মহসিন কবির: জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির জয়লাভের পর অনেক ঝিমিয়ে পড়েছেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। কিছু নেতাদের বহিষ্কার করার কারণে দলের ভেতরে অস্থিরতা দেখা দিয়েছিলো। এখস সামনে বিভিন্ন সংকট দেখা দিয়েছে, এজন্য দলীয় নেতাকর্মীদের চাঙা করার চেষ্টা করছে বিএনপি সিনিয়র নেতারা।
এরই অংশ হিসেবে দল ও সংগঠনের বিভিন্ন স্তরে নেতৃত্বের পুনর্বিন্যাস এবং দলীয় কর্মকাণ্ড বাড়াতে জোর দিচ্ছে হাইকমান্ড। সম্প্রতি রাজধানীতে দলের কেন্দ্রীয় ও গুলশানে চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী এবং দলীয় প্রধান তারেক রহমানের অফিস করার মাধ্যমে সে বার্তাই দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা।
সরকার গঠনের পর যেকোনো রাজনৈতিক দলের জন্যই স্বাভাবিক চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে আগের মতো করে সংগঠনের গতি ধরে রাখা। কারণ, এ সময়ে দায়িত্বের ভার যেমন বাড়ে, তেমনি দলীয় কার্যক্রমও অনেক সময় প্রশাসনিক ব্যস্ততার আড়ালে চাপা পড়ে যায়। সদ্য ক্ষমতায় আসা বিএনপিও এর ব্যতিক্রম নয়।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে বিএনপি। এর মধ্য দিয়ে প্রায় ২০ বছর পর সরকার গঠনের সুযোগ পায় দলটি। বিপুল জনরায় নিয়ে ক্ষমতায় এলেও মাঠের কার্যক্রম না থাকায় ঝিমিয়ে পড়েছে দলটি।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, শীর্ষ নেতাদের বেশিরভাগই সরকারের অংশ হয়ে উঠেছেন। ফলে দলীয় কর্মকাণ্ডকে বেগবান করায় তারা মনোনিবেশ করতে পারছেন না। অন্যদিকে দলীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশ এখন বেশি মনোযোগী এমপি-মন্ত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা, সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা নিয়ে। কেউ কেউ আবার ব্যক্তিগত প্রত্যাশা পূরণের অপেক্ষায় লবিং-তদবিরে ব্যস্ত।
আগের মতো দল ও সংগঠনকেন্দ্রিক সময় দেওয়া হচ্ছে না তাদের। ফলে রাজনৈতিক কর্মসূচি, আদর্শিক চর্চা এবং সংগঠন শক্তিশালী করার কাজ কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে তৃণমূল পর্যায়ে, যেখানে কর্মীদের মাঝে আগের মতো উদ্দীপনা ও সক্রিয় কর্মকাণ্ড চোখে পড়ছে না।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, অনেকেই দলের হাইকমান্ডের দিকনির্দেশনার অভাবে কিছুটা নিষ্ক্রিয়। দলের অন্তঃপ্রাণ নেতারা রাজনীতির মাঠ থেকে দেশ পরিচালনার কাজে সময় দিতে গিয়ে রাজনৈতিক কার্যক্রম খুব একটা চোখে পড়ছে না। যার প্রভাব পড়েছে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে। আগের মতো জমছে না নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়।
মিছিল-মিটিংয়ে রাজপথ কাঁপাতেও দেখা যায় না নেতাদের। পাশাপাশি বিগত সময়ের মামলা জটিলতা নিয়ে এখনো উদ্বেগে কেউ কেউ। এছাড়া মূল দল ও অঙ্গসংগঠনের অনেক ইউনিটে কমিটি না থাকায় নেতৃত্বশূন্যতা দেখা দিয়েছে। সে কারণে দিকনির্দেশনার অভাবেও ঝিমিয়ে পড়েছে বিএনপির রাজনীতি।
এদিকে সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে দলকে আরো সক্রিয় করার চেষ্টা করছে বিএনপি। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখছেন। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সাংগঠনিক যোগাযোগ বাড়ানো, কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময়, মাঠ পর্যায়ে সক্রিয়তা বাড়ানো—এসব নিয়ে কাজ করছেন নেতারা। কেন্দ্রীয় ও গুলশান কার্যালয়ে দলের শীর্ষ নেতা এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি উপস্থিতি ও অফিস করা এ বার্তাই দিচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
গত শনিবার সন্ধ্যার পর রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যান প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের পর দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এটিই ছিল তার প্রথম আগমন। এ সময় সরকারের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও দলীয় নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি। তার এই আগমনে উজ্জীবিত হয়ে ওঠেন নেতাকর্মীরা। রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যানার, ফেস্টুন ও জাতীয় পতাকা হাতে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে কার্যালয়ের সামনে জড়ো হন তারা। ‘তারেক রহমান আসছে, রাজপথ কাঁপছে’Ñএমন নানা স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে নয়াপল্টন এলাকা।
