প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশের এক বছর পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সদস্যপদ ত্যাগের প্রক্রিয়া বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তবে এই প্রস্থানের সময় ওয়াশিংটন প্রায় ২৬ কোটি মার্কিন ডলারের বকেয়া পরিশোধ করেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও জনসেবা বিভাগ (এইচএইচএস) নিশ্চিত করেছে, সংস্থাটির সঙ্গে সব ধরনের অর্থায়ন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং ডব্লিউএইচওর সদর দপ্তর ও বিভিন্ন কার্যালয় থেকে মার্কিন কর্মীদের ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে সংস্থাটির শীর্ষ দাতা দেশ হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্র এখন থেকে ডব্লিউএইচওর কোনো নেতৃত্বদানকারী পর্ষদ বা কার্যকরী গোষ্ঠীর আলোচনায় অংশ নেবে না। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক প্রতিবেদনে এই নজিরবিহীন কূটনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত পরিবর্তনের তথ্য জানানো হয়েছে।
ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দিনেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আদেশে স্বাক্ষর করেছিলেন। তার অভিযোগ ছিল যে, সংস্থাটি কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলায় চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে, প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে পারেনি এবং ‘অনুপযুক্ত রাজনৈতিক প্রভাব’ থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
১৯৪৮ সালের এক সংসদীয় প্রস্তাব অনুযায়ী, সংস্থাটি ছাড়তে হলে এক বছরের আগাম নোটিশ এবং সব বকেয়া পরিশোধ করার নিয়ম থাকলেও মার্কিন প্রশাসনের দাবি, আইনত বকেয়া শোধ করার কোনো বাধ্যবাধকতা তাদের নেই। ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ডব্লিউএইচওর হিসাব অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের বকেয়ার পরিমাণ ছিল প্রায় ২৬ কোটি ডলার। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক স্বাস্থ্য আইন কেন্দ্রের পরিচালক লরেন্স গোস্টিন এই প্রস্থানকে একটি ‘অত্যন্ত বিশৃঙ্খল বিবাহবিচ্ছেদ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তের ফলে বিশ্বজুড়ে এইচআইভি, পোলিও এবং ইবোলার মতো মরণঘাতী রোগ নিয়ন্ত্রণের কর্মসূচিগুলো বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ২০২২ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ডব্লিউএইচওতে প্রায় ১৩০ কোটি ডলার অনুদান দিয়েছিল। ইনফেকশাস ডিজিজ সোসাইটি অব আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড নাহাস সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে বেরিয়ে যাওয়া একটি ‘বৈজ্ঞানিক হঠকারিতা’।
সংস্থাটির ইনফ্লুয়েঞ্জা রেসপন্স এবং ডেটা ট্র্যাকিং ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে ভবিষ্যতে নতুন কোনো মহামারির জন্য প্রয়োজনীয় টিকা তৈরি বা প্রস্তুতির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে পড়বে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে সংস্থাটির বার্ষিক ফ্লু ভ্যাকসিন সভা হওয়ার কথা থাকলেও সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ এখন অনিশ্চিত।
মার্কিন প্রশাসনের এই প্রস্থান কেবল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এলন মাস্কের নেতৃত্বাধীন ‘ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি’ ইতিমধ্যে ইউএসএআইডির মানবিক ও স্বাস্থ্য কর্মসূচিগুলোতে বড় ধরনের ছাঁটাই করেছে।
এছাড়া স্বাস্থ্য সচিব রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনাকারী ‘গ্লোবাল ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স’ থেকে মার্কিন সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। এর বিকল্প হিসেবে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট প্রায় ৬০টি দেশের সঙ্গে নিজস্ব রোগ নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ শুরু করেছে, যা ডব্লিউএইচওর ‘প্যান্ডেমিক এগ্রিমেন্ট’-এর একটি বিকল্প হিসেবে কাজ করবে। তবে ডব্লিউএইচওর ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্র আগামী মে মাসে অনুষ্ঠেয় সভায় যুক্তরাষ্ট্রের বকেয়া আদায়ের আইনি পথ নিয়ে আলোচনা করবে বলে জানা গেছে।
সূত্র: ব্লুমবার্গ এবং সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট।