শিরোনাম
◈ ‘ভারত যা চাইবে তাই পাবে’: মোদিকে নিয়ে ট্রাম্পের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা ◈ কারখানা প্রস্তুত, নেই গ্যাস: ঋণের চাপে দিশেহারা শিল্প উদ্যোক্তারা, থমকে গেছে হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ◈ পুঁজিবাজারে নতুন বড় কোম্পানি: বিআরবি ক্যাবলের আইপিওর প্রস্তুতি শুরু ◈ বাংলাদেশে ধর্ষণ ও হত্যার আলোচিত ছয়টি মামলা কী অবস্থায় আছে?  ◈ কোরবানির পরবর্তী সাতদিন ঢাকার বাইরে থেকে চামড়া ঢাকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকবে ◈ ট্রাম্পের 'পাগলামি' ও বিশ্বরাজনীতিতে আমেরিকার একাকীত্ব  ◈ কুয়েতে ২৪০ টন খাদ্য সহায়তা দিচ্ছে বাংলাদেশ ◈ চিনিযুক্ত পণ্যে কর কমানোর ভাবনা, স্বয়ংক্রিয় ট্যাক্স রিফান্ড চালুর পরিকল্পনা এনবিআরের ◈ ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে রডবোঝাই ট্রাক খাদে উল্টে নিহত ১৫ ◈ ঈদে জাতীয় ঈদগাহে থাকছেন তারেক রহমান, নিজ নিজ এলাকায় নামাজ পড়বেন মন্ত্রীরা

প্রকাশিত : ২৪ মে, ২০২৬, ০২:১৯ রাত
আপডেট : ২৫ মে, ২০২৬, ০১:০০ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

মূল্যচাপ ও কম ক্রয়াদেশে ধাক্কা খাচ্ছে দেশের পোশাক শিল্প

বিশ্বব্যাপী ভোক্তা চাহিদার ধীরগতি, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং খুচরা বিক্রেতাদের সতর্ক ক্রয়নীতির প্রভাবে ২০২৬ সালের শুরুতেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পোশাক আমদানিতে বড় ধরনের সংকোচন দেখা দিয়েছে। ইইউর পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাট’র সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সময়ে ইইউর মোট পোশাক আমদানি কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ইউরোতে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ দশমিক ২৭ শতাংশ কম।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউরোপের বাজারে এই নেতিবাচক প্রবণতা শুধু একটি দেশের জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক পোশাক রফতানিকারকদের জন্যই উদ্বেগের বার্তা। তবে, বড় রফতানিকারক দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছে।

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “২০২৬ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইইউতে পোশাক রফতানি কমে দুই দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ইউরোতে নেমে এসেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ দশমিক ২৬ শতাংশ কম। রফতানির পরিমাণ ও ইউনিট মূল্য— উভয় ক্ষেত্রেই পতন হয়েছে।”

তিনি বলেন, “শুধু বাংলাদেশ নয়, চীন, তুরস্ক, ভিয়েতনাম, ভারত, পাকিস্তান ও কম্বোডিয়াসহ অন্যান্য রফতানিকারক দেশও ইইউ বাজারে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির মুখে রয়েছে।”

ইইউ বাজারে চাহিদার সঙ্গে দামও কমেছে

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইইউর পোশাক আমদানিতে মূল্যমান কমার পেছনে দুটি বড় কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, আমদানির পরিমাণ বা ভলিউম কমেছে ছয় দশমিক ২৩ শতাংশ। দ্বিতীয়ত, গড় ইউনিট মূল্য (ইউরো/কেজি) কমেছে পাঁচ দশমিক ৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ, ইউরোপের ক্রেতারা শুধু কম পোশাক কিনছেন না, একইসঙ্গে কম দামে পণ্য কিনছেন।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইউরোপের ভোক্তারা এখনও উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারেননি। ফলে পোশাকের মতো অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমে গেছে। অন্যদিকে, বড় বড় ব্র্যান্ড ও খুচরা বিক্রেতারা অতিরিক্ত মজুত এড়াতে আগের তুলনায় আরও সতর্কভাবে ক্রয়াদেশ দিচ্ছে।

বাংলাদেশের রফতানিতে বড় পতন

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত। চলতি বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সময়ে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি কমে দাঁড়িয়েছে দুই দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ইউরোতে। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল তিন দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ইউরো।
এতে বাংলাদেশের রফতানি আয় কমেছে ১৯ দশমিক ২৬ শতাংশ, যা প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই সময়ে রফতানির পরিমাণ কমেছে ১১ দশমিক ১৪ শতাংশ। ইউনিট মূল্য কমেছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। আর ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় সামগ্রিক রফতানি আয়েও বড় পতন এসেছে।

শুধু দুই মাসের সামগ্রিক হিসাবেই নয়, মাসভিত্তিক চিত্রেও দুর্বলতা স্পষ্ট। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির সঙ্গে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির তুলনায় বাংলাদেশের রফতানি মূল্য কমেছে ১২ দশমিক ৩৯ শতাংশ। একই সময়ে রফতানির পরিমাণ কমেছে তিন দশমিক ৩০ শতাংশ এবং ইউনিট মূল্য কমেছে ৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইউরোপের বাজারে মূল্যচাপ এখন বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা আগের তুলনায় আরও কম দামে পণ্য কিনতে চাইছেন। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও রফতানিকারকদের কম দামে পণ্য সরবরাহ করতে হচ্ছে।

প্রতিযোগী দেশগুলোর অবস্থাও দুর্বল

ইইউ বাজারে নেতিবাচক প্রবণতা শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নয়, অন্যান্য প্রধান রফতানিকারক দেশগুলোর মধ্যেও দেখা গেছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় পোশাক রফতানিকারক দেশ চীনের ইইউতে রফতানি দাঁড়িয়েছে চার দশমিক ২০ বিলিয়ন ইউরোতে। দেশটির রফতানি আয়ে চার দশমিক শূন্য এক শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হলেও তারা ভলিউম এক দশমিক ৩৪ শতাংশ বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। তবে, চীনকে ইউনিট মূল্য পাঁচ দশমিক ২৭ শতাংশ কমাতে হয়েছে।

অন্যদিকে, তুরস্কের রফতানি সবচেয়ে বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে। দেশটির ইইউতে পোশাক রফতানি কমেছে ২২ দশমিক ৯১ শতাংশ। 

ভিয়েতনাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থানে থাকলেও তারাও নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি এড়াতে পারেনি। দেশটির রফতানি দুই দশমিক শূন্য ছয় শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৭১১ দশমিক ৭৩ মিলিয়ন ইউরোতে। ইতিবাচক দিক হলো, ভিয়েতনাম ইউনিট মূল্য ছয় দশমিক ৫৬ শতাংশ বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। এটি ইঙ্গিত করে যে দেশটি তুলনামূলক উচ্চমূল্যের পণ্যের দিকে ঝুঁকছে।

ভারত, পাকিস্তান ও কম্বোডিয়াও ইইউ বাজারে চাপের মুখে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে।

কেন সবচেয়ে বেশি চাপে বাংলাদেশ

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের রফতানি কাঠামো এখনও তুলনামূলকভাবে নিম্ন ও মধ্যমূল্যের পোশাকনির্ভর। ফলে ইউরোপের বাজারে যখন মূল্য কমানোর চাপ বাড়ে, তখন বাংলাদেশের রফতানিকারকদের মার্জিন দ্রুত কমে যায়। এছাড়া জ্বালানি ব্যয়, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ, ডলার সংকট, শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধি এবং উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতিও বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় প্রভাব ফেলছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বর্তমানে শুধু রফতানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখাই নয়, বরং টিকে থাকাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো ক্রমেই বেশি চাপ অনুভব করছে।

সামনে কী হতে পারে

রফতানিকারকরা বলছেন, ইউরোপের বাজার পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে বাংলাদেশের পোশাক খাতে আরও চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ইউনিট মূল্য কমতে থাকলে রফতানি আয় ধরে রাখা কঠিন হবে।

তাদের মতে, এখন বাংলাদেশের জন্য উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদন, পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাকে বিনিয়োগ এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণের দিকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বৈশ্বিক বাজারে অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হলে ২০২৬ সাল বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য একটি কঠিন বছর হয়ে উঠতে পারে। উৎস: বাংলাট্রিবিউন।

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়