এছাড়া গত সোমবার রাতে গুলশানে দলের চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে যান তারেক রহমান। এ সময় উচ্ছ্বসিত নেতাকর্মীরা তাকে স্লোগানে স্লোগানে স্বাগত জানান। তাদের ভালোবাসায় হাত নেড়ে জবাব দেন বিএনপি চেয়ারম্যান।
একদিনের ব্যবধানে দলের কেন্দ্রীয় ও গুলশান কার্যালয়ে তারেক রহমানের আগমন ঝিমিয়েপড়া দলকে উজ্জীবিত করার প্রচেষ্টা বলে মনে করেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। তিনি গণমাধ্যমকে বলেছেন, দলটি শুধু নির্বাচন বা সরকার গঠন করার জন্য একটু পিছিয়ে পড়েছে তা নয়, বরং দলের নেতৃত্বেও তো বড় ধরনের পরিবর্তন হয়েছে। আমরা খালেদা জিয়াকে হারিয়েছি, সেখানে আমরা আবার আমাদের বর্তমান চেয়ারম্যানকে পেয়েছি।
খুব দ্রুতই এবং সরকার গঠনের পরপরই তিনি দলের ঝিমিয়ে পড়ার বিষয়টিকে অনুধাবন করেছেন। এ কারণেই দলীয় কার্যালয়ে গিয়ে সরাসরি নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, নানা বিষয়ে পরামর্শ করেছেন। মূল দল ও অঙ্গসংগঠনগুলোর সাংগঠনিক পুনর্গঠন কীভাবে শুরু করা যায়— সে ব্যাপারেও তিনি পর্যায়ক্রমিক আরো আলোচনা করবেন। তিনি খুব দ্রুত এ ব্যাপারে সারা দেশে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও সাংগঠনিক স্তরগুলোতে পুনর্বিন্যাসের কার্যক্রম শুরু করবেন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে দলের কর্মকাণ্ড বেগবান করার প্রয়াস হিসেবে চেয়ারম্যানের এই উদ্যোগ বলে মনে করেন মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে কয়েক শতাব্দীর যে রাজনৈতিক ইতিহাস, এর মধ্যে অ্যান্টি অ্যাস্টাবলিশমেন্ট ক্যারেক্টার বেশি থাকে। এটিকে প্রোস্টাবলিশমেন্ট করার জন্য সংগঠনে একটি নতুন ধারা প্রবাহিত করতে চাচ্ছেন বর্তমান চেয়ারম্যান।
আলাল আরো বলেন, সরকার যদি কখনো কোনো কারণে সমালোচনার সম্মুখীন হয়, বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়, এটা কাটিয়ে ওঠার মাধ্যম তো সংগঠন। সেটার অংশ হিসেবেই সংগঠনকে শক্তিশালী করার চেষ্টা রয়েছে। সংগঠন যদি শক্তিশালী ও প্রাণবন্ত না থাকে, তাহলে তো অসুবিধা। এটাই হলো মূল ব্যাপার। এর সঙ্গে স্থানীয় নির্বাচনগুলোর প্রসঙ্গ তো আছেই।
এদিকে সরকারি দল বিএনপির রাজনীতি ঝিমিয়ে পড়ার পেছনে বিরোধী দলের রাজনৈতিক তৎপরতা না থাকারও প্রভাব দেখছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু। তিনি গণমাধ্যমকে বলেছেন, বাংলাদেশে সরকারের বাইরের, বিশেষত বিরোধী দল যখন রাস্তার আন্দোলনে সক্রিয় হয়, তখন সরকার থেকেও বেশি সরকারি দলের কার্যক্রম একটু চাঙা হয়। স্বাভাবিক কারণেই দেশে এখন বিরোধী দলের কোনো আন্দোলন রাস্তায় তেমন নেই।
সরকারি ও বিরোধী দল এখন সংসদকেন্দ্রিক ভূমিকা পালন করছে। অর্থাৎ, গত দেড় মাসের নানা চড়াই-উতরাই, নানা পরিস্থিতি আমরা দেখেছি। তবে বর্তমানে যতক্ষণ ভিন্ন প্রেক্ষাপট, ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থা না আসবে, আমার ধারণা ততক্ষণ নতুন কিছু দেখার সম্ভাবনা নেই।
আগামী দিনে দলকে আরো সুসংগঠিত ও সক্রিয় করা প্রসঙ্গে দুদু বলেন, দলগতভাবে একটি প্রক্রিয়া চলছে, যাতে আগামী দিনে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনগুলোকে সুসংগঠিত করা যায়। এর জন্য দলের ভেতরে আলোচনা হচ্ছে। শিগগির হয়তো সাংগঠনিকভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তারেক রহমানের দলীয় কার্যালয়ে গিয়ে কর্মীদের উজ্জীবিত করার বিষয়ে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক এই কেন্দ্রীয় সভাপতি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন, এখন দেশের সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দীর্ঘদিন তিনি দেশের বাইরে নির্বাসিত ছিলেন। দেশে আসার কারণে অনেক দিন পর রাজনৈতিক দলের প্রধান হিসেবে তিনি সেখানে যাচ্ছেন। নেতাকর্মীদের তিনি সময় দিচ্ছেন বলা যায়।
নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করার কথা আমি এ কারণে বলব না, কারণ নেতাকর্মীরা আন্দোলন-সংগ্রাম, নির্বাচন, সরকার গঠনে এমনিতেই উজ্জীবিত আছেন। বরং তিনি এখন নেতাকর্মীদের মুখোমুখি হচ্ছেন। এর মাধ্যমে তিনি সময় দিচ্ছেন, তাদের কথা শুনছেন, বোঝার চেষ্টা করছেন। স্বাভাবিক কারণে আমি বলব, প্রধানমন্ত্রী যেমন সরকারের প্রধান, তেমনি দলেরও প্রধান। সে কারণেই তার এই ছোটাছুটি। তাকে একদিকে যেমন সরকার দেখতে হচ্ছে, অন্যদিকে তার সংগঠন বা দলকেও দেখতে হচ্ছে।’