মনিরুল ইসলাম: জামালপুর-৩ আসনের মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে হামের প্রাদুর্ভাব রোধে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে আসছে। হামের প্রাদুর্ভাবের কারণ, বিস্তার এবং টিকাদান কার্যক্রমের ওপর বিভিন্ন নীতিগত ও পরিচালনাগত বিষয়ের প্রভাব নিয়মিতভাবে পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন করা হয়।
তিনি বলেন, ইপিআই কর্মসূচির আওতায় টিকা সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিতরণ কার্যক্রম আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং প্রচলিত সরকারি বিধি-বিধান অনুসরণ করে সম্পাদিত হয়ে থাকে। টিকা সংগ্রহ পদ্ধতিতে কোনো পরিবর্তনের ফলে টিকাদান কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কি না, তা পর্যালোচনা করা হবে। এতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
দেশে হামের টিকাদানের আওতা বৃদ্ধি এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষার আওতায় আনতে বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
বুধবার জাতীয় সংসদে জামালপুর-৩ আসনের মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ কথা জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপন করা হয়।
তিনি তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জাতীয় সংসদকে জানান। তিনি বলেন, তিস্তা নদীতে শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণের জন্য আরও একটি ব্যারেজ নির্মাণের জন্য কারিগরি ও আর্থিক বিষয়সমূহ বিভিন্ন পর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিস্তা নদীকেন্দ্রিক টেকসই ও সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে একটি সমীক্ষা কার্যক্রম ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে। এই সমীক্ষা প্রতিবেদনে তিস্তা মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে ১১০ কিলোমিটার নদী তীর সংরক্ষণ, ১১০ কিলোমিটার নদী ড্রেজিং, ২২৪ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং বাঁধের উপর রাস্তা নির্মাণ, ৬৭টি গ্রোয়েন/স্পার নির্মাণ ও মেরামত এবং ১৭০ বর্গ কিলোমিটার ভূমি পুনরুদ্ধার ও উন্নয়ন কাজ প্রস্তাব করা হয়েছে।
দিনাজপুর-১ আসনের মনজুলুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লিখিত ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নীতির আলোকে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। সরকার বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবা দিতে বদ্ধপরিকর। তিনি বলেন, পাবনা মানসিক হাসপাতালকে আন্তর্জাতিক মানে রূপান্তর করে একটি পূর্ণাঙ্গ মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের মো. আব্দুল্লাহের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে কর-জিডিপি ১০ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীতকরণের লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
কুমিল্লা-১০ আসনের মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার প্রশ্নের জবাবে সংসদ নেতা বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে দেশের সড়ক ও রেল যোগাযোগ উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে জাতীয় মহাসড়কগুলোতে এক্সপ্রেসওয়ে গ্রিড এবং সড়কের উপর চাপ কমানোর জন্য মাল্টিমোডাল পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা; সব শ্রেণির মহাসড়কে ওভারলোড নিয়ন্ত্রণে এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং স্মার্ট মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা; সব ধরনের সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; ঢাকার ওপর চাপ কমাতে রিং রোড এবং রেডিয়াল নেটওয়ার্ক তৈরি এবং যানজটপূর্ণ ইন্টারসেকশনগুলোতে প্রয়োজনীয় স্ট্রাকচার নির্মাণ করে নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করা হবে।
তিনি বলেন, নির্মাণাধীন ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগ স্থাপনের জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রেলপথে যাতায়াতের সময় কমিয়ে আনা, নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব যোগাযোগ নিশ্চিত করতে প্রধান প্রধান রুটসমূহে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, রেলওয়ে সেবাকে পর্যায়ক্রমে প্রতিটি জেলা ও প্রধান শহরগুলোর দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হবে। ক্রমান্বয়ে আন্তঃনগর ট্রেন ও কমিউটার ট্রেনের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।
ভোলা-৪ আসনের মোহাম্মদ নূরুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক ও শ্রম কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদারের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান, অভিবাসন-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার মাধ্যমে বাংলাদেশের শ্রমবাজারকে আরও গতিশীল ও টেকসই করে তুলতে আমাদের সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
সরকারদলীয় এমপি শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা ওয়াসা প্রায় ৬৫-৭০ শতাংশ পানি ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে এবং বাকি ৩০-৩৫ শতাংশ ভূ-উপরিস্থ উৎস (যেমন— পদ্মা, মেঘনা এবং শীতলক্ষ্যা নদী) থেকে সংগ্রহ করছে। চট্টগ্রাম ওয়াসার মাধ্যমে সরবরাহ করা পানির প্রায় ৯২ শতাংশ নদী ও জলাধারের মতো ভূ-উপরিস্থ থেকে সংগ্রহ করা হয়। বাকি ৮ শতাংশ পানি গভীর নলকূপ বা ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে উত্তোলন করা হচ্ছে। রাজশাহী ওয়াসার ২ শতাংশ ভূ-উপরিস্থ এবং ভূগর্ভস্থ ৯৮ শতাংশ পানি সরবরাহ।
খুলনা ও বরিশাল বিভাগীয় শহরে নদীর পানিতে লবণাক্ততা বড় সমস্যা বিধায় ভূ-উপরিস্থ পানির নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে বড় ধরনের ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট এবং বিকল্প জলাধার তৈরির কাজ চলমান রয়েছে। সিলেট ও ময়মনসিংহ তুলনামূলকভাবে পাহাড় ও নদীবেষ্টিত হওয়ায় এই এলাকাগুলোতে ভূ-উপরিস্থ পানির প্রাপ্যতা বেশি হলেও পানি দূষণ রোধ করে সুপেয় পানি সরবরাহের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বিভাগীয় শহরে ভূগর্ভস্থ পানির পরিবর্তে ভূ-উপরিস্থ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে।
নেত্রকোনা-৫ আসনের মাছুম মোস্তফার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ের সেবাকেন্দ্রসমূহে মেডিকেল অফিসার এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ সেবাকেন্দ্রসমূহে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ১৭ হাজার ৮৭০টি অনুমোদিত পদ রয়েছে। যার মধ্যে ১১ হাজার ৫০১টি পদে জনবল আছে এবং ৬ হাজার ৩৫৯টি শূন্য পদ রয়েছে।
গাজীপুর-৪ আসনের সালাহ উদ্দিনের প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, আগামীতে হজের খরচ কমানোর পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। হজের খরচ কমিয়ে তা সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের নাগালে আনার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি জানান, হজের ব্যয় কমাতে রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে এবং ২০২৭ সালের হজ প্যাকেজ আরও সাশ্রয়ী বা যৌক্তিকভাবে নির্ধারণের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে হজের খরচ বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, হজ একটি দ্বি-রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা। এর মোট ব্যয়ের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ খরচ সৌদি আরব সরকার নির্ধারণ করে। এর মধ্যে মিনা ও আরাফাতের তাবু ভাড়া, পরিবহন, মোয়াল্লেম সার্ভিস চার্জ, মক্কা-মদিনায় হোটেল ভাড়া এবং ভিসা-ইন্সুরেন্স ফি অন্তর্ভুক্ত। বাকি মাত্র এক-চতুর্থাংশ ব্যয় বাংলাদেশ অংশে হয়, যার সিংহভাগই বিমান ভাড়া।
সংসদকে প্রধানমন্ত্রী জানান, ২০২৫ সালে সর্বনিম্ন হজ প্যাকেজ ছিল ৪ লক্ষ ৭৮ হাজার ২৪২ টাকা। সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ২০২৬ সালে হজের খরচ ১১ হাজার ০৭৫ টাকা কমানো সম্ভব হয়েছে। ফলে ২০২৬ সালে সর্বনিম্ন হজ প্যাকেজ নির্ধারিত হয় ৪ লক্ষ ৬৭ হাজার ১৬৭ টাকা (কুরবানিসহ)।
২০২৬ সালের হজ প্যাকেজের ব্যবচ্ছেদ:
সৌদি আরব পর্বের ব্যয়: ৩ লক্ষ ০০ হাজার ৭৯৭ টাকা।
বাংলাদেশ পর্বের ব্যয়: ১ লক্ষ ৬৬ হাজার ৩৬৯ টাকা (এর মধ্যে বিমান ভাড়া ১ লক্ষ ৫৪ হাজার ৮৩০ টাকা)।
২০২৭ সালের জন্য নতুন পরিকল্পনা
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ধর্মপ্রাণ নাগরিকদের জন্য একটি সাশ্রয়ী, সহজলভ্য, মানবিক ও প্রবাসীবান্ধব হজ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও সৌদি আরবের খরচ বিবেচনায় নিয়ে ২০২৭ সালের হজ প্যাকেজ আরও কমিয়ে আনার বা যৌক্তিকভাবে নির্ধারণের জন্য সরকার সব ধরনের কূটনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে।