২০০৫ সালে, চীনে বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) ব্যাটারির মাত্র দুটি উৎপাদক প্রতিষ্ঠান ছিল। আজ দুই দশক পরে, দেশটি বিশ্বের লিথিয়াম-আয়ন সেলের তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি উৎপাদন করছে। কীভাবে ঘটলো এই বিস্ময়কর অর্জন? বেইজিং বৈশ্বিক অটোমোবাইল শিল্পে কর্তৃত্ব যেভাবে প্রতিষ্ঠা করলো তা রীতিমতো চমকপ্রদ। খবর বিবিসির।
২০০৮ সালের বেইজিং অলিম্পিকে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত ক্রীড়াবিদ, সাংবাদিক ও কর্মকর্তাদের পরিবহন করা হয়েছিল এক সুসজ্জিত বাসের বহরে—সাদা, নীল ও সবুজ রঙের ডিজাইন যুক্ত ঐসব বাস বেইজিংয়ের অলিম্পিকের বিভিন্ন ভেন্যুর মধ্যে দ্রুত চলাচল করত।
সেই সময়ের বেইজিংয়ের রাস্তায় রাজত্ব করতো ডিজেলচালিত গাড়ি ও বাস, কিন্তু সংখ্যায় প্রায় অর্ধ-শতাধিক ওই অলিম্পিক বাসগুলো লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিতে চলত। বেইজিং যাতে দূষণমুক্ত যানবাহনে অলিম্পিকের আসরের পরিবহন সম্পন্ন করতে পারে– সেজন্যই নেওয়া হয় এ উদ্যোগ।
এটিই চীনের ইভি'র জন্য লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি শিল্প গড়ার প্রথম উদ্যোগ—যা দুই দশক পরে এই প্রযুক্তিতে বিশ্বের নেতৃস্থানীয় অবস্থানে উত্তরণের ভিত্তি তৈরি করে।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে ২০২০ সালে প্রচারিত একটি ডকুমেন্টারি অনুযায়ী, বেইজিং যখন ২০০১ সালে অলিম্পিকের আয়োজক দেশ হবার সুযোগ পেয়েছিল, তখনই অলিম্পিক ই-বাস প্রকল্পটি চালু করা হয়। কিন্তু বৈশ্বিক একটি আসরের পরিবহনে ব্যবহৃত যানবাহনের জন্য ব্যাটারি তৈরি ও উৎপাদন করা সহজ কাজ ছিল না। তবু চীন এই চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করে।
বেইজিং অলিম্পিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই, ২০০৩ সালের শেষদিকে বেইজিং নিউ ম্যাটিরিয়ালস ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের মো কে এবং তাঁর সহযোগীদের একটি সরকারি-সংযুক্ত গবেষণা সংস্থার অংশ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল চীনের লিথিয়াম ব্যাটারি শিল্প বিশ্লেষণ করার জন্য।
কিন্তু তখন, মো-র দল যা খুঁজে পান তা হলো চীনের লিথিয়াম ব্যাটারি শিল্প "খুবই ছোট"। পুরো দেশে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান ইভি ব্যাটারি উৎপাদক। তারা দেখলেন—এই শিল্প প্রায় অস্তিত্বহীন। কারখানা দুটিও ছোট, তাদের দক্ষতা সীমিত, আর গবেষণাও খুবই কম করে।
২০০৫ সালে চীনের প্রথম লিথিয়াম ব্যাটারি শিল্প সম্মেলন ডাকা হলে সেখানে উপস্থিতি ছিল মাত্র ২০০ জনের।
সেই সময়ে সিএটিএল—বর্তমান বিশ্বের বৃহত্তম ইভি ব্যাটারি প্রস্তুতকারক। তখন এই প্রতিষ্ঠান ছিল এটিএল নামের জাপানি মালিকানাধীন সংস্থার একটি বিভাগের অংশ, যা ইলেকট্রনিক গ্যাজেটের জন্য লিথিয়াম ব্যাটারি উৎপাদন করত। আর বিওয়াইডি যারা বর্তমান বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইভি ব্যাটারির প্রস্তুতকারক এবং শীর্ষ ইভি নির্মাতা—তখন সদ্য অটোমোবাইল শিল্পে প্রবেশ করেছিল। তার প্রথম মূলধন অর্জন করেছিল মোবাইল ফোন নির্মাতাদের ব্যাটারি সরবরাহ করে।
২০ বছর পরে চীন সেই শিল্পের এক শ্রেষ্ঠ শক্তিতে পরিণত হয়েছে। চীনের এই উত্থান বৈশ্বিক ২০৫০ নেট-জিরো লক্ষ্যের জন্যও অপরিহার্য। বিশ্বের লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি উৎপাদন এখন চীনে হয়, আর শীর্ষ ১০ ব্যাটারি নির্মাতার মধ্যে ছয়টি হচ্ছে চীনের কোম্পানি।
বলা যায় একপ্রকার ধূমকেতুর মতোই উত্থান হয়েছে চীনের ইভি ব্যাটারি শিল্পের। কী রয়েছে এই জাদুকরি সাফল্যের পেছনে। উত্তর হচ্ছে, কোনো একক কোনো কারণে নয়, বরং একাধিক ঘটনার মধ্যে দিয়ে এসেছে চীনের অগ্রযাত্রা।
ইভি শিল্পের একজন স্বতন্ত্র বিশ্লেষক শি ইয়ানমেই বলেন, তবে দুটি বড় কারণ ছিল—দেশটির বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার, যা "সংরক্ষিত" করা হয়েছিল স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য এবং পুরো সরবরাহ-শৃঙ্খলের জন্য সমন্বিত সরকারের সমর্থন।
এছাড়া ইভি ব্যবহারকারীদের জন্য গ্রাহক-ভিত্তিক ভর্তুকি, প্রাদেশিক সরকারের অর্থায়নে গড়ে তোলা চার্জিং নেটওয়ার্ক বড় ভূমিকা রাখে। গাড়ি নির্মাতাদের ইভি তৈরি করতে বাধ্য করার সরকারি নীতিও সহায়ক ভূমিকা রেখেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
কিন্তু সরকারের সহায়ক নীতি এই সাফল্যের একটি অংশমাত্র। পুরো চিত্রটা এতে উঠে আসে না। চীনের কোম্পানিগুলো-ও বড় আকারে উৎপাদন ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণে দক্ষতা দেখিয়েছে—যা ইভি ব্যাটারি উৎপাদনের জন্য খুবই দরকার।
"তাদের টিকে থাকার প্রবল বাসনা আছে এবং তারা সক্রিয়ভাবে নতুন ধারণা পরীক্ষা করে যাতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে," বলেন সঙ শিন, যিনি কার থেকে শুরু করে রোবট নির্মাতা চীনা কোম্পানিগুলোকে বিশ্ববাজার প্রবেশ সংক্রান্ত পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, "এটাই এ শিল্পের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি।"
লিথিয়াম ব্যাটারির গল্প শুরু হয় চীনের বাইরেই, প্রায় ৫০ বছর আগে—তিনজন রসায়নবিদের গবেষণাকে কেন্দ্র করে। এরা হলেন: ব্রিটিশ–আমেরিকান স্ট্যানলি হুইটিংহাম, আমেরিকান জন গুডএনাফ এবং জাপানি আকিরা ইয়োশিনো।
তাদের পৃথক গবেষণা—যার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁরা ২০১৯ সালে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পান—একজনের কাজ অন্যজনকে শক্তি জুগিয়ে এগিয়ে যায় এবং শেষমেষ ১৯৮৫ সালে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি উদ্ভাবনের পথ তৈরি হয়। টোকিওভিত্তিক রাসায়নিক প্রতিষ্ঠান আসাহি কাসেই–এর জন্য এই ব্যাটারিটি তৈরি করেছিলেন ইয়োশিনো।
১৯৯১ সালে জাপানি ইলেকট্রনিক্স জায়ান্ট সনি, আসাহি কাসেই–এর সঙ্গে যৌথভাবে বিশ্ববাজারে প্রথম লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি আনে। পাঁচ বছর পর, ১৯৯৬ সালে, নিসান সনির সঙ্গে অংশীদার হয়ে বিশ্বের প্রথম লিথিয়াম-ব্যাটারি চালিত গাড়ি উন্মোচন করে।
পরবর্তী দশকে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি উৎপাদনে জাপান বিশ্বের এক নম্বর অবস্থান ধরে রাখে, আর দক্ষিণ কোরিয়া সেই স্থান দখলে তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকে। শতাব্দীর শুরুতে জাপানি কোম্পানিগুলো বৈশ্বিক বাজারের অবিশ্বাস্য ৯৩ শতাংশ নিজের দখলে রাখে—সানইয়ো এই দৌড়ে ছিল সবচেয়ে এগিয়ে। ২০১১ সালের আগে পর্যন্ত কোরিয়ার স্যামসাং জাপানের প্যানাসনিককে পেছনে ফেলে শীর্ষে উঠতে পারেনি।
এই প্রেক্ষাপটে, ২০০০ এর দশকের শুরুর দিকে যখন মো চীনের লিথিয়াম ব্যাটারি শিল্প নিয়ে গবেষণা করছিলেন, তখন দেশটিতে ইভি ব্যাটারি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ছিল মাত্র দুইটি—মেংগুলি এবং ওয়ানশিয়াং।
"বেইজিং অলিম্পিকের ই-বাস এবং ২০১০ সালের সাংহাই ওয়ার্ল্ড এক্সপোতে চলা বেশিরভাগ ই-বাসের ব্যাটারি এ দুই প্রতিষ্ঠানই সরবরাহ করেছিল," বলেন মো—যিনি এখন চীনের ব্যাটারি-গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিয়েললি রিসার্চের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান বিশ্লেষক।
কিন্তু অলিম্পিকের আগেই চীন ইভির ব্যাটারি শিল্পকে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি করেছিল। ২০০৬ সালে দেশটির মন্ত্রিসভা একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কর্মসূচি ঘোষণা করে, যা পরবর্তী ১৫ বছরের উন্নয়ন রূপরেখা নির্ধারণ করে দেয়। সেখানে ৬২টি অগ্রাধিকার খাতের মধ্যে "নিম্ন- কার্বন নিঃসরণ এবং নবায়নযোগ্য শক্তিচালিত যানবাহন (এনইভি)"–কে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি তালিকাভুক্ত করা হয়। একইসঙ্গে এই খাতে "রিচার্জেবল পাওয়ার ব্যাটারি"–কে মূল প্রযুক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। চীন সরকারের ব্যবহৃত এনইভি শব্দটি সাধারণত ব্যাটারি–নির্ভর বৈদ্যুতিক গাড়ি, প্লাগ–ইন হাইব্রিড এবং হাইড্রোজেন বা মিথানল–চালিত ফুয়েল–সেল চালিত যানবাহনকে বোঝায়।
এখানে চীনের লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট: ২০২০ সালের মধ্যে তাদের বিস্তৃত উৎপাদন শিল্পকে এমনভাবে আধুনিক করা, যাতে দেশটি আর সস্তা মজুরি–নির্ভর প্রতিযোগিতায় না করে, বরং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার মাধ্যমে বিশ্ববাজারে এগিয়ে থাকতে পারে।
অলিম্পিক ই-বাসের সফল বাস্তবায়নের পর, ২০০৯ সালে চীন তাদের অটোমোবাইল শিল্পকে "সমন্বয় ও পুনরুজ্জীবিত" করার উদ্দেশ্যে বড় ধরনের পদক্ষেপ নেয়।
দীর্ঘদিন ধরে বেইজিং প্রচলিত অন্তর্দহন ইঞ্জিন–নির্ভর গাড়ির বিশ্ববাজারে প্রতিযোগী হতে চেয়েও সফল হয়নি। কিন্তু দেশটির কর্মকর্তারা উপলদ্ধি করেন, ইভি শিল্প নতুন করে শুরু করার সুযোগ হতে পারে।
শি ইয়ানমেই বলেন, "চীনের নীতিনির্ধারকরা বুঝেছিলেন যে ইভি খাতটি এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে সবাই প্রায় শূন্য থেকে শুরু করছে। ফলে পশ্চিমা দেশগুলোকে টপকে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার এটাই তাদের বড় সুযোগ।"
একটি জাতীয় পরিকল্পনার মাধ্যমে স্থানীয় সরকারগুলোকে এনইভি–র জন্য সরবরাহ চেইন এবং চার্জিং নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে নির্দেশনা দেওয়া হয়। পাশাপাশি দেশীয় কোম্পানিগুলোকে ইভি–সম্পর্কিত প্রযুক্তি, বিশেষত ব্যাটারি উন্নয়ন ও গবেষণায় নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য সহায়তা দেওয়া হয়।
সেই বছরই "দশটি শহর, এক হাজার যান" কর্মসূচির মাধ্যমে চীন বিদ্যুৎচালিত বাসের ব্যাপক বিস্তার শুরু করে।
আমেরিকান প্রতিযোগিতায় ছিল না গতি
মো–র মতে, ইভির প্রসারে চীনের দৃঢ় সংকল্পই তাদের ব্যাটারি শিল্পের উত্থানের প্রধান কারণ; আর সেই দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা প্রেরণা যুক্তরাষ্ট্র থেকেই পেয়েছিল।
১৯৭০–এর দশকে তেল–সংকটের পর যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাটারি–চালিত যানবাহন উন্নয়ন ও উৎপাদনের দিকে প্রথম আগ্রহ তৈরি হয়। এরপর ১৯৯০–এর দশকে যখন ফেডারেল সরকার বায়ুদূষণ মোকাবিলায় নতুন নীতিমালা প্রকাশ করে, তখন পুনরায় এ আগ্রহ সাড়া জাগায়।
১৯৯০ সালেই ক্যালিফোর্নিয়া শূন্য-নিঃসরণ যান (জেডইভি) প্রকল্প চালু করে, যার উদ্দেশ্য ছিল ইভি ব্যবহারে উৎসাহ দিয়ে বায়ু দূষণ কমানো। এই উদ্যোগ থেকেই জেডইভি ম্যান্ডেট চালু হয়—যা মূলত জেনারেল মোটরসের মতো গাড়ি কোম্পানিগুলোকেও ইভিতে বিনিয়োগ করতে বাধ্য করে, বলেন যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ইন্সটিটিউট ফর এনার্জি স্টাডিজের সিনিয়র গবেষক আন্দার্স হোভে।
মো বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে চলমান এসব পদক্ষেপ চীনা সরকারকে বুঝিয়ে দেয় যে ইভি হচ্ছে এমন "এক সোপান"—যা পরে "চতুর্থ শিল্পবিপ্লব" নামে পরিচিত ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর যুগে চীনের প্রবেশের পথ তৈরি করবে। আর নতুন শিল্পযুগে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করতে চীনের আগ্রহ ছিল প্রবল।
কিন্তু ক্যালিফোর্নিয়ার ইভি প্রচেষ্টার ফলে যুক্তরাষ্ট্রে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি শিল্প গড়ে ওঠেনি। হোভের মতে, আংশিকভাবে এর কারণ ছিল গাড়ি ও তেল কোম্পানিগুলোর লবিং—যারা জেডইভি ম্যান্ডেটকে দুর্বল করতে চাপ দেয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল যাতে তাদের উৎপাদিত হাইড্রোজেনচালিত ফুয়েল সেল ও নন-লিথিয়াম ব্যাটারি–নির্ভর হাইব্রিড গাড়িগুলো বেশি সুবিধা পায়।
২০০০–এর দশকে জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসন ইভি গবেষণা ও উন্নয়নে অর্থায়নের পদক্ষেপ নেয়। হোভে বলেন, তখন মার্কিন স্টার্টআপগুলো ব্যাটারি ও গাড়ি—উভয় ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করছিল। কিন্তু এরপরই আসে ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট।
তিনি বলেন, "[ইভি শিল্পের মার্কিন স্টার্টআপগুলোর প্রথম উদ্যোক্তারা] সবাই ভয়াবহ আর্থিক সংকটে পড়ে এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগের সুযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ওই খাতে যারা বিনিয়োগ করেছিলেন, সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হন।"
এরপরে ওবামা প্রশাসন নতুন করে তহবিল বরাদ্দ শুরু করলেও, হোভের মতে, তা নবায়নযোগ্য জ্বালানি–নির্ভর প্রথম দফার তা অনেক স্টার্টআপকে বাঁচাতে যথেষ্ট দেরিতে আসে। ততোদিনে, কোম্পানিগুলো প্রায় পথে বসেছিল নাহয় নিজেদের প্রযুক্তি বিক্রি করে দিতে শুরু করেছিল। এদের অনেককেই চীনা কোম্পানিগুলো কিনে নেয়। এর মধ্যে ছিল ব্যাটারি কোম্পানি এ১২৩, যেটি এমআইটি–উন্নীত অত্যাধুনিক লিথিয়াম-আয়ন প্রযুক্তির কারণে তখন উঠতি তারকা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। ২০১৩ সালে এ১২৩–কে অধিগ্রহণ করে চীনের ওয়ানশিয়াং।
একই সময়ে, বৈশ্বিক আর্থিক সংকট মোকাবিলায় চীন বিশাল চার ট্রিলিয়ন ইউয়ানের (তৎকালীন মূল্য প্রায় ৬৪৯ বিলিয়ন ডলার) প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে—যার একাংশ বরাদ্দ ছিল "জ্বালানি সাশ্রয় ও নিঃসরণ হ্রাস" প্রকল্পের জন্য। বিশ্ব বন্যপ্রাণী সংস্থা (ডব্লিউডব্লিউএফ) এবং চীনের রিসোর্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউট প্রকাশিত ২০১০ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই উদ্যোগ নবায়নযোগ্য প্রযুক্তিতে চীনের উদ্যোক্তাদের আগ্রহকে ব্যাপকভাবে উৎসাহ জোগায়।
চীনের ইভি শিল্পের সম্প্রসারণ
২০১২ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সময় চীনের ব্যাটারি নির্মাতাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণিত হয়, কারণ এই সময়ে দেশটির সরকার ইভি রাস্তায় নামানোর উদ্যোগকে দ্বিগুণ জোরদার করেছিল।
নতুন–জ্বালানিচালিত যানবাহনের জন্য একটি শিল্প রোডম্যাপ ওই সময়ে দেশে কত সংখ্যক ইভি ব্যবহৃত হবে তার লক্ষ্য নির্ধারণ করে। আরও গুরুত্বপূর্ণ ছিল—এটি ইভি ও ব্যাটারি নির্মাতাদের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা পাওয়ার শর্ত হিসেবে বিভিন্ন প্রযুক্তিগত মান নির্ধারণ করে, যা তাদের প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে।
২০১৩ সালে চীন ইভি কেনার ভর্তুকি শুধুমাত্র সরকারি খাত নয়, সাধারণ ভোক্তাদের জন্যও উন্মুক্ত করে—ফলে ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকানা বিপুলভাবে বাড়ার পথ খুলে যায়।
রাষ্ট্রীয় সমর্থনের পরিমাণ ছিল বিপুল। ২০১৪ সালে কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক সরকারগুলো মিলিয়ে প্রায় ১,০০০ কোটি ইউয়ান (তৎকালীন বিনিময় হারে ১.৬ বিলিয়ন ডলার) ভর্তুকি দেয়।
পরবর্তী আট বছরে নতুন–জ্বালানিচালিত যানবাহনের জন্য মোট ২০০ বিলিয়ন ইউয়ান (বা ২৮ বিলিয়ন ডলার) কর অব্যাহতি দেওয়া হয়।
এই বিপুল বিনিয়োগের ফলাফল প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে পায় চীন। চায়না অটোমোবাইল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে দেশটিতে উৎপাদিত ও বিক্রিত নতুন–জ্বালানিচালিত যানবাহনের সংখ্যা তিনগুণের বেশি বৃদ্ধি পায়।
তাদের বাজারহিস্যা ২০১৫ সালের ১.৩ শতাংশ থেকে বাড়তে বাড়তে ২০২৪ সালে ৪১ শতাংশে পৌঁছায়।
তবে ব্যাটারি শিল্পের জন্য আরও বড় প্রণোদনা তখনো আসেনি। ২০১৫ সালে চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রণয়ন করে, যা শি ইয়ানমেই এর ভাষায়—চীনা ব্যাটারি কোম্পানিগুলোর জন্য বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারকে "দেয়াল তুলে সুরক্ষিত" করেছিল।
তখন ইভি নির্মাতাদের বাধ্যতামূলক করা হয় যে, ভোক্তা ভর্তুকি পেতে হলে তাদের গাড়িতে অবশ্যই সরকার–নির্বাচিত সরবরাহকারীদের ব্যাটারি ব্যবহার করতে হবে। আর সরকার অনুমোদিত তালিকায় থাকা ৫৭টি কোম্পানির সবকটিই ছিল চীনের।
তিনি বলেন, "এটি ছিল অত্যন্ত চতুরভাবে তৈরি করা প্রযুক্তিগত মানদণ্ড, যা এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল যে কেবল চীনা ব্যাটারি কোম্পানিগুলিই যোগ্য বলে বিবেচিত হয়।"
তিনি আরও জানান, ওই সময় দক্ষিণ কোরিয়ার কিছু কোম্পানি ইতোমধ্যে চীনে কারখানা নির্মাণ শুরু করেছিল, "কিন্তু পরে জানতে পারে তাদেরকে সম্পূর্ণভাবে বাজারের বাইরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।"
দ্য ইকোনমিক অবজার্ভারের তখনকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যেসব চীনা ইভি নির্মাতা বিদেশি ব্যাটারি সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরশীল ছিল, তাদের শেষ মুহূর্তে নীতি মানতে সিএটিএল এবং আরও কয়েকটি দেশীয় কোম্পানির ব্যাটারিতে গ্রহণ করতে হয়। এই নিয়ম চার বছর বহাল ছিল।
দ্রুতগতির পথ
২০১১ সালে এটিএল থেকে আলাদা কোম্পানি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে সিএটিএল। নতুন গ্রাহকদের হঠাৎ ঢল হঠাৎ করেই প্রতিষ্ঠানটিকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইভি ব্যাটারি প্রস্তুতকারক হিসেবে ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত করে। চীনের নিংদেতে অবস্থিত এই কোম্পানিটি প্যানাসনিক এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠান বিওয়াডি-কেও পেছনে ফেলে। সিএটিএল তখন থেকে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে।
সরকারি নীতি সহায়তা "মেড ইন চায়না ২০২৫" কৌশলের মাধ্যমে অব্যাহত থাকে, যার লক্ষ্য ছিল প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মাধ্যমে ২০২০-এর মাঝামাঝি সময়ে বৈশ্বিক উৎপাদন ক্ষেত্রে চীনকে "প্রাধান্যপূর্ণ অবস্থানে" নেওয়া। নতুন শক্তিচালিত যানবাহন (এনইভি)–কে সেখানে "মূল অগ্রাধিকার" হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
এই গতি ধরে রেখে চীন ২০১৭ সালে অটোমেকারদের জন্য "ডুয়েল-ক্রেডিট" সুবিধা চালু করে। আংশিকভাবে ক্যালিফোর্নিয়ার জেডইভি কর্মসূচি থেকে অনুপ্রাণিত এই নীতি কার্যত সমস্ত গাড়ি নির্মাতাকে চীনে ইভি উৎপাদনে বাধ্য করে, যাতে তারা প্রচলিত জ্বালানির গাড়ি উৎপাদনের কারণে সৃষ্ট ব্যয় সমন্বয় করতে পারে। একমুখো সড়কের নকশা কোম্পানিগুলোকে আরো বেশি ইভি বানাতে বাধ্য করেছিল, যাতে অতিরিক্ত নগদ ব্যয় এড়ানোর সুযোগ ছিল।
শি ইয়ানমেই ব্যাখ্যা করেন, "গাড়ি নির্মাতা হিসেবে একদিকে আপনাকে চীনে ইভি বানাতেই হবে, নইলে আর্থিক জরিমানা দিতে হবে। অন্যদিকে, যেসব ইভি বানাতে আপনাকে বাধ্য করা হচ্ছে, সেগুলো চীনা ব্যাটারি ছাড়া বিক্রি করা যেত না। ফলে চীনা, কোরিয়ান, জাপানি, আমেরিকান, জার্মান—সব নির্মাতাকেই শেষ পর্যন্ত চীনা ব্যাটারি ব্যবহার করতে হয়েছে।"
এই দ্রুত সম্প্রসারিত ও সুরক্ষিত বাজার সিএটিএল-কে উন্নত পশ্চিমা গাড়ি নির্মাতাদের সঙ্গে যৌথ উদ্ভাবনে কাজ করার সুযোগ দেয়। ইয়েনমেই বলেন, এই প্রক্রিয়া তাদের দক্ষতা ও সক্ষমতা দ্রুত বাড়িয়ে তুলেছিল।
চীনের ইভি ও ব্যাটারি শিল্পের বৃদ্ধির পথ পশ্চিমা দেশের তুলনায় মৌলিকভাবে ভিন্ন ছিল। এখানে মূল শক্তি ছিল সরকার ও শিল্পের ঘনিষ্ঠ অংশীদারিত্ব, বলেন সঙ—সিনভল গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজির প্রতিষ্ঠাতা।
সরকারের বিপুল বিনিয়োগের লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট: একটি শক্তিশালী ইভি উৎপাদন শিল্প গড়ে তোলা। এবং সেই লক্ষ্য পূরণ হয়েছিল শিল্প-ব্যাপী কঠোর প্রতিযোগিতার মাধ্যমে—যেখানে কোন কোম্পানি বা প্রযুক্তি টিকে থাকবে, তা বাজার নির্ধারণ করেছে, সঙ ব্যাখ্যা করেন।
তিনি বলেন, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা বা জাপানের প্রচলিত মডেলের তুলনায় এই পদ্ধতি—যেন "শিল্পব্যাপী রেস" চালিয়ে সবচেয়ে দ্রুতগতির প্রতিযোগী বেছে নেওয়া্র—যা অত্যন্ত কার্যকর। "এতে চীন কোনো ল্যাব-স্তরের প্রযুক্তিকে অল্প সময়েই ব্যাপক উৎপাদনে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়।"
সাফল্যের গোপন রহস্য
চীনের ব্যাটারি শিল্পকে অন্যদের থেকে আলাদা করে এমন আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আছে। "এটি হলো সরবরাহ চেইন, জ্ঞান এবং উৎপাদনক্ষমতা," বলেন টেইলর ওগান, শেনজেনভিত্তিক স্নো বুল ক্যাপিটালের প্রধান নির্বাহী, যে প্রতিষ্ঠান চীনের পরিবেশবান প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ করে।
প্রথমত, চীনের শীর্ষ ব্যাটারি নির্মাতারা, যেমন সিএটিএল এবং বিওয়াইডি, "ভার্টিক্যালি ইন্টিগ্রেটেড" ব্যবসায়িক মডেলে পরিচালিত হয়—অর্থাৎ সাপ্লায়ার চেইনের প্রায় প্রতিটি অংশেই তাদের আংশিক বা সম্পূর্ণ মালিকানা থাকে।
"এটি খরচ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং তাদের সরবরাহ চেইনের নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করে," বলেন চেন শান, নরওয়েজিয়ান পরামর্শক রিসটাড এনার্জির সাংহাই–ভিত্তিক ব্যাটারি বাজার বিশ্লেষক।
এছাড়া বৃহৎ পরিসরে তাদের উৎপাদন পরিচালনার সক্ষমতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চীনের শিয়ান জিয়াওতং–লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাটারি উপকরণ নিয়ে গবেষণা করেন লিউ চেংগুয়াং। তিনি বলেন, "আধুনিক ইভি ব্যাটারি প্যাকে শত শত ছোট সেল। একটি সেল দুর্বল হলে পুরো চেইনের কর্মক্ষমতা নষ্ট হতে পারে। এতে রেঞ্জ কমে যেতে পারে এবং নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়ে। তাই প্রতিটি সেলকে প্রায় একই রকম নিখুঁত হতে হবে।"
এই মান অর্জন করতে লাগে "বিশাল, উচ্চস্তরের স্বয়ংক্রিয় কারখানা, যেখানে কঠোর প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ, রিয়েল-টাইম পরীক্ষণ এবং স্মার্ট বাছাই পদ্ধতি" থাকে, তিনি উল্লেখ করেন।
আর এটাই সিএটিএল-এর প্রধান শক্তি। ২০২৪ সালে বৈশ্বিক ইভি ব্যাটারি বাজারের প্রায় ৪০ শতাংশ দখল করে কোম্পানিটি, যা দ্বিতীয় স্থানে থাকা বিওয়াইডি-এর চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি।
চীনা ব্যবসায়িক সংবাদমাধ্যম লেট পোস্ট–এর সাংবাদিক চেং ম্যানচি বলেন, "সিএটিএল-এর সাফল্যের রহস্য হলো—তারা কম খরচে ভালো ব্যাটারি তৈরি করতে পারে, একই সঙ্গে বিশাল উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে।"
ক্রমাগত উদ্ভাবনও চীনা ব্যাটারি নির্মাতাদের এগিয়ে থাকার আরেকটি প্রধান কারণ। যেমন, বিওয়াইডির বিখ্যাত "ব্লেড ব্যাটারি"—এক ধরনের লিথিয়াম-আয়রন-ফসফেট (এলএফপি) ব্যাটারি। ২০২০ সালে এটি আংশিকভাবে বাজারে ছাড়া হয়। এটি উৎপাদন করা সস্তা ছিল: কারণ এই ব্যাটারিতে কোবাল্ট ব্যবহার করা হয় না, যা চীনের জন্য আমদানিনির্ভর। কিন্তু বিওয়াইডি আগের এলএফপি ব্যাটারির কার্যক্ষমতা অনেক বাড়িয়ে তোলে—এগুলোকে আরও শক্তিশালী, নিরাপদ এবং ছোট করে। এটি এত জনপ্রিয় হয় যে চীনে প্রচলিত লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির ধরন পরিবর্তন করে দেয়।
এত দ্রুত প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পেছনে আছে বিশাল সংখ্যক চীনা ব্যাটারি প্রকৌশলী—যারা কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং ব্যাটারি কোম্পানিগুলোর লক্ষ্যভিত্তিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এসেছে।
ট্রিভিয়াম চায়নার সমালোচনামূলক খনিজ ও সরবরাহ চেইন গবেষণা প্রধান কোরি কম্বস বলেন, "চীনা প্রতিষ্ঠানে আছে অত্যন্ত দক্ষ একটি প্রজন্মের প্রযুক্তি গবেষক।"
"তারা শুধু ল্যাবে কাজ করা পিএইচডিধারী নয়। তারা শুধু কারখানার মেঝেতে কাজ করা শ্রমিকও নয়," তিনি আরও বলেন। তারা হলো "প্র্যাকটিসিং ইঞ্জিনিয়ার"—যারা উৎপাদন প্রক্রিয়া গভীরভাবে বোঝে, বাজার কী চায় জানে এবং সেই অনুযায়ী দ্রুত প্রযুক্তি উন্নত করতে পারে। "ব্যাটারি সাশ্রয়ী মূল্যে উৎপাদন করতে হলে এটাই লাগে।"
সিএটিএল–এ ২০ হাজারের বেশি প্রযুক্তিগত প্রকৌশলী কাজ করেন এবং বিওয়াইডি–এর ব্যাটারি বিভাগ ফিনড্রিমস ব্যাটারিতে ১০ হাজারের বেশি প্রকৌশলী আছেন।
চীন কি তার আধিপত্য ধরে রাখতে পারবে?
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কিছু কাঁচামাল উত্তোলন ও প্রক্রিয়াকরণ ছাড়া—চীন বর্তমানে ব্যাটারি সরবরাহ চেইনের প্রায় প্রতিটি ধাপে আধিপত্য বিস্তার করেছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির গবেষণা বলছে, বৈশ্বিক ব্যাটারি উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় ৮৫ শতাংশ চীনের দখলে, যেখানে উত্তর আমেরিকার উৎপাদকদের বাজারহিস্যা মাত্র ৫ শতাংশ এবং ইউরোপীয় উৎপাদকদের ৭ শতাংশ।
গবেষকদের সাধারণ মত হলো: বর্তমান প্রজন্মের ব্যাটারি প্রযুক্তিতে চীনের আধিপত্য চ্যালেঞ্জ করা অন্য দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে।
"চীনের নেতৃত্বে পৌঁছাতে যে শিল্প–গুচ্ছ বা সরবরাহ চেইনের একীভূতকরণের মতো উপাদান ভূমিকা রেখেছে, সেগুলো কপি করা কঠিন," বলেন কেট লোগান, এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের পরিচালক, যিনি চীনের জলবায়ু ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি নীতি নিয়ে গবেষণা করছেন।
চীনা কোম্পানিগুলো ব্যাটারি উৎপাদনে ইতোমধ্যেই ব্যাপক স্কেলে পৌঁছে গেছে এবং বিদেশেও কারখানা স্থাপন করছে—এটিও সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য বড় বাধা।
থিঙ্ক ট্যাঙ্ক র্যান্ড ইউরোপের গবেষক ফ্রান্সেস্কা গিরেট্টি বলেন, "চীনা ব্যাটারি সস্তা, উচ্চ কার্যক্ষম এবং সহজলভ্য।" এর উৎপাদনের ব্যাপকতা "অন্যান্যদের জন্য ধরা–ছোঁয়ার মতো নয়—প্রযুক্তির সাথে নয়, প্রযুক্তির বাণিজ্যিক সফলতার সাথে," তিনি আরও বলেন।
তবে মো মনে করেন, অন্যান্য দেশের জন্য দরজা সম্পূর্ণ বন্ধ নয়। চীন বিদ্যমান প্রযুক্তিকে আরও ভালো ও সস্তা করার ক্ষেত্রে দক্ষ, কিন্তু "সর্বাধুনিক গবেষণায়" তাদের দুর্বলতা আছে।
যদি অন্য দেশগুলো পরবর্তী প্রজন্মের ব্যাটারি প্রযুক্তিতে—যেমন সলিড–স্টেট ব্যাটারি—অগ্রগামী হতে পারে, "তাহলে তাদের প্রতিযোগিতার সুযোগ থাকতে পারে," তিনি বলেন। প্রচলিত লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারিতে তরল ইলেকট্রোলাইট থাকে, কিন্তু সলিড–স্টেট ব্যাটারিতে কঠিন ইলেকট্রোলাইট থাকে—যা তরল–ভিত্তিক সেলের বিদ্যমান সরবরাহ চেইনের প্রয়োজন নাও করতে পারে, ফলে চীনের বাইরের নির্মাতাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
চীনের সিএটিএল এবং বিওয়াইডি, দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং এসডিআই এবং যুক্তরাষ্ট্রের কোয়ান্টামস্কেপ—সবাই সলিড–স্টেট ব্যাটারি উন্নয়নে কাজ করছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য—যারা বর্তমানে লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারিতে চীনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল—প্রতিযোগিতামূলক স্কেলে উৎপাদন বাড়ানো কঠিন হবে, অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি স্টাডিজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী। বাধাগুলোর মধ্যে আছে—জ্ঞান ঘাটতি, অনিশ্চিত চাহিদা এবং উচ্চ জ্বালানি ব্যয়।
তবে অনেকে মনে করেন—নিজস্ব ব্যাটারি শিল্প গড়ে তোলার মানে এই নয় যে তা চীনের সাথে সরাসরি প্রতিযোগিতা করতে হবে।
অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউটের হোভে বলেন, "স্বল্পমেয়াদে এটি সম্ভব কেবল চীনা কোম্পানির সঙ্গে কাজ করেই, কারণ তারাই প্রযুক্তির শীর্ষে।" "আপনার যদি সেই উৎপাদন দক্ষতা না থাকে, তবে আপনি কোনো অগ্রগামী প্রযুক্তিকে বৃহৎ পরিসরে নিয়ে যেতে পারবেন না।"
তিনি বলেন, জ্ঞান বৃদ্ধি—ক্যাচ–আপের প্রধান উপায়।
কিন্তু এটি সহজ কাজ নয়—কারণ ব্যাটারি উৎপাদন ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে চীনের ২০ বছরের অগ্রগামী সুবিধা আছে। স্নো বুল ক্যাপিটালের ওগানের মতে, গত দুই দশক চীনের বিশ্বব্যাপী ব্যাটারি সরবরাহ চেইনে দীর্ঘস্থায়ী নেতৃত্ব নিশ্চিত করে দিয়েছে।
তিনি বলেন, "আমি এমন কোনো সময় কল্পনাই করতে পারি না যখন ব্যাটারি উৎপাদনে অন্য কোনো দেশ চীনের সমকক্ষ হতে পারবে। তারা অনেক দূরে এগিয়ে গেছে।"
সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা