দেশের বিভিন্ন বাজারে সবজির দাম ঊর্ধ্বমুখী হলেও রাজধানীর খুচরা বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ২৫-৩০ টাকায়। এ দামে বিপাকে পড়েছেন হিমাগারে আলু রাখা চাষী ও মজুদদাররা। অনেকেই আপাতত আলু উত্তোলন বন্ধ রেখেছেন, দাম এমন থাকলে কেউ কেউ আর আলু তুলবেন না বলেও জানিয়েছেন।
রংপুর সিটি করপোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের বকশি রঘুবাজার এলাকার কৃষক ভুপাল চন্দ্র রায়। নগরীর দুটি হিমাগারে ৫০০ বস্তা আলু রেখেছেন তিনি। বর্তমানে জেলায় হিমাগার গেটে আলু বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি মাত্র ১১-১৪ টাকায়। এ দামে আলু তুললে কেজিতে সাড়ে ১৫ থেকে ১৬ টাকা লোকসান হবে বলে আপাতত বিক্রি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। তবে সামনে লোকসান কমার সম্ভাবনাও দেখছেন না। যে কারণে আলু উত্তোলনে আগ্রহ কম তার। এ পরিস্থিতি কেবল ভুপাল চন্দ্রেরই নয়, হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করা অধিকাংশ কৃষকেরই এমন অবস্থা।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে, চলতি বছর দেশে ১ কোটি ১৭ লাখ ৮৫ হাজার টন আলু উৎপাদন হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি ৪০২টি হিমাগার ও ৭০৩টি অ-হিমায়িত মডেল ঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে ৩৩ লাখ ৯০ হাজার ৫৭ টন, যা মোট উৎপাদনের ২৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ। এর মধ্যে ২৪ লাখ ৪৪ হাজার ১৪৮ টন খাবার ও ৯ লাখ ৪৫ হাজার ৯১০ টন বীজ আলু। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএসএ) হিসাবে, তাদের হিমাগারে এবার ৩৩ লাখ টনের বেশি আলু রাখা হয়েছে, যার মধ্যে এখনো ১৫ লাখ টনের বেশি মজুদ আছে। গত বছর কম দামের কারণে কৃষকরা দুই লাখ টন আলু হিমাগার থেকেই তোলেননি।
বিসিএসএর তথ্যমতে, উত্তরাঞ্চলে প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে কৃষকের গড় ব্যয় ১৬ টাকা, আর মুন্সিগঞ্জসহ অন্যান্য এলাকায় ১৯ টাকা। এর সঙ্গে কেজিপ্রতি ৬ টাকা হিমাগার ভাড়া এবং বস্তা, পরিবহন ও শ্রমিক খরচ যোগ করলে বাজারজাত পর্যন্ত ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২৫ টাকা। অথচ রাজধানীর খুচরা বাজারেই আলু বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ২৫ টাকায়।
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার রানীপুকুর ইউনিয়নের কৃষক আতাউর রহমান এবার ৪৯ বিঘা জমিতে আলু আবাদ করে ৬১ কেজির ৫ হাজার ২০০ বস্তা হিমাগারে রেখেছেন।
এর মধ্যে ৩ হাজার ১৪২ বস্তা বিক্রি করে পেয়েছেন ১৪ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। কিছুদিন আগে প্রায় ২৫০ বস্তা আলু কেজিপ্রতি ১৫ টাকায় বিক্রি করেন। তার হিসাবে, হিমাগার থেকে আলু তোলাসহ খরচ হয়েছে কেজিতে ৭ টাকা। এখন দাম ১১-১৪ টাকায় নেমে আসায় অবশিষ্ট আলু থেকে কত টাকা উঠবে, তা নিয়ে সংশয়ে তিনি।
আতাউর রহমান বলেন, ‘লাভ দূরের কথা, উৎপাদন খরচই কতটা তুলতে পারব সেটিই ভাবছি। গত বছর ৬৯ বিঘা জমিতে আলু আবাদে প্রায় ৫৭ লাখ টাকা খরচ হয়েছিল। সেই টাকাই তুলতে পারিনি। এখন পথে বসার অবস্থা।’
বদরগঞ্জের শাহজালাল ও গঙ্গাচড়ার এমএনটি হিমাগারের ব্যবস্থাপক সুভাস মুখার্জি বলেন, ‘গত দুইদিন ধরে হিমাগার গেটে প্রকারভেদে আলু বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১১-১৪ টাকায়। হিমাগার দুটির ধারণক্ষমতা যথাক্রমে ১৫ হাজার ও সাড়ে ৯ হাজার টন; বর্তমানে সেখানে যথাক্রমে ৪০ ও ৪৮ শতাংশ আলু মজুদ রয়েছে।’
রংপুরের পীরগাছার নব্দীগঞ্জের অপু মুন্সি হিমাগারের ব্যবস্থাপক মো. রবিউল বলেন, ‘গত বছর একাধিকবার তাগাদা দিয়েও অনেক কৃষক নির্ধারিত সময়ে আলু তোলেননি। ফলে হিমাগার কর্তৃপক্ষ ১ লাখ ৬৬ হাজার বস্তা আলু কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। এতে ২৫-৩০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।’
রংপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে, এবার জেলার ৪২টি হিমাগারে ৪ লাখ ৮৮ হাজার ৬৩৮ টন খাবার ও বীজ আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে। ১ অক্টোবর পর্যন্ত উত্তোলন হয়েছে ২ লাখ ৪ হাজার ২১ টন। জেলা কৃষি অফিস জানায়, এখন পর্যন্ত প্রায় ২০০ হেক্টর জমিতে আগাম আলুর আবাদ হয়েছে। গত বছর এ আবাদ ছিল তিন হাজার হেক্টর; এবারো একই পরিমাণ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
à