ডেস্ক রিপোর্ট : গ্যাস সংকটে ধুঁকছে দেশের শিল্পকারখানা। গ্যাস বরাদ্দের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ও সার বেশি গুরুত্ব পাওয়ায় শিল্পকারখানার উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তিতাস এলাকার শিল্পকারখানা বেশি সমস্যা মোকাবিলা করছে। জানা যায়, তিতাসের বড় একটি এলাকায় প্রায় এক হাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
শিল্পকারখানার এসব সমস্যার কথা উল্লেখ করে অসংখ্য অভিযোগ তিতাস গ্যাস কোম্পানি ও পেট্রোবাংলাকে দেওয়া হলেও শিল্প বাঁচানোর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। শিল্পোদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, অন্তত শিল্প বাঁচানোর জন্য শীতের চার মাস গ্যাসের বরাদ্দ বাড়ানো দরকার। এই অভিযোগের ব্যাপারে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) মো. শোয়েব বলেছেন, শিল্পে কম গ্যাস পাওয়ার অভিযোগ আছে। তাই বিদ্যুতে ১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস কমিয়ে শিল্পে বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। --- সূত্র, যুগান্তর
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবির কর্মকর্তারা বলেছেন, শীত মৌসুম অনেকটা শুরু হয়ে গেছে। তাই ২ দিন দেশে তেমন কোনো লোডশেডিং নেই। সরকারি কর্মকর্তারা জানান, দেশের ৬টি সার কারখানার মধ্যে ৫টি এখন চালু। যমুনা সার কারখানা বৃহস্পতিবার থেকে চালু করা হয়েছে। সেখানে ইউরিয়া সার উৎপাদনের মতো গ্যাসের চাপ রয়েছে। জ্বালানি বিভাগ শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে এই সার কারখানা বন্ধের সুপারিশ করেছে বলে জানা গেছে।
দেশে দৈনিক ২৬০ কোটি ঘনফুটের মতো গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে ৯০ কোটি এবং সার খাতে ২২ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট গ্যাস বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর বাইরে শিল্পে প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুট এবং বাকি গ্যাস অন্য গ্রাহকদের দেওয়া হচ্ছে। গরম মৌসুমে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৯০ কোটি ঘনফুট গ্যাস বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। তখন সার খাতে বরাদ্দ ছিল ১৫ কোটি ঘনফুটের মতো।
এখন ঘোড়াশাল ৬ কোটি ৮৭ লাখ, যমুনা ২ কোটি ৭০ লাখ (ইউরিয়া সার উৎপাদনে যমুনার দরকার হয় দৈনিক প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট), সিইউএফএল ৪ কোটি ৫০ লাখ, কাফকো ৪ কোটি ৯৮ লাখ এবং শাহজালাল সার কারখানা ব্যবহার করছে ৪ কোটি ৩ লাখ ঘনফুট গ্যাস। এখন বন্ধ আছে কেবল আশুগঞ্জ সার কারখানা। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে সরকার দেশের প্রায় সব সার কারখানা চালু রাখার নির্দেশ দিয়েছে। কারণ, আন্তর্জাতিক বাজারে সার সংকট এবং দামও বেশ চড়া।
গ্যাসের সমস্যা নিয়ে গত ছয় মাসে শিল্পমালিকরা তিতাসে অসংখ্য লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন। ১৫ অক্টোবর এই ধরনের অভিযোগ দিয়েছেন স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের গাজীপুর চন্দ্রা এলাকার ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং সার্ভিসেস নামের একটি পোশাক কারখানা। প্রতিষ্ঠানটিতে ১২ হাজার শ্রমিক কর্মরত উল্লেখ করা হয়েছে চিঠিতে।
তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, কারখানার বয়েলার এবং জেনারেটর চালানোর জন্য জুন থেকে ন্যূনতম গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। এখন দৈনিক ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার ডিজেল কিনে কারখানা কোনোভাবে চালনো হচ্ছে। এই বাড়তি ব্যয়ের কারণে ঠিকমতো শিপমেন্টও করা যাচ্ছে না। এসব কারণে ব্যাংকের দেনা বাড়ছে।
একই অভিযোগ করেছেন পাকিজা গ্রুপের পরিচালক সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, গ্রুপের ৬টি কারখানার বেশির ভাগই কোনো গ্যাস পায় না। এখন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ডিজেল এবং অন্য জ্বালানি দিয়ে কারখানা চালানো হচ্ছে, লোকসান হচ্ছে। কিন্তু এভাবে আর কত দিন। এভাবে বেশিদিন চললে কারখানা বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।
১৫ অক্টোবর গ্যাসের সমস্যার কথা বলে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে দেখা করেছেন আমানত শাহ লুঙ্গি ব্র্যান্ডের মূল প্রতিষ্ঠান হেলাল অ্যান্ড ব্রাদার্সের মালিক মোহাম্মদ হেলাল মিয়া। তিনি গ্যাসের অভাবে আর্থিক লোকসানের বিবরণী দিয়েছেন তিতাসের কাছে। তার ভাষায়, এভাবে বেশিদিন শিল্পপ্রতিষ্ঠান চলবে না।
পেট্রোবাংলা ও তিতাস জানিয়েছে, সাভার, আশুলিয়া, কোনাবাড়ী, মানিকনগর, শফিপুর, চন্দ্রা এবং নবীনগর এলাকায় সবচেয়ে বেশি গ্যাসের সংকট। এখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠান আছে এক হাজারের বেশি। এসব এলাকার শিল্প বাঁচাতে কারও কোনো নজর নেই। গ্যাসের সরবরাহ অস্বাভাবিকভাবে কম। এর মধ্যে ধনুয়া পয়েন্ট দিয়ে দৈনিক ২২ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হচ্ছে ২০ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট।
এ পয়েন্টে আউটলেটে (গ্রাহক প্রান্তে) গ্যাসের চাপ থাকার কথা ১০০ পিএসআই; কিন্তু থাকছে ৬০ পিএসআই। আশুলিয়া পয়েন্টে ১৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের কথা থাকলেও এখন পাচ্ছে ৭ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট। ৮০ পিএসআই চাপের পরিবর্তে আছে মাত্র ৩০ পিএসআই চাপ। জয়দেবপুরে ১৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেওয়ার কথা থাকলেও এখন পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১২ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট গ্যাস। ২৫০ পিএসআই চাপ থাকার কথা থাকলেও আছে মাত্র ১৫০ পিএসআই চাপ।
একইভাবে আমিনবাজার পয়েন্টে ৮ কোটি ঘনফুট গ্যাসের পরিবর্তে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৫ কোটি ঘনফুট। এখানে ২৫ পিএসআই চাপের পরিবর্তে আছে ১১ পিএসআই। এলেঙ্গা পয়েন্টে গ্যাস সরবরাহ থাকার কথা ৯ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট। কিন্তু দেওয়া হচ্ছে ৮ কোটি ঘনফুট। গ্রাহকপ্রান্তে ১৪০ পিএসআই চাপ থাকার কথা থাকলেও থাকছে ১২০ পিএসআই-এর কম। তিতাস জানিয়েছে, যমুনা সার কারখানা চালু হলে গাজীপুর, আশুলিয়া, সাভার, শফিপুর, চন্দ্রাসহ বিভিন্ন এলাকার গ্যাসের চাপ একেবারে কমে যায়।
একজন নীতিনির্ধারক জানিয়েছেন, তিতাস এলাকায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান আছে সাড়ে চার হাজার। এ শিল্পগুলো যাতে ন্যূনতম উৎপাদন করে বেঁচে থাকতে পারে, এর একটি পরিকল্পনা সরকারের থাকা দরকার। না হলে ১-২ বছরের মধ্যে শত শত শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে। হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে যাবে। কমবে রপ্তানি আয়। পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা জানান, নভেম্বরে অর্থ বিভাগ গ্যাসে ভর্তুকি কমিয়েছে।
তাই নভেম্বরে ১০টির পরিবর্তে ৯টি কার্গো এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। এ কারণে আগামী মাসে তুলনামূলকভাবে গ্যাস সরবরাহ দৈনিক ১০ কোটি ঘনফুটের মতো কমতে পারে। তাই বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দ কমলেও শিল্পে গ্যাসের বরাদ্দ বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে।
পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, অক্টোবরে শিল্প এবং ক্যাপটিভে ১০৭ কোটি ১০ লাখ, নভেম্বরে ১১২ কোটি ৬০ লাখ এবং ডিসেম্বরে ১১৪ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট গ্যাস পাবে। তিতাসসহ অন্যরা জানিয়েছে, এবার শিল্পে যে গ্যাস বরাদ্দ রাখা হয়েছে, এর চেয়ে কমপক্ষে ১২-১৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস কম পাবে শিল্প ও ক্যাপটিভের গ্রাহকরা। কারণ, সার এবং বিদ্যুতে বরাদ্দ ঠিক রেখে ১৫-২০ কোটি ঘটনফুটের সিস্টেম লসের বড় অংশ সমন্বয় করা হয় সাধারণত শিল্পে।