বেলপাহাড়ীর রহস্যময় খুন ডুংরী, কন্যালুকা, রাজাবাসা পাহাড়ে জন্মায় চাঁদোয়া প্রজাতির গুল্ম গাছ। বুনো গুল্মের পাতার মিষ্টি গন্ধে দৃষ্টি ঝাপসা হয়। হারিয়ে যায় হুঁশ। লোধা শবর সম্প্রদায়ের মানুষজন পর্যটকদের ওই পাহাড়গুলি এড়িয়ে চলতে বলেন।
বেলপাহাড়ীর পাহাড়, জঙ্গলঘেরা লোধা শবরদের গ্ৰাম আমরোলা। গ্ৰামের চারিদিকে গভীর জঙ্গল ও পাহাড় রয়েছে। পাহাড় ও জঙ্গলের মাঝেই গ্ৰামবাসীদের জীবন কাটে। তাঁরা জঙ্গলের শালপাতা, গাছের কন্দ, কুরকুট পিঁপড়ের ডিম সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। ভেষজ গাছের প্রয়োজন হলে পাহাড়ে যান। তবে, খুন ডুংরী, কন্যালুকা, রাজাবাসা পাহাড় ভয়ে এড়িয়ে চলেন। পাহাড়ের ঘন জঙ্গল, ঝোপঝাড়ের মাঝে চাঁদোয়া গাছ জন্মায়। যে গুল্মগাছের গন্ধ নাকে গেলে হুঁশ হারিয়ে যায়। স্বাভাবিক বোধবুদ্ধি লোপ পায়। গ্ৰামের মানুষ ঝুঁকি নিয়ে ঔষধি গাছের সন্ধানে পাহাড়ে যেতে বাধ্য হন। বিষাক্ত চাঁদোয়ার সঙ্গেই পাহাড়ে বিশল্যকরণী, অশল্যকরণী, ডগর, পাতালফুর, বনমুরনী, কুদরীর মতো জীবনদায়ী গাছ জন্মায়। যেসব গাছের পাতা, ফুল, ফল, শিকড়, ছাল লোধা শবররা ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করেন। লোধা শবররা লাগেশ্বরী, লাগলোটো গুল্মগাছ পাহাড়ের খাঁজে শুকনো পাতা, ঘাস, ঝোপঝাড়ের মাঝে লুকিয়ে রাখেন। এই গুল্মগাছগুলির কথা বাইরের লোকদের জানাতে চান না। এই গাছ লোধা শবরদের কাছে ঔষধি হিসেবে ব্যবহার হয়।
বেলপাহাড়ী সদর থেকে হদরা মোড়, বাসকেঁইট্যা, টুরুপাহাড়ী, আগুইবিলের জঙ্গলের রাস্তা ধরে আমরোলা গ্ৰামে পৌঁছতে হয়। উঁচু পাহাড়ী পথের মাঝে লোধা ও শবরদের ছোট ছোট গ্ৰাম রয়েছে। গ্ৰামের বাসিন্দা বছর পঞ্চাশের ভটেরাম শবর বলেন, জঙ্গল ও পাহাড়শ্রেণির মাঝে আমাদের গ্ৰাম। গ্ৰামঘেরা পাহাড়ে নানা ঔষধি গাছ জন্মায়। পাহাড়ী গাছের গুণাবলির কথা গ্ৰামের বাসিন্দারা কমবেশি সকলেই জানেন। রোগজ্বালা হলে পাহাড় থেকে ঔষধি গাছ নিয়ে আসা হয়। পাহাড়ে জীবনদায়ীর পাশাপাশি ক্ষতিকর গাছও রয়েছে। পাহাড়ে গেলে বন্য প্রজাতির চাঁদোয়া গুল্মগাছ থেকে আমরা দূরে থাকি। এই গাছের গন্ধ নাকে গেলে দৃষ্টি ঝাপসা ও ঘোর লাগে। যার জেরে পাহাড়ে পথ হারিয়ে অনেকে গ্ৰামে ফিরতে পারেন না। পাহাড়ে গিয়ে তাঁদের খুঁজে আনতে হয়েছে। অপর বাসিন্দা ভৈরব শবর বলেন, গ্ৰামের মানুষ রোগাক্রান্ত হলে ঔষধি গাছ ব্যবহার করে। চাঁদোয়া গাছের নানা প্রজাতি আছে। তাদের মধ্যে দু’-একটি প্রজাতির গাছ থেকে আমরা দূরে থাকি। অনেক সময় ভুল করে কাছে গেলে বিপদ হয়। পর্যটকদের সেই কারণে এই পাহাড়ে যেতে নিষেধ করা হয়। গ্ৰামের অল্পবয়সিরা অবশ্য চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যেতে পছন্দ করছেন।
বেলপাহাড়ী এলাকার জনজাতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন স্থানীয় বাসিন্দা বিধান দেবনাথ। তিনি বলেন, লোধা শবরদের আমরা ‘প্রিমিটিভ’ জাতি বলি। এঁদের নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে। পাহাড়ী ঔষধি গাছের সম্পর্কে জ্ঞান রয়েছে। করোনার সময় গ্ৰামগুলিতে সেভাবে কোনও প্রভাবই পড়েনি। কোনও শারীরিক সমস্যা হলে পাহাড় থেকে ঔষধি গাছ নিয়ে এসে তাঁরা ব্যবহার করেন। লোধা শবরদের ব্যবহারিক ঔষধি জ্ঞান নিয়ে চর্চার প্রয়োজন রয়েছে।
সূত্র: বর্তমান