শিরোনাম
◈ খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের সর্বশেষ অবস্থা জানাল বিএনপি ◈ অনূর্ধ্ব-১৯ক্রিকেটে ভারত - পা‌কিস্তান যুদ্ধ ◈ মায়ের সংকটাপন্ন অবস্থায় দেশে ফেরার আহ্বান: ‘একক সিদ্ধান্ত নিতে পারি না’, ফেসবুকে তারেক রহমান ◈ যুক্তরাষ্ট্রকে খুশি করতে গিয়ে ইউরোপ-চীনের সঙ্গে সম্পর্ক শীতল: বাণিজ্যে বড় ঝুঁকিতে বাংলাদেশ ◈ ভূমিকম্পে ঢাকার কোন এলাকা নিরাপদ? ◈ খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা একদমই ভালো না, সবাই দোয়া করবেন: আইন উপদেষ্টা ◈ গুগলকে কনটেন্ট সরাতে অনুরোধের সংখ্যা নিয়ে সরকারের ব্যাখ্যা ◈ জামায়াতকে ভোট দিলে আমার মৃতদেহ পাবেন : ফজলুর রহমান (ভিডিও) ◈ প্রধান উপদেষ্টার প্রতি বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ◈ বাংলাদেশ সিরিজ স্থগিত করে শ্রীলঙ্কা নারী দল‌কে আমন্ত্রণ ভারতের

প্রকাশিত : ২৯ নভেম্বর, ২০২৫, ০৯:৫২ সকাল
আপডেট : ২৯ নভেম্বর, ২০২৫, ১১:০০ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

'ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে মেকং': বিরল খনিজের বৈশ্বিক চাহিদা মেটাতে গিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নদীতে সায়ানাইড, পারদসহ বিষাক্ত দূষণ

বিশ্বজুড়ে বিরল খনিজের চাহিদা এশিয়ার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নদীতে ভয়াবহ দূষণ ছড়াচ্ছে। এর ফলে নদীতীরের কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে। বিপন্ন হচ্ছে নদীর বাস্তুসংস্থান ও পরিবেশ।

রেয়ার আর্থ খ্যাত এসব খনিজ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে তীব্র ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে। চীন তার শিল্পনীতির অংশ হিসেবে এসব খনিজের ওপর প্রায় সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।

এরই মধ্যে বিশ্বজুড়ে বিরল খনিজের নতুন উৎস খুঁজে বের করার দৌড় শুরু হয়েছে। কিন্তু যেসব এলাকায় এসব খনিজের আধিক্য রয়েছে, সেসব অঞ্চল এখনই নিয়ন্ত্রণহীন খনি কর্মকাণ্ডের ভয়াবহ মূল্য দিচ্ছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রাণদায়ী নদী মেকং—এক বিশাল প্রাণবৈচিত্র্যময় পরিবেশব্যবস্থা, যা ছয়টি দেশ হয়ে বয়ে গেছে। এই নদী এবং এর শাখানদী-নালার ওপর নির্ভর করে প্রায় সাত কোটি মানুষের খাদ্য, পানি, কৃষি ও বাণিজ্য।

বিশ্বে খাদ্য উৎপাদনেও নদী ব্যবস্থাটির অবদান উল্লেখযোগ্য। এখানকার ধান, মিঠাপানির মাছ ও চিংড়ি রপ্তানি হয়ে পৌঁছায় যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বহু দেশে।

"যুক্তরাষ্ট্রের এমন কোনো বড় সুপারমার্কেট নেই যেখানে মেকং অববাহিকায় উৎপাদিত কোনো পণ্য পাওয়া যায় না," বলেন স্টিমসন সেন্টারের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও জ্বালানি–পানি–টেকসই উন্নয়ন কর্মসূচির পরিচালক ব্রায়ান আইলার।

কিন্তু মেকং ও এর শাখানদীগুলোর তীর ঘেঁষে বসবাসকারী লাখো মানুষ—যারা প্রতিদিন এ পানি পান করে, গোসল করে, মাছ ধরে—তারা এখন ঝুঁকিতে পড়ছে মারাত্মক বিষাক্ত উপাদানে। কারণ অঞ্চলজুড়ে শত শত অনিয়ন্ত্রিত খনি রয়েছে, যার অনেকগুলোই মিয়ানমারের যুদ্ধবিধ্বস্ত, আইনশৃঙ্খলাহীন অঞ্চলে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক স্টিমসন সেন্টারের নতুন এক গবেষণায় "বৃহৎ পরিসরে" মানচিত্রায়িত করা হয়েছে ২ হাজার ৪০০–র মাইনিং বেশি সাইট—যার অনেকগুলোই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মূলভূখণ্ডজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অনিয়ন্ত্রিত খনি। এগুলো থেকে সরাসরি নদীর পানিতে সায়ানাইড, পারদ, আর্সেনিকসহ নানা ভারী ধাতু মিশে যাচ্ছে।

"এটি এমন এক পরিবেশগত বিপর্যয়ের দিকে পরিস্থিতিকে ঠেলে দিচ্ছে যেখানে সবকিছু জমতে জমতে মেকংয়ে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে," বলেন এই প্রকল্পটির প্রধান গবেষক ও স্টিমসন সেন্টারের রিসার্চ অ্যানালিস্ট রিগ্যান কওয়ান।

কওয়ান ও তাঁর দল স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে মিয়ানমার, লাওস ও কম্বোডিয়ার ৪৩টি নদীর তীরে বা নদীর ওপর এসব অনিয়ন্ত্রিত খনন কার্যক্রম চিহ্নিত করেছেন।

এ সাইটগুলোর মধ্যে রয়েছে অ্যালুভিয়াল মাইনিং—যেখানে মূলত সোনা, রূপা ও টিন উত্তোলন করা হয়; ইন-সিটু লিচিং—রেয়ার আর্থ উত্তোলনে ব্যবহৃত; এবং হিপ লিচ—যেখানে সোনা, তামা, নিকেল ও ম্যাঙ্গানিজ উত্তোলন করা হয়।

এই প্রতিটি পদ্ধতিতেই ব্যবহৃত হয় পারদ বা সোডিয়াম সায়নাইডের মতো বিপজ্জনক রাসায়নিক। সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না হলে এসব পদার্থ পরিবেশে ছড়িয়ে নদী, প্রাণী, খাদ্যশস্য এবং মানুষের ওপর বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।

সায়নাইড বিষক্রিয়া মৃত্যুও ডেকে আনতে পারে, সৃষ্টি করতে পারে কোমা, খিঁচুনি বা হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি। পারদ খাদ্যশৃঙ্খলে জমতে থাকে, যার ক্ষতি পড়ে গাছপালায়, প্রাণীতে এবং মানুষের খাদ্যে—বিশেষত ধানে, যা এই অঞ্চলের অন্যতম বড় রপ্তানিপণ্য। তাছাড়া খনিজ উত্তোলনের সময় লিচ হওয়া ভারী ধাতু পরিবেশে জমে পাখি, মাছ ও মানুষের জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করে।

মেকং এর একটি শাখা থাইল্যান্ডের কক নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলোতে—মিয়ানমার সীমান্তের কাছে—উজানে দূষণের কারণে উদ্বেগ ছড়িয়েছে। এখানকার নদীর পানি পরীক্ষায় আর্সেনিকসহ অন্যান্য খনিজ পাওয়া যাওয়ার কথা জানা গেছে।

"এখন আর কেউ নদীর মাছ খায় না," বলেন কওয়ান। "মানুষ বুঝতে পারছিল না, তারা যে খাদ্য ফলায় সেটি খাওয়া নিরাপদ কি না। নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কীভাবে চালাবে, তাও স্পষ্ট ছিল না। এদের অনেকেই দিন আনে দিন খায় ধরনের কৃষক… নিজেদের খাবার তারা নিজেরাই উৎপাদন করে। বিক্রি করার জন্যও খাদ্য উৎপাদন করতে হয়," তিনি বলেন।

মেকংকে সাধারণত পরিচ্ছন্ন নদী ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হয়, যা লাখো মানুষকে জীবন দেয়। কিন্তু রেয়ার আর্থ শিল্পের লাগামহীন দূষণ চলতে থাকলে—গবেষকদের আশঙ্কা—এখানকার পরিবেশব্যবস্থা ধসে পড়তে পারে। আর যেসব মানুষ খনি এলাকার নিম্ন অববাহিকা বা ভাটিতে বসবাস করে, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে।

"মেকং আমাদের দেখাতে পারে বিরল খনিজ উত্তোলনে কীভাবে এগোনো উচিত নয়, কারণ এর ক্ষতি ভয়াবহ হবে," বলেন আইলার, যিনি এই গবেষণা প্রতিবেদনের সহ-রচয়িতা। তিনি বলেন, "এটা ছোট কোনো অঞ্চল নয়—কোটি কোটি মানুষ এখানে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।"

যুদ্ধের আড়ালে ফুলেফেঁপে ওঠা খনি ব্যবসা

রেয়ার আর্থ বা বিরল খনিজ বলতে ১৭টি ধাতব উপাদানকে বোঝায়, যা অধুনা জীবনের দৈনন্দিন বহু পণ্যে ব্যবহৃত—গাড়ি, জেট ইঞ্জিন, স্মার্টফোন, ফ্ল্যাট-স্ক্রিন টিভি ইত্যাদিতে। বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি, এমআরআই স্ক্যানার, এমনকি ক্যানসার চিকিৎসায়ও এসব উপাদান অপরিহার্য।

উপাদানগুলো প্রকৃত অর্থে 'দুর্লভ' নয়—সোনার চেয়েও বেশি পরিমাণে এগুলো পৃথিবীতে আছে। তবে এগুলো উত্তোলন কঠিন এবং ব্যয়বহুল; পাশাপাশি পরিবেশগত ক্ষতিও ভয়াবহ।

মেকং নদীব্যবস্থা দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার যে অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত, তার কিছু স্থানে দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ খনির ব্যবসা চলছে সরকারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। যেখানে দুর্বল আইনশৃঙ্খলা, ব্যাপক দুর্নীতি কিংবা সক্রিয় সংঘাত একসঙ্গে কাজ করছে, সেখানে এসব খনি আরও দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে।

গবেষকদের মতে, এসব খনি নতুন নয়, কিন্তু ২০২১ সালের মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থান, সোনার বাড়তি দাম এবং বিরল খনিজের বৈশ্বিক চাহিদা খনন কার্যক্রম আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

"বিরল খনিজ ব্যবহারকারী পণ্যের চাহিদা বাড়তেই থাকবে। উইন্ড টারবাইনসহ পরিচ্ছন্ন জ্বালানির প্রকল্পগুলোতে আমরা এসবের ওপরই নির্ভর করছি" বলেন আইলার।

ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রায় প্রতি মাসেই নতুন খনি চালু হচ্ছে বা পুরোনো খনির কার্যক্রম বাড়ানো হচ্ছে।

অনিয়ন্ত্রিত খনন কার্যক্রমের প্রায় ৮০ শতাংশই হচ্ছে মিয়ানমারে—যা বিশ্বের অন্যতম বড় রেয়ার আর্থ উৎপাদক দেশ।

দেশটি বহু বছর ধরে জেড, রুবি, সোনা, তামা, অ্যাম্বারসহ নানা খনিজের খনি-অধ্যুষিত একটি কেন্দ্র। উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের এসব খনি অঞ্চল বহুদিন ধরেই মাদক, যৌনশোষণ, মানবপাচারসহ নানা অপরাধ এবং চরম দারিদ্র্য ও জীবনঝুঁকির কারণে কুখ্যাত।

মাল্টিবিলিয়ন ডলারের এই খাতটি দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও তাদের মদদপুষ্ট মিলিশিয়াদের নিয়ন্ত্রণে। তারা এসব খনি থেকে বিপুল অর্থ আয় করে, যা দশকের পর দশক ধরে সক্রিয় জাতিগত বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অস্ত্র কিনতে ব্যবহৃত হয়।

অভ্যুত্থানের পর কাচিন ও শান রাজ্যে রেয়ার আর্থ উত্তোলন দ্রুত বেড়েছে। গৃহযুদ্ধের কারণে বিশৃঙ্খলা, দারিদ্র্য ও সহিংসতা আরও গভীর হয়েছে। গবেষকদের মতে, স্টিমসনের মানচিত্রায়িত খনিগুলোর বড় অংশ এসব বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রিত এলাকাতেই।

"এটা যেন কে আগে কত বেশি খনি চালু করতে পারে তার প্রতিযোগিতা," বলেন কওয়ান।

"মিয়ানমারে তিনটি বড় জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন নিয়মিত নতুন নতুন খনি খুলছে। তারা নিজেদের মধ্যে কোনো সমন্বয় করছে না। আর চীন থেকে ভারী বিরল খনিজের চাহিদা তো আছেই।"

মিয়ানমারে উত্তোলিত খনিজগুলো পরে প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য চীনে রপ্তানি করা হয়।

চীন বিশ্বে রেয়ার আর্থ পরিশোধনের ৯০ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করে। গবেষকদের মতে, মিয়ানমারের বহু খনিতে চীনা ব্যবস্থাপক ও প্রযুক্তিবিদ কাজ করছেন।

"মিয়ানমার ও লাওসে রেয়ার আর্থ খনিতে সবসময় চীনা নাগরিকদের দেখা যাবে। কারণ এই পদ্ধতিতে কাজ করতে তারা-ই পারে," বলেন কওয়ান।

চীন বহুদিন ধরেই মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বড় কূটনৈতিক সমর্থক এবং সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের বহু জাতিগত মিলিশিয়ার ওপরও তাদের প্রভাব রয়েছে।

স্টিমসন সেন্টারের এই অনুসন্ধান নিয়ে প্রশ্ন করলে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ সপ্তাহে রয়টার্সকে জানায়, তারা এ বিষয়ে অবগত নয়।

মন্ত্রণালয় বলে, "বিদেশে কার্যরত চীনা কোম্পানিগুলোকে আমরা সবসময় স্থানীয় আইন মেনে ব্যবসা চালাতে এবং পরিবেশ সুরক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা নিতে বলে থাকি।"

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশের সঙ্গে বিরল খনিজ খাতে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে, যাতে চীনের ওপর নির্ভরতা কমানো যায়।

গবেষকদের আশঙ্কা, বিরল খনিজ ও সোনার চাহিদা বাড়তে থাকলে অনিয়ন্ত্রিত খনন আরও বাড়বে। তাই জরুরি ভিত্তিতে নদী ও প্লাবনভূমি অঞ্চলের পানি পরীক্ষা করে দূষণের বাস্তব চিত্র জানা প্রয়োজন—এতে স্থানীয় মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া যাবে।

থাইল্যান্ডভিত্তিক রিভার অ্যান্ড রাইটস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক পাই ডিটেস মঙ্গলবার এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া যখন বৈশ্বিক রেয়ার আর্থ সরবরাহ চেইনের কেন্দ্রে, তখন এসব নদীতীরবর্তী এলাকায় মানবাধিকার ও পরিবেশগত মান আরও বেশি লঙ্ঘিত হবে।

তিনি বলেন, "বিশ্বের চাহিদা মেটানোর জন্য এই অঞ্চলকে বলি দেওয়া অন্যায়।"

সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়