হোযাইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উপস্থিত থাকাকালে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, ২৪ মার্চ ২০২৬। দি ইন্টারসেপ্ট
মধ্যপ্রাচ্যে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৭৫০ জন মার্কিন সেনা নিহত বা আহত হয়েছেন, এমন তথ্য দিয়েছে ‘দি ইন্টারসেপ্ট’-এর এক বিশ্লেষণ। কিন্তু এই বাস্তবতা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করছে না পেন্টাগন।
মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক কার্যক্রম তদারককারী মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ‘ক্ষয়ক্ষতি গোপনের’ কাজে লিপ্ত রয়েছে বলে জানিয়েছেন এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা। তারা ইন্টারসেপ্টকে কম ও পুরোনো তথ্য দিচ্ছে এবং হতাহতদের বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যাও দিচ্ছে না।
গত শুক্রবার (২৭ মার্চ) সৌদি আরবের একটি বিমানঘাঁটিতে ইরানের হামলায় অন্তত ১৫ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন বলে দুই সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন। এক মাসের কিছু বেশি সময় আগে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে এই অঞ্চলে শত শত মার্কিন সেনা নিহত বা আহত হয়েছেন।
যুদ্ধে নিহত প্রথম মার্কিনদের মরদেহ গ্রহণ অনুষ্ঠানে নীল স্যুট, লাল টাই ও ক্যাপ পরে হাজির হন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, এমন সংঘাতে হতাহতের ঘটনা অনিবার্য।
ট্রাম্প বলেন, ‘এই ধরনের সংঘাতে মৃত্যু হবেই। আমি নিহতদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা অসাধারণ মানুষ। কিন্তু সবারই একটাই কথা—স্যার, কাজটা শেষ করুন।
গত মঙ্গলবার ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই তিনি ইরান যুদ্ধ গুটিয়ে নিতে পারেন। যদিও তিনি ঘোষিত অনেক লক্ষ্যই অর্জন করতে পারেননি। এর মধ্যে ছিল ইরানের জনগণের ‘স্বাধীনতা’, দেশটির তেল দখল এবং নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করা। একসময় তিনি বলেছিলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চলবে।’
এদিকে সেন্টকমের দেওয়া হতাহতের সংখ্যা পুরোনো ও অসম্পূর্ণ।
গত সোমবার মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স জানান, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি শুরুর পর থেকে প্রায় ৩০৩ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন।’ কিন্তু এই তথ্য তিন দিন পুরোনো এবং শুক্রবারের হামলায় আহত অন্তত ১৫ জনকে এতে ধরা হয়নি। আপডেট তথ্য চাওয়া হলেও সেন্টকম কোনো জবাব দেয়নি।
যুদ্ধে কতজন সেনা নিহত হয়েছেন, সেই সংখ্যাও সেন্টকম জানাতে রাজি হয়নি। তবে ইন্টারসেপ্টের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কমপক্ষে ১৫ জন নিহত হয়েছেন।
এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেন, ‘স্পষ্টতই এই বিষয়টি প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ও হোয়াইট হাউস আড়াল করতে চাইছে।’
২০২৪ সালে বাইডেন প্রশাসনের সময় পেন্টাগন হামলার বিস্তারিত তালিকা প্রকাশ করত। কোথায় হামলা হয়েছে, কী ধরনের হামলা, কতজন হতাহত সবকিছুই দেওয়া হতো। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের তথ্যে এসব স্পষ্টতা নেই।
বর্তমান সেন্টকমের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড রণতরীতে আগুনে আহত দুই শতাধিক নৌসেনার হিসাব, যারা আগুনের ধোঁয়ায় শ্বাসজনিত কারণে বা অন্যভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার জানতে চাইলেও সেন্টকম কোনো উত্তর দেয়নি।
ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ থিংক ট্যাঙ্কের বিশ্লেষক জেনিফার কাভানাঘ বলেন, ‘এই যুদ্ধে কত খরচ ও ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, সে বিষয়ে সঠিক ও সময়োপযোগী তথ্য দেওয়া উচিত। কারণ যুদ্ধের খরচ বহন করছে মার্কিন জনগণ।’
মার্কিন হামলার জবাবে ইরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। কিন্তু সেন্টকম কতটি ঘাঁটি আক্রান্ত হয়েছে, সেই সংখ্যাও জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
ইন্টারসেপ্টের বিশ্লেষণ বলছে, বাহরাইন, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, সিরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঘাঁটিগুলো লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ বলেন, ‘ইরান পাল্টা হামলার সক্ষমতা রাখে, তবে তা কার্যকর হবে না। তারা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়বে, আমরা সেগুলো ভূপাতিত করব।’
কিন্তু বুধবার বাহরাইন, কুয়েত ও কাতার সবগুলো দেশই ইরানের হামলার কথা জানিয়েছে।
ইরানের হামলার কারণে মার্কিন সেনাদের অনেক ঘাঁটি ছেড়ে হোটেল ও অফিস ভবনে আশ্রয় নিতে হয়েছে বলে দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ঘাঁটিগুলো যথেষ্ট সুরক্ষিত না করার জন্য পেন্টাগন দায়ী।
অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল জোসেফ ভোটেল বলেন, ‘এক দশক ধরেই ড্রোন হামলার ঝুঁকি ছিল। আমরা জানতাম, ইরান পাল্টা হামলা করবে। সেই প্রস্তুতি থাকা উচিত ছিল।’
জেনিফার কাভানাঘও বলেন, সস্তা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের বিস্তার মার্কিন ঘাঁটিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে, তবুও পেন্টাগন যথেষ্ট বিনিয়োগ করেনি। এই ব্যর্থতা প্রমাণ করে, শুধু বাজেট বাড়ালেই জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না।
তিনি আরও বলেন, ‘বরং এই অঞ্চলের ঘাঁটিগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ করাই ভালো হতে পারে।’
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অভিযোগ করেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর বেসামরিক অবকাঠামোকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্র।
তিনি বলেন, ‘মার্কিন সেনারা ঘাঁটি ছেড়ে হোটেল ও অফিসে আশ্রয় নিয়েছে।’
জোসেফ ভোটেল সতর্ক করে বলেছেন, ‘এতে বেসামরিক স্থাপনাও সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।’
গত মাসে বাহরাইনের একটি হোটেলে ইরানি ড্রোন হামলায় দুই মার্কিন কর্মী আহত হন বলে ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়।
ভোটেলের মতে, ‘সেনাদের ঘাঁটি ছেড়ে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হলে কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।’
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অন্তত ১৫ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে কুয়েতে একটি ড্রোন হামলায় ৬ জন নিহত হন। আরও ৫২০ জনের বেশি সেনা আহত হয়েছেন।
বর্তমান যুদ্ধের আগে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ড্রোন, রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বেড়েছিল। এতে অন্তত ১৭৫ জন হতাহত হয়, যার মধ্যে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে জর্ডানে ৩ জন নিহত হন।
এই পরিসংখ্যানে ঠিকাদারদের (কন্ট্রাক্টর) ক্ষয়ক্ষতি ধরা হয়নি। ২০২৪ সালে সেন্টকম এলাকায় প্রায় ১২৯০০ জন ঠিকাদার আহত হন, যার মধ্যে ৩৭০০ জন গুরুতর আহত। এছাড়া ইরাকে ১৮ জন নিহত হন।
সব মিলিয়ে মার্কিন সেনা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মোট হতাহতের সংখ্যা ১৩৬০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।