ইরানে হামলা হবে। তার ৪৮ ঘণ্টা আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে ফোন করেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। বিরল ওই ফোনকলে কীভাবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনিকে হত্যা করা যাবে তা বাতলে দেন নেতানিয়াহু। ট্রাম্পকে উদ্বুদ্ধ করেন ইরানে হামলা চালাতে। আলোচনা হয় গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে। এই গোয়েন্দা তথ্য ছিল বিরল। ট্রাম্পকে এক্ষেত্রে উৎসাহিত করে রাজি করান নেতানিয়াহু। সিদ্ধান্ত হয় কীভাবে হামলা হবে ইরানে। দুই নেতার এই আলোচনার কেন্দ্রে ছিল ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে ঘিরে একটি স্বল্প সময়ের অপারেশন চালানোর সুযোগ। এর মধ্যে ছিলেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।
এই সুযোগই শেষ পর্যন্ত দুই নেতাকে একটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়। অনেকেই মনে করেন এভাবে ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে টেনে এনেছেন নেতানিয়াহু। এর প্রভাব পড়ে জ্বালানি খাতে এবং সরবরাহে চাপ তৈরি করে। অস্থির হয়ে ওঠে বিশ্ব। বাড়তে থাকে তেলের দাম। দুই নেতার মধ্যে অনুষ্ঠিত হামলা পূর্ববর্তী ওই আলোচনার অডিও মঙ্গলবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সের অনুসন্ধানে ফাঁস হয়েছে। এতে বলা হয়, যুদ্ধ শুরুর সপ্তাহের প্রথম দিকেই পাওয়া গোয়েন্দা তথ্য থেকে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু জানতেন যে, খামেনি ও তার ঘনিষ্ঠরা তেহরানে তার কম্পাউন্ডে একত্রিত হবেন। এটা ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’ বা শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে হামলার জন্য একটি সুযোগ তৈরি করে। এমনটাই জানায় রয়টার্স। তবে নতুন গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, হামলার দিন শনিবার রাত থেকে এগিয়ে শনিবার সকালে নিয়ে আসা হয় ইরানি নেতাদের বৈঠকের সময়। এর ফলে সময় আরও সংকুচিত হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি অভিযানের পক্ষে ছিলেন নেতানিয়াহু। তিনি ট্রাম্পকে যুক্তি দেন- খামেনিকে হত্যা করার জন্য এর চেয়ে ভালো সুযোগ আর আসবে না। পাশাপাশি তিনি বলেন, এটি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অতীতে ইরানের কথিত হত্যাচেষ্টার প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগও হতে পারে। এর মধ্যে ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে কথিত হত্যাচেষ্টার পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়। ওই বিষয়ে মার্কিন আইন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আইআরজিসি’র কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার প্রতিশোধ নিতে এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পাকিস্তানি এক নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রে লোক নিয়োগের চেষ্টা করেছিলেন।
ফোনকলের সময় ইতিমধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অনুমোদন করেছিলেন ট্রাম্প। তবে কখন এবং কীভাবে তা শুরু হবে- সে বিষয়ে তখনো তিনি সিদ্ধান্ত নেননি। এমন সিদ্ধান্তের আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছিল। অনেকেই তখন ধরে নিয়েছিল, হামলা অনিবার্য, শুধু সময়ের অপেক্ষা। খারাপ আবহাওয়ার কারণে আগের একটি সম্ভাব্য হামলার সুযোগও বাতিল করা হয়েছিল। ওই ফোনকলে নেতানিয়াহুর যুক্তি ট্রাম্পের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে কতোটা প্রভাব ফেলেছিল, তা স্পষ্ট নয়। তবে রয়টার্সের সূত্রগুলো বলছেন, এই ফোনকলই ছিল নেতানিয়াহুর শেষ ধাক্কা। এটাই ২৭শে ফেব্রুয়ারি ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ অনুমোদনের পথে ট্রাম্পকে এগিয়ে দেয়। নেতানিয়াহু এই মুহূর্তকে ঐতিহাসিক হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এটি এমন একটি সুযোগ, যার মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্বে অপছন্দের ইরানি নেতৃত্বকে সরানো সম্ভব এবং এতে ইরানের ভেতরে বিদ্রোহ শুরু হতে পারে, যা ১৯৭৯ সাল থেকে চলা ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে উল্টে দিতে পারে।
নির্দেশ দেয়ার পর পরই অভিযানটি দ্রুত এগোয়। ২৮শে ফেব্রুয়ারি শনিবার সকালে প্রথম বোমা হামলা শুরু হয়। সন্ধ্যায় ট্রাম্প ঘোষণা দেন, খামেনি নিহত হয়েছেন। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি সরাসরি ফোনকল নিয়ে মন্তব্য না করলেও বলেন, এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা, নৌবাহিনীকে দুর্বল করা, প্রক্সি বাহিনীকে সহায়তা করার ক্ষমতা বন্ধ করা এবং ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা। নেতানিয়াহুর কার্যালয় বা জাতিসংঘে ইরানের প্রতিনিধির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে নেতানিয়াহু একে ‘ভুয়া খবর’ বলে উড়িয়ে দেন যে, ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে টেনে এনেছে। তিনি বলেন, কেউ কি সত্যিই মনে করে কেউ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে কী করতে হবে তা বলে দিতে পারে? অন্যদিকে ডনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন, হামলার সিদ্ধান্ত ছিল সম্পূর্ণ তার নিজের।
ওদিকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে নতুন হামলা বন্ধ করার সরাসরি নির্দেশনা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। ওভাল অফিসে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শানায়ে তাকাইচির সফরের সময় ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, বুধবার দক্ষিণ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরাইলের হামলার পর তিনি নেতানিয়াহুকে ইরানের তেল ও গ্যাস স্থাপনায় আর হামলা না করার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, আমি তাকে বলেছি, এটা করবেন না এবং তিনি তা করবেন না। তবে ট্রাম্প আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করলেও মাঝে মাঝে মতবিরোধ ঘটে। নেতানিয়াহু এক সংবাদ সম্মেলনে এই আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প ভবিষ্যৎ হামলা স্থগিত রাখতে বলেছেন এবং ইসরাইল তা মেনে নিয়েছে। তবে তিনি দাবি করেন, দক্ষিণ পার্সে হামলা এককভাবে ইসরাইলই করেছে। ইসরাইলের এই হামলার জবাবে ইরান দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়। তারা কাতারের রাস লাফান শিল্প এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানি টার্মিনাল। কাতার এনার্জি এই হামলাকে বড় ধরনের ক্ষতি বলে উল্লেখ করেছে। এরপর আরও হামলায় রাস লাফানের গ্যাস স্থাপনাগুলোতে আগুন ধরে যায়। ফলে কাতার সাময়িকভাবে গ্যাস উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। পরে দেশটি তার দূতাবাস থেকে ইরানি সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বহিষ্কার করে।