংশ, যানবাহন চলাচলের ২০ শতাংশ এবং ক্রুড তেলের ১০ শতাংশ।

মিশরের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই খাল সরাসরি হুমকির মুখে না থাকলেও ২০২১ সালে একটি বড় জাহাজ আটকে যাওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকে খাল মুক্ত নয়। ওই ঘটনায় ছয় দিন সুয়েজ খাল বন্ধ থাকায় প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সর্ববৃহৎ দুর্বলতা হলো লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিতাবে আল মানদাব প্রণালি। ২০২৩ ও ২০২৫ সালে ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায়, ফলে অনেক জাহাজ আফ্রিকা হয়ে যেতে বাধ্য হয়।

পানামা খাল

পানামা খাল প্রশান্ত ও আটলান্টিক সাগরকে সংযুক্ত করে এবং বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ২.৫% নিয়ন্ত্রণ করে। যদিও কম মনে হলেও কন্টেইনারজাত পণ্য, গাড়ি ও উচ্চমূল্যের কার্গো এই খাল দিয়ে বেশি পরিবহন হয়। যুক্তরাষ্ট্রের মোট কন্টেইনার কার্গোর ৪০% এই খালের মধ্য দিয়ে যায়, যার বার্ষিক মূল্য ২৭০ বিলিয়ন ডলার।

খালের দুর্বলতা হলো জলবায়ু এবং রাজনৈতিক ইস্যু। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে খরার কারণে খালের মিঠা পানির স্তর কমে গেলে জাহাজ সংখ্যা ও আকার সীমিত করা হয়।

২০২৫ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প খালের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার হুমকি দেন। খালের কিছু বন্দর হংকংভিত্তিক হাচিসন কোম্পানি পরিচালনা করায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

মালাক্কা প্রণালি

মালাক্কা প্রণালি বিশ্বের ব্যস্ততম সমুদ্রপথ। বিশ্বের সামুদ্রিক বাণিজ্যের ২৪% এই পথ দিয়ে হয়। সমুদ্রপথে ক্রুড তেলের ১০% এবং অটোমোবাইল বাণিজ্যের ২৬% এই পথ দিয়ে পরিবহন হয়। সিঙ্গাপুরের পাশে অবস্থিত এই প্রণালি চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার জ্বালানির প্রধান প্রবেশপথ। চীনের তেলের প্রায় ৮০% এখানে দিয়ে আসে।

মালাক্কা প্রণালিতে ২০২৫ সালে ১৩০টিরও বেশি জলদস্যুতার ঘটনা ঘটেছে। বড় ঝুঁকি হলো রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক ইস্যু। সামুদ্রিক আধিপত্য নিয়ে চীন, যুক্তরাষ্ট্র বা ভারতের মধ্যে উত্তেজনা বাড়লে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। এছাড়া সুনামি ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ঝুঁকিও রয়েছে।

তার্কিশ প্রণালি (বসফোরাস ও দার্দেনেলিস)

কৃষ্ণ সাগর ও ভূমধ্যসাগরের একমাত্র সমুদ্রপথ। বিশ্বের সমুদ্র পরিবহিত বাণিজ্যের ৩% এই প্রণালির মধ্য দিয়ে হয়। ইউক্রেন, রাশিয়া ও রোমানিয়া থেকে বিশ্বের মোট গম রপ্তানির ২০% এই প্রণালিতে পরিবহণ হয়।

সর্বনিম্ন প্রস্থ ৭০০ মিটার, তাই জাহাজ চালানো কঠিন। মন্ট্রেক্স কনভেনশন অনুযায়ী, সামরিক প্রবেশাধিকার তুরস্কের। ২০২২ সালে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর থেকে যুদ্ধজাহাজ চলাচল সীমিত করা হয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল খোলা রাখা হয়েছে। কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের উত্তেজনা বিশ্ব শস্য বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে। শক্তিশালী ভূমিকম্পের ঝুঁকি রয়েছে।

এই পাঁচটি সমুদ্রপথই বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে এগুলো একমাত্র নয়। পুরো বিশ্বে অন্তত ২৪টি কৌশলগত সামুদ্রিক পয়েন্ট বা সমুদ্রপথ আছে। তাইওয়ান, ডোভার ও বেরিং প্রণালি সহ প্রতিটি ঝুঁকির মুখে—ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জলবায়ু পরিবর্তন, পাইরেসি, জলদস্যুতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ। হরমুজ প্রণালিতে চলমান সংকট এই ঝুঁকি আরও স্পষ্ট করেছে, যা বিশ্ববাণিজ্যের ওপর অল্প কয়েকটি সমুদ্রপথের নির্ভরশীলতা প্রদর্শন করে।

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়