মহাপ্রাচীরের আদলে ১৯৭৮ সালে চীন শুরু করে ‘দ্য গ্রেট গ্রিন ওয়াল’ নামের বিশাল এক প্রকল্প। ভূমিক্ষয় ও ধূলিঝড় মোকাবিলা, সেই সাথে গোবি ও তাকলামাকান মরুভূমির বিস্তার ঠেকাতে নেয়া এই উদ্যোগের ফলে যদিও চীনের পানি বণ্টনে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিয়েছে।
বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণে চীনের দক্ষতার কথা এখন আর কারও অজানা নয়। বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাঁধ? চীনে। সবচেয়ে বড় দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক? সেটাও চীনে। বিশ্বের বৃহত্তম উইন্ড ফার্ম কিংবা সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র—সবই আছে চীনে। এমনকি প্রাচীন যুগের সবচেয়ে বড় স্থাপনাও তো তাদেরই (গ্রেট ওয়াল)।
এই অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি চীন মনোযোগ দিয়েছিল বনায়নেও। মহাপ্রাচীরের আদলে ১৯৭৮ সালে তারা শুরু করে 'থ্রি-নর্থ শেল্টারবেল্ট' বা 'দ্য গ্রেট গ্রিন ওয়াল' নামের বিশাল এক প্রকল্প। ভূমিক্ষয় ও ধূলিঝড় মোকাবিলার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, গত বছর এ প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়েছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এ প্রকল্পের আওতায় চীন ১ লাখ ১৬ হাজার বর্গমাইল এলাকায় গাছ লাগিয়েছে। ফলে ১৯৪৯ সালে দেশটিতে যেখানে বনভূমির পরিমাণ ছিল ১০ শতাংশ, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫ শতাংশে। ধারণা করা হয়, আশির দশকের শুরু থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৭ হাজার ৮০০ কোটি গাছ লাগানো হয়েছে।
১৯৭৮ সাল থেকে মঙ্গোলিয়া, কাজাখস্তান ও কিরগিজস্তানের সীমান্তজুড়ে চীন ৬৬ বিলিয়নের বেশি গাছ লাগিয়েছে। আগামী ২৫ বছরে আরও ৩৪ বিলিয়ন গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের। এই লক্ষ্য পূরণ হলে, ১৯৭০–এর দশকের শেষ দিকের তুলনায় পৃথিবীর মোট বনভূমির পরিমাণ প্রায় ১০ শতাংশ বাড়বে।
১৯৫০-এর দশকে ব্যাপক নগরায়ণের আগে থেকেই চীনের উত্তরাঞ্চল ছিল বেশ শুষ্ক। এর মূল কারণ হিমালয় পর্বতমালা। চীন-মঙ্গোলিয়া সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে খুব কম বৃষ্টিপাত হয়। এ কারণেই গোবি ও তাকলামাকান মরুভূমি এত বিশাল। রয়্যাল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটির তথ্যমতে, দুটি মরুভূমি মিলে প্রায় ১৬ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত, যা যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা অঙ্গরাজ্যের চেয়ে সামান্য ছোট।
গত পাঁচ দশক ধরে নানা চেষ্টা সত্ত্বেও গোবি ও তাকলামাকান মরুভূমির বিস্তার থামানো যায়নি। এখনো প্রতিবছর গোবি মরুভূমি চীনের প্রায় ৩ হাজার ৬০০ বর্গকিলোমিটার তৃণভূমি গ্রাস করে নিচ্ছে। এই মরুকরণের ফলে যে শুধু ইকোসিস্টেম ও কৃষিজমি নষ্ট হচ্ছে তা নয়, বরং বেইজিংয়ের মতো বড় শহরগুলোতে দূষণের মাত্রাও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
গত বছর সরকারি কর্মকর্তারা ঘোষণা করেন, তাকলামাকান মরুভূমিকে গাছপালা দিয়ে ঘিরে ফেলার কাজ শেষ হয়েছে। বনাঞ্চল রক্ষা ও সম্প্রসারণে তাকলামাকানের চারপাশে বৃক্ষরোপণ অব্যাহত থাকবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী সব এগোলে, ২০৫০ সাল নাগাদ এই 'গ্রেট গ্রিন ওয়াল' বা সবুজ মহাপ্রাচীরের দৈর্ঘ্য হবে ৪ হাজার ৫০০ কিলোমিটার। এটিই বিশ্বের বৃহত্তম কৃত্রিম বন।
তবে এত গাছ লাগানোর সবটাই কি ইতিবাচক? 'আর্থস ফিউচার' জার্নালে প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণায় গবেষকেরা বলছেন, বিপুল এই গাছ লাগানোর ফলে চীনের পানি বণ্টনে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
চীনের তিয়ানজিন বিশ্ববিদ্যালয়, চায়না এগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটি এবং নেদারল্যান্ডসের ইউট্রেখট বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী যৌথভাবে এই গবেষণা করেছেন। তাদের মতে, ২০০১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে অতিরিক্ত গাছপালার কারণে চীনের পূর্বাঞ্চলীয় মৌসুমি এলাকা এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শুষ্ক অঞ্চলে পানির উৎস বা প্রাপ্যতা কমে গেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, 'গ্রেট গ্রিন ওয়াল'–এর মতো বনায়ন কর্মসূচিগুলো প্রকৃতিতে 'ইভাপোট্রান্সপিরেশন' বা বাষ্পীভবন ও প্রস্বেদনের হার বাড়িয়ে দিয়েছে। ১৯৯৯ সালে শুরু হওয়া 'গ্রেইন ফর গ্রিন' এবং 'ন্যাচারাল ফরেস্ট প্রোটেকশন'–এর মতো কর্মসূচিগুলোও এতে ভূমিকা রেখেছে। সহজ কথায়, গাছপালা মাটি থেকে পানি শুষে নিয়ে পত্ররন্ধ্র বা পাতার ছিদ্র দিয়ে জলীয় বাষ্প আকারে তা বাতাসে ছেড়ে দিচ্ছে।
গবেষকেরা লিখেছেন, গাছপালার এই প্রক্রিয়ার ফলে বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন এসেছে। বাতাসে জলীয় বাষ্পের প্রবাহ ঘুরে গেছে তিব্বত মালভূমির দিকে। ফলে তিব্বতে পানির প্রাপ্যতা বাড়লেও চীনের পূর্ব ও উত্তর–পশ্চিমাঞ্চলে তা কমেছে। বিশেষ করে উত্তর–পশ্চিমাঞ্চল থেকে প্রচুর পরিমাণে জলীয় বাষ্প তিব্বতের দিকে সরে যাওয়ায় সেখানে পানির ঘাটতি বেশি দেখা দিচ্ছে।
গবেষকেরা জমির ব্যবহারের এই পরিবর্তনকে বলছেন 'ল্যান্ড ইউজ/কাভার চেঞ্জেস' (এলইউসিসি)। তারা দেখেছেন, এক ধরনের জমি অন্য ধরনে পরিবর্তিত হলে—যেমন তৃণভূমিকে বনে বা ফসলি জমিকে তৃণভূমিতে রূপান্তর করলে—বাষ্পীভবন, বৃষ্টিপাত ও পানির প্রাপ্যতায় ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব পড়ে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, তৃণভূমিকে বনে রূপান্তর করার ফলে বাষ্পীভবন ও বৃষ্টিপাত বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু সার্বিকভাবে সেখানে পানির প্রাপ্যতা বা ব্যবহারযোগ্য পানির পরিমাণ কমে গেছে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, চীনের জনসংখ্যা অনুযায়ী পানির সুষম বণ্টন নেই। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশটির উত্তরাঞ্চলে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৬ শতাংশের বাস। অর্ধেকের বেশি চাষযোগ্য জমিও সেখানে। অথচ এই অঞ্চলে মোট পানির মাত্র ২০ শতাংশ লভ্য। তাই গবেষকদের মত, ভবিষ্যতে বনায়ন বা গাছ লাগানোর পরিকল্পনা করার সময় পানিচক্রের এই পরিবর্তনের বিষয়টি মাথায় রাখা জরুরি।
গবেষণাপত্রে লেখকেরা বলেন, 'ভূমি আচ্ছাদনের পরিবর্তন অঞ্চলভেদে পানি সম্পদের পুনর্বণ্টন ঘটাতে পারে, এক অঞ্চলের পানি অন্য অঞ্চলে চলে যেতে পারে—আমাদের গবেষণা সেটিই দেখায়। চীনে টেকসই ভূমি ও পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার জন্য এসব প্রভাব বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।'
সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড