ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ বন্ধে পাঁচ দফার একটি যৌথ শান্তি প্রস্তাব প্রকাশ করেছে পাকিস্তান ও চীন। মঙ্গলবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বেইজিং সফরে গিয়ে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-র সঙ্গে বৈঠকের পর এই প্রস্তাব ঘোষণা করেন। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ঝিমিয়ে পড়া কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় বেইজিংয়ের সমর্থন আদায়ে এই সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এ খবর জানিয়েছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, এই সফরের মূল লক্ষ্য ছিল ইরান সংকট নিয়ে দুই দেশের সহযোগিতা জোরদার করা এবং শান্তির পক্ষে নতুন প্রচেষ্টা চালানো। বেইজিং শুরু থেকেই এই যুদ্ধে একটি সতর্ক দূরত্ব বজায় রেখে আসছিল। ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হওয়া সত্ত্বেও চীন মূলত যুদ্ধবিরতির আহ্বান এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিজেদের তেলবাহী জাহাজের নিরাপদ চলাচলের বিষয়ে তেহরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার ওপর জোর দিয়ে আসছে।
মঙ্গলবারের বৈঠকের পর পাকিস্তান ও চীন যৌথভাবে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিসহ অবরুদ্ধ নৌপথগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। দুই দেশই একমত হয়েছে যে ‘সংলাপ ও কূটনীতিই সংঘাত নিরসনের একমাত্র কার্যকর পথ’। তবে যুদ্ধের প্রধান পক্ষগুলোকে আলোচনার টেবিলে আনার ক্ষেত্রে এখনও সুনির্দিষ্ট কোনও অগ্রগতি দেখা যায়নি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন আলোচনা ‘চমৎকার’ চলছে, যদিও তেহরান কোনও ধরনের সরাসরি আলোচনার কথা অস্বীকার করে আসছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ওয়াশিংটনের কাছে অবহেলিত থাকার পর পাকিস্তান এখন নিজেকে একটি আঞ্চলিক কূটনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রমাণ করতে চাইছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনির সরাসরি ট্রাম্প ও ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক রফিউল্লাহ কাকার বলেন, ইসলামাবাদ নিজেকে মুসলিম বিশ্বের একটি প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চায়। ওয়াশিংটন ও উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব জাহির করতে চাইছে তারা।
পাকিস্তানের এই শান্তি প্রচেষ্টার পেছনে নিজস্ব গভীর উদ্বেগও রয়েছে। ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এর আঁচ অশান্ত বেলুচিস্তান প্রদেশে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় পাকিস্তান চরম অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
আরেকটি বড় দুশ্চিন্তার কারণ হলো সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা। ইরানের বাইরে পাকিস্তানেই সবচেয়ে বেশি শিয়া মুসলিমের বসবাস। যুদ্ধ শুরুর পর তেহরানে বোমাবর্ষণের প্রতিবাদে পাকিস্তানে বিক্ষোভ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি সৌদি আরবের সঙ্গে সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণে পাকিস্তান অনিচ্ছা সত্ত্বেও এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
রফিউল্লাহ কাকার সতর্ক করে বলেন, ইরানে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে তা সরাসরি পাকিস্তানের নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলবে। সংঘাত আরও বাড়লে ইসলামাবাদ কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়বে।