ত্যাগ, পারস্পরিক সৌহার্দ্য আর আনন্দের বার্তা নিয়ে হাজির পবিত্র ঈদুল আজহা। হজরত ইবরাহিমের (আ.) মহান কুরবানির শিক্ষা নিয়ে উপস্থিত হয় পবিত্র ঈদুল আজহা।
‘ঈদুল আজহা’ হলো বড়ো ঈদ। ‘ঈদুল আজহা’ নাম রাখার কারণ হলো এটি কুরবানির ঈদ। এই ঈদ জিলহজ মাসের ৯ তারিখ হজের ইবাদতের শেষে ১০ তারিখে উপস্থিত হয়। হজরত রাসুল করিম (সা.) এই ঈদকে ঈদুল আজহা বলেই উল্লেখ করেছেন। ‘আজহা’ শব্দ আরবি ভাষায় ‘আজহী’ শব্দের বহুবচন, যেমন ‘আজহী’ আজহিয়াতুল’ শব্দের বহুবচন। এর অর্থ হলো কুরবানির জন্তু ।
ইসলামি পরিভাষায় এর অপর নাম হল ‘ইয়াউমুন নহর’। ‘নাহর’ অর্থও কুরবানির জন্তু। উভয় নামই স্বয়ং মহানবী (সা.) ব্যবহার করেছেন।
আল্লাহতায়ালার আদেশে হজরত ইবরাহিম (আ.) তার প্রথম পুত্র হজরত ইসমাঈলকে (আ.) জল ও বৃক্ষ লতা শূন্য মক্কা উপত্যকায় এনে বাস করতে রেখে যান। সেখানে জীবনধারণের কিছুই ছিল না। প্রকৃত পক্ষে এটিই ইবরাহিমের (আ.) ওই স্বপ্নের তাৎপর্য ছিল, যে স্বপ্নে তিনি দেখেছিলেন তিনি তার পুত্রকে জবেহ করছেন।
তখন আল্লাহতায়ালা পুত্র কুরবানির স্থানে বাহ্যিকভাবে পশু কুরবানির আদেশ করেন। তৎকালীন সময়ে মানুষ কুরবানিরই প্রচলন ছিল কিন্তু আল্লাহতায়ালা মানুষ কুরবানির পরিবর্তে পশু কুরবানির সূচনা করালেন হজরত ইবরাহিম (আ.)এর মাধ্যমে।
আর এটিই ছিল প্রথম মানুষ ওয়াক্ফ, যা কেবল মাত্র আল্লাহর জন্যই উপস্থিত করা হয়েছিল। আর এর উদ্দেশ্যই এটাই ছিল যাতে আল্লাহতায়ালা হজরত ইসমাঈল (আ.)কে তার মৃত্যুর পর এক নব জীবন দিয়ে তার বংশের বীজ বপন করেন।
অবশেষে এই বীজ থেকে বিশ্ব ধর্ম বিধানের বাহক, শ্রেষ্ঠ আদম সন্তান, নবীদের গৌরব ও শ্রেষ্ঠনবী হজরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম হয়।
হজে কুরবানির প্রথা মূলত হজরত ইসমাঈল (আ.)এর এই কুরবানির একটি বাহ্যিক আলামত, যদ্বারা এই অতুলনীয় কুরবানির স্মৃতি চিরদিন যেন জাগরূক থাকে।
তার পবিত্র বংশ-এরা বাহ্যিক জলশূন্য, ঘাস-তরুলতা, ফল-ফুল শূন্য মক্কা উপত্যকায় সেই অনুপম ফল উৎপাদন করলো, যার ফুৎকারে পৃথিবীতে আধ্যাত্মিকতা সজীব হলো, সজীব আছে এবং চিরকাল থাকবে।
ঈদুল আজহার কুরবানি সেই পবিত্র কুরবানিরই স্মৃতি রক্ষক। কিন্তু এ যুগে আধ্যাত্মিক অবনতি এবং জড়োন্নতিতে মানুষ অশ্রু বর্ষণ করাতো দূরের কথা, আজ অধিকাংশ মুসলমান ঈদুল আজহা নামটি কেন হয়েছে তাও স্মরণ করতে চায় না।
ঈদুল আজহার দিন কুরবানি করা মহানবী (সা.)এর শুধু ব্যক্তিগত কর্মই ছিল না বরং তিনি তার সাহাবাদেরকেও কুরবানি করার নির্দেশ প্রদান করতেন। হাদিসে বর্ণিত রয়েছে, হজরত বারা (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী (সা.) ঈদুল আজহার দিন খোতবা প্রদান করেন এবং বলেন, এই দিন প্রথমে মানুষ ঈদের নামাজ পড়বে এবং তার পর কুরবানি করবে।
সুতরাং যে এইরূপে করে সে তার (সা.) সুন্নতকে লাভ করেছে (বোখারি ও মুসলিম)।
আরেক স্থানে তিনি (সা.) বলেন, যার আর্থিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে কুরবানি করে না, সে কেন আমাদের ঈদগাহে এসে নামাজে শামিল হয়? (মুসনাদ আহমদ)।
হজরত রাসূল করিম (সা.)এর এই কথাকে সাহাবিরা (রা.) খুব ভালোভাবেই স্মরণ রেখেছিলেন এবং সাধ্যমতো কুরবানি করতেন।
হজরত রাসুল (সা.)এর এই কুরবানি শুধু ব্যক্তিগত শখ অথবা বন্ধু-বান্ধব এবং দরিদ্রদেরকে গোশ্ত খাওয়ানোর উদ্দেশ্যে ছিল না বরং তিনি একে একটি ধমীর্য় কাজ জ্ঞান করতেন এবং পুণ্য মনে করতেন।
যেমন হাদিসে বর্ণিত আছে, হজরত যায়েদ বিন আরকাম (রা.) বলেন, সাহাবিরা (রা.) মহানবী (সা.)কে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! ঈদুল আযহার এই যে কুরবানি, এগুলি কেমন? তিনি (সা.) বললেন, তোমাদের প্রধান পূর্ব পুরুষ ইবরাহিমের প্রবর্তিত সুন্নত এটি। সাহাবিরা বললেন, তবে আমাদের জন্য এতে লাভ কি?
তিনি বললেন, কুরবানির জন্তুর প্রত্যেকটি লোম কুরবানিকারীর জন্য এক একটি পুণ্য, যা তাকে খোদার কাছে পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য করবে (ইবনে মাজা)।
এ থেকে অনুধাবন করা যায় যে, ইসলামে কুরবানির গুরুত্ব কত ব্যাপক।
এই যে কুরবানি তাকি শুধু পশু কুরবানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ, নাকি অন্য কিছুও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত? আসলে ইসলামের শিক্ষা হচ্ছে মানুষ যেন কেবল মাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিমিত্তে কুরবানি করে। হজরত ইবরাহিম (আ.)এর কুরবানি ছিল শুধু মাত্র আল্লাহর জন্য।
তার উদ্দেশ্য একটাই ছিল আর তা হলো আল্লাহ পাকের সাথে তার সম্পর্ক যেন প্রেমময় হয় এবং আল্লাহ যেন তাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে নেন।
অপর দিকে আল্লাহতায়ালাও তার কুরবানি ও দোয়াকে গ্রহণ করে তার বংশে সর্ব শ্রেষ্ঠ রাসুল প্রেরণ করে বিশ্বকে আবার প্রেমময় আল্লাহকে লাভ করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন। তাই আমাদেরকেও হজরত ইবরাহিম (আ.)এর কুরবানির শিক্ষাকে নিজেদের অন্তরে ধারণ করে মহান আল্লাহ পাকের সঙ্গে গভীর এক ভালোবাসার বন্ধন তৈরি করতে হবে আর এই বন্ধন আমরা তখনই সৃষ্টি করতে পারবো যখন আমাদের আত্মা হবে পবিত্র।
আমাদের হৃদয়ের পশুত্বকে যদি আমরা চিরতরের জন্য কুরবানি করতে পারি তাহলেই আমরা আল্লাহতায়ালার প্রিয়দের অন্তর্ভুক্ত হবো।
আমাদের সকলকে প্রকৃত অর্থে ঈদুল আজহার গুরুত্ব বুঝার তাওফিক দান করুন, আমিন।
লেখক: ইসলামি গবেষক ও কলামিষ্ট
সূত্র: যুগান্তর