আন্তর্জাতিক ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর হুমকির মুখে আজ বুধবার এক বিক্ষোভকারীকে ফাঁসি দেবে ইরান। ওদিকে বিক্ষোভকারীদের প্রতি ট্রাম্প আহ্বান জানিয়েছেন দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দখল করে নিতে। হোয়াইট হাউসের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ গোপনে সপ্তাহান্তে ইরানের নির্বাসিত সাবেক যুবরাজ রেজা পাহলভির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বলে জানিয়েছে অ্যাক্সিওস।
এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানে চলমান বিক্ষোভ নিয়ে আলোচনা করতেই এই বৈঠক। দেশের বাইরে থেকে বিক্ষোভে উত্তেজনা বৃদ্ধি করে আসছেন পাহলভি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন সিএনএন ও এনডিটিভি।
এতে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের জনগণকে বিক্ষোভ চালিয়ে যেতে উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘সহায়তা আসছে।’ রক্তক্ষয়ী দমনপীড়নের মধ্যেই তিনি এ মন্তব্য করেন। চলমান দমন অভিযানে অধিকারকর্মীদের মতে কমপক্ষে আড়াই হাজার মানুষ মারা গেছেন। তবে নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে এ সংখ্যা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। একই সঙ্গে ট্রাম্প ইরানের সরকারকে সতর্ক করে বলেছেন, যদি তারা বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি কার্যকর করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে ‘খুব শক্ত পদক্ষেপ’ নেবে।
খবরে বলা হচ্ছে, ইরান আজই প্রথম কোনো বিক্ষোভকারীকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে যাচ্ছে। দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের জেরে গণগ্রেপ্তারের পর ২৬ বছর বয়সী এরফান সোলতানিকে যথাযথ বিচার ছাড়াই ফাঁসি দেয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। তাকে গত সপ্তাহে রাজধানী তেহরানের কাছে কারাজে গ্রেপ্তার করা হয়। ইরানে যোগাযোগব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণ অচল। এর মধ্যেই ইলন মাস্কের স্পেসএক্স নাকি দেশটিতে বিনামূল্যে স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ‘হোলিস্টিক রেজিলিয়েন্স’-এর নির্বাহী পরিচালক আহমাদ আহমাদিয়ানের বরাতে জানা গেছে, ইরানে স্টারলিংকের সাবস্ক্রিপশন ফি মওকুফ করা হয়েছে। ফলে যাদের কাছে রিসিভার আছে তারা বিনা খরচে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবেন।
এদিকে, হোয়াইট হাউসের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ গোপনে সপ্তাহান্তে ইরানের নির্বাসিত সাবেক যুবরাজ রেজা পাহলভির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বলে জানিয়েছে অ্যাক্সিওস। শৈশবে তাকে ইরানের পরবর্তী শাহ হিসেবে প্রস্তুত করা হচ্ছিল, সেই রেজা পাহলভি প্রায় পাঁচ দশক ধরে নির্বাসনে রয়েছেন। ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে নাড়িয়ে দেয়া এই আন্দোলনে তিনি এখন এক ধরনের প্রতীকী নেতৃত্বে উঠে এসেছেন। তিনি ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ‘আর দেরি না করে দ্রুত’ পদক্ষেপ নিতে।
ইরানে কী ঘটছে
ইরানি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া টানা কয়েক রাতের দেশব্যাপী বিক্ষোভের পর তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। এই বিক্ষোভগুলোকে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ধর্মীয় শাসনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করছে, সরকার বিক্ষোভকারীদের গুলি করে হত্যা করছে এবং পাঁচ দিনের বেশি সময় ধরে চলা ইন্টারনেট বন্ধ রেখে দমনপীড়নের প্রকৃত মাত্রা আড়াল করছে।
ট্রাম্প ইরানি বিক্ষোভকারীদের বলেছেন ‘সহায়তা আসছে’। সিবিএস নিউজকে তিনি জানান, যদি ইরান বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি কার্যকর শুরু করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থা নেবে। তেহরানের কৌঁসুলিরা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক বিক্ষোভে গ্রেপ্তার হওয়া কয়েকজনের বিরুদ্ধে ‘মোহারেবেহ’ বা ‘আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার’ অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের মামলা করা হবে।
ট্রাম্প বলেন, তারা যদি এমন কিছু করে, আমরা খুব শক্ত পদক্ষেপ নেব। আগেও তিনি একাধিকবার ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, যখন তারা হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করতে শুরু করে- এখন আবার ফাঁসির কথা বলছে। দেখা যাক, এটা তাদের জন্য কতটা ভালো হয়।
এর আগে মঙ্গলবার ট্রাম্প তাঁর ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, ইরানিদের উদ্দেশে আহ্বান জানিয়ে ‘বিক্ষোভ চালিয়ে যাও।’ তিনি আরও লিখেছেন, বিক্ষোভকারীদের অর্থহীন হত্যাকাণ্ড বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আমি ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সব বৈঠক বাতিল করেছি। সহায়তা আসছে। কোন বৈঠকের কথা তিনি বলেছেন বা কী ধরনের সহায়তা আসছে- তা স্পষ্ট নয়।
ওদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নতুন ভিডিওতে দেখা যায়, তেহরানের দক্ষিণে কাহরিজাক মর্গে সারি সারি মৃতদেহ রাখা। কালো ব্যাগে মোড়া দেহগুলোর মধ্যে স্বজনরা প্রিয়জনকে খুঁজছেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সির তথ্যমতে, বুধবার ভোর নাগাদ নিহতের সংখ্যা বেড়ে কমপক্ষে ২ হাজার ৫৭১ জনে দাঁড়িয়েছে। রয়টার্সকে দেয়া এক বিবৃতিতে এক ইরানি কর্মকর্তা বেসামরিক নাগরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর মৃত্যুর জন্য সন্ত্রাসীদের দায়ী করেছেন।
নরওয়েভিত্তিক এনজিও ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’ (আইএইচআর) ২৬ বছর বয়সী এরফান সোলতানির মামলাটি তুলে ধরে জানায়, তাকে ইতিমধ্যে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে এবং বুধবারই তাঁকে ফাঁসি দেয়া হতে পারে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর ডজনখানেক সদস্য নিহত হয়েছেন এবং তাদের জানাজা বড় বড় সরকারপন্থী সমাবেশে রূপ নিয়েছে। নিহতদের স্মরণে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। তেহরানে বুধবার সাম্প্রতিক দিনের ‘শহীদদের’ জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে বড় ধরনের জানাজার আয়োজনের কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।
সোমবার সরকার দেশজুড়ে বিশাল সমাবেশের মাধ্যমে রাস্তায় নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এসব সমাবেশকে আন্দোলনের পরাজয়ের প্রমাণ হিসেবে অভিহিত করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সতর্কবার্তা বলে মন্তব্য করেন।
ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা প্রধান ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ইরানের জনগণের প্রধান হত্যাকারী বলে অভিযুক্ত করেন। এএফপি জানায়, মঙ্গলবার কিছু এলাকায় আন্তর্জাতিক ফোন সংযোগ আংশিকভাবে চালু করা হয়েছে। তবে শুধু আউটগোয়িং কলের জন্য। সংযোগের মান ছিল দুর্বল এবং বারবার বিচ্ছিন্ন হচ্ছিল।
১৯৮৯ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা এবং বর্তমানে ৮৬ বছর বয়সী খামেনি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। সর্বশেষ জুনে ইসরাইলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা নিহত হন এবং তাকে আত্মগোপনে যেতে হয়। ভারতের সফরে গিয়ে বলেন জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেৎসে বলেন, যে শাসন কেবল সহিংসতার মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে, সেটি কার্যত শেষ হয়ে গেছে। আমি মনে করি, আমরা এই শাসনের শেষ দিন ও সপ্তাহগুলো দেখছি। তথ্যসূত্র, এমজমিন