শিরোনাম
◈ আগামী ১০ মার্চ ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী ◈ বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনা পুনঃতদন্ত করতে নতুন করে কমিশন গঠন করবে সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ◈ সরকার ৪ ধরনের শিক্ষার্থীকে ভাতা দেবে: কারা পাবেন, কীভাবে আবেদন করবেন? ◈ সকাল ৯টার মধ্যে অফিসে প্রবেশের নির্দেশ, বিনা অনুমতিতে বাইরে নয়: আইন মন্ত্রণালয় ◈ ১২ মার্চ সকাল ১১ টায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন ◈ বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫ পাচ্ছেন যাঁরা ◈ ঢাকা দক্ষিণ থেকে সিটি নির্বাচন করব : ইশরাক হোসেন ◈ সংস্কার, বাণিজ্য ও অভিবাসন: ইইউর সঙ্গে নতুন সম্পর্কের সুযোগ বাংলাদেশের ◈ বাংলাদেশ তার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে, অন্য দেশের হস্তক্ষেপ চাই না: পররাষ্ট্রমন্ত্রী ◈ পুলিশের কাজে কেউ হস্তক্ষেপ করতে পারবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রকাশিত : ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ০৫:১৬ বিকাল
আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ০৯:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

৪৫ হাজার কোটি টাকার বোঝা নিয়