শিরোনাম
◈ ইইউতে বড় ধাক্কা, নতুন বাজারে ঘুরে দাঁড়ানোর চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের ◈ কলকাতায় সাবেক এমপি বাহার ও তার মেয়ে সূচনার অবস্থান নিয়ে ভিডিও প্রকাশ! ◈ প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার বাইরে রাত্রিযাপন না করার পরামর্শ কর্নেল অলির (ভিডিও) ◈ সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের আমানতকারীরা সুদসহ টাকা ফেরত পাবেন: অর্থমন্ত্রী ◈ শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে দায়িত্ব নিল চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নতুন কমিটি, আরও গতিশীল হওয়ার প্রত্যাশা ◈ সশস্ত্র বাহিনীর বঞ্চিতদের ফের আবেদন, পর্যালোচনায় ৭ সদস্যের কমিটি ◈ ট্রাম্পের হুমকির পরই ইরানে মার্কিন হামলা, নিহত ৮ ◈ শাপলা চত্বর মামলা: তদন্ত শেষ, আসামির তালিকায় যারা ◈ ‘আজ রাতেই ইরানে কঠোর হামলা’, নতুন হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের ◈ উগ্রবাদী সংগঠনের প্রশিক্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার এনসিপি নেতা আতাউল্লাহ স্থায়ী বহিষ্কার

প্রকাশিত : ০৯ জুলাই, ২০২৬, ০৩:১০ রাত
আপডেট : ০৯ জুলাই, ২০২৬, ০৪:০০ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ইইউতে বড় ধাক্কা, নতুন বাজারে ঘুরে দাঁড়ানোর চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের

বিশ্ববাজারের দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা, ইউরোপের অর্থনৈতিক ধীরগতি, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং ভোক্তাদের ব্যয় সংকোচনের প্রভাব এবার স্পষ্টভাবে পড়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) রফতানিতে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের পোশাক রফতানি আগের অর্থবছরের তুলনায় ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কমে ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে নেমে এসেছে। বিশেষ করে দেশের সবচেয়ে বড় রফতানি গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) রফতানি কমে যাওয়ায় সামগ্রিক রফতানি আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

তবে এই চাপের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, মধ্যপ্রাচ্য এবং চীনের মতো কয়েকটি বাজারে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের রফতানি খাতের জন্য নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রচলিত বাজারের ওপর অতি নির্ভরতা কমিয়ে নতুন বাজারে অবস্থান শক্তিশালী করা এবং উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে গুরুত্ব না দিলে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণে এসব চিত্র উঠে এসেছে।

ইইউতে রফতানিতে বড় ধাক্কা: বাংলাদেশের পোশাক রফতানির সবচেয়ে বড় গন্তব্য এখনও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই বাজারে রফতানি ৩ দশমিক ৩১ শতাংশ কমে ১৯ দশমিক ০৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে নেমে এসেছে। ফলে মোট পোশাক রফতানিতে ইইউর অংশীদারিও কমে দাঁড়িয়েছে ৪৯ দশমিক ২৫ শতাংশে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৫০ দশমিক ১০ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল, মূল্যস্ফীতি তুলনামূলক বেশি এবং ভোক্তারা প্রয়োজন ছাড়া পোশাক কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছেন। ফলে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোও নতুন ক্রয়াদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর ইউরোপীয় বাজারে শুল্ক সুবিধা অব্যাহত থাকবে কিনা— এ নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা। যদিও এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর বাড়ানো হয়েছে, তারপরও ভবিষ্যৎ বাণিজ্য কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি।

জার্মানিতে সবচেয়ে বড় পতন: ইইউ’র দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাজার জার্মানি। কিন্তু আলোচ্য অর্থবছরে দেশটিতে রফতানি ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ কমে ৪ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছর ছিল প্রায় ৪ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার। পণ্যভিত্তিক হিসাবে জার্মানিতে নিট পোশাক রফতানি কমেছে ১২ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং ওভেন পোশাক রফতানি কমেছে ৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ।

শুধু জার্মানিই নয়, একই সময়ে ফ্রান্সে রফতানি ৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ এবং ইতালিতে ৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ কমেছে। ফলে ইউরোপের প্রায় সব বড় বাজারেই বাংলাদেশের রফতানি নিম্নমুখী প্রবণতায় রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপে উচ্চ সুদের হার, ভোক্তা আস্থার সংকট এবং খুচরা বিক্রেতাদের অতিরিক্ত মজুত থাকার কারণে নতুন ক্রয়াদেশ প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডায় ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি: ইউরোপে রফতানি কমলেও বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির খবর এসেছে উত্তর আমেরিকা ও যুক্তরাজ্য থেকে। একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পোশাক রফতানি বাজারের অবস্থান ধরে রেখেছে। আলোচ্য অর্থবছরে দেশটিতে রফতানি ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেড়ে ৭ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। মোট রফতানিতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারিও বেড়ে ২০ দশমিক ০১ শতাংশ হয়েছে।

যুক্তরাজ্যে রফতানি বেড়ে ৪ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। দেশটিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে শূন্য দশমিক ৯১ শতাংশ। এ ছাড়া কানাডায় রফতানি ৩ দশমিক ২০ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডা এখন বাংলাদেশের মোট পোশাক রফতানির ৩৫ শতাংশেরও বেশি অংশ ধারণ করছে—যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে রফতানি কমে যাওয়ার ক্ষতি আংশিকভাবে পুষিয়ে দিতে সহায়তা করেছে।

অপ্রচলিত বাজারে মিশ্র চিত্র: অপ্রচলিত বাজারে সামগ্রিকভাবে প্রত্যাশিত ফল আসেনি। এসব বাজারে রফতানি ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ কমে ৬ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। মোট রফতানিতে এ বাজারগুলোর অংশও কমে ১৫ দশমিক ৯৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছর ছিল ১৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ। তবে সব বাজারে পরিস্থিতি একরকম নয়।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে রফতানি বেড়েছে ১৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ। বিশেষ করে ওভেন পোশাক রফতানিতে প্রায় ২৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে রফতানি বেড়েছে ১৬ দশমিক ২৩ শতাংশ। চীনে রফতানি বেড়েছে ১৭ দশমিক ১২ শতাংশ, যা বেড়ে ২৬৩ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, চীনে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, শ্রম ব্যয় বাড়া এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারে আমদানি নির্ভরতা বাড়ায় বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্যের দ্রুত সম্প্রসারণশীল খুচরা বাজারও বাংলাদেশের রফতানিকারকদের জন্য সম্ভাবনাময় হয়ে উঠছে।

নিট পোশাকে বেশি চাপ: পণ্যভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিট পোশাক রফতানি ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ কমেছে। অপরদিকে ওভেন পোশাকের রফতানি তুলনামূলক কম কমেছে—মাত্র শূন্য দশমিক ৬১ শতাংশ। এর অর্থ হলো, চলতি অর্থবছরে ওভেন পোশাক খাত তুলনামূলক ভালো স্থিতিশীলতা দেখিয়েছে, যেখানে নিট পোশাক বেশি চাপের মুখে পড়েছে।

এলডিসি উত্তরণ ও এফটিএ নিয়ে উদ্বেগ: বিজিএমইএ’র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং এলডিসি-পরবর্তী বাণিজ্য সুবিধা নিয়ে উদ্যোক্তাদের মধ্যে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে। একই সময়ে ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বাণিজ্য সুবিধা সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠছে।’’

তবে তিনি মনে করেন, এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর বাড়ানোয় সরকার ও ব্যবসায়ীদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে কার্যকর বাণিজ্য কূটনীতি, নতুন বাজার সম্প্রসারণ এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের রফতানি খাত আবারও শক্তিশালী অবস্থানে ফিরতে পারে।

প্রতিযোগিতা-সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই: বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘‘শুধু মৌলিক পোশাক উৎপাদনের ওপর নির্ভর করলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হবে। উচ্চমূল্য সংযোজনকারী, প্রযুক্তিনির্ভর এবং বৈচিত্র্যময় পোশাক উৎপাদনে জোর দিতে হবে।’’

তার মতে, উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানো, আধুনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। একইসঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো এবং নতুন বাজারে দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি নিশ্চিত করাও জরুরি।

সামনে যে চ্যালেঞ্জ: বাংলাদেশের পোশাক শিল্প এখনও দেশের মোট রফতানি আয়ের প্রধান উৎস। তাই এই খাতে সামান্য নেতিবাচক প্রবণতাও সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপের বাজারে দুর্বলতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে নতুন বাজারে আরও আগ্রাসী কৌশল গ্রহণ, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এগিয়ে নেওয়া, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প থাকবে না। তাদের মতে, বিশ্ববাজারের পরিবর্তিত বাস্তবতায় শুধু কম খরচে উৎপাদন নয়, বরং উদ্ভাবন, পণ্যের বৈচিত্র্য, টেকসই উৎপাদন এবং দ্রুত সরবরাহ সক্ষমতার ওপরই ভবিষ্যতে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতা নির্ভর করবে। বর্তমান সংকট তাই একদিকে যেমন সতর্কবার্তা, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও বাজার বহুমুখীকরণের মাধ্যমে নতুন প্রবৃদ্ধির সুযোগও তৈরি করে দিচ্ছে। উৎস: বাংলাট্রিবিউন।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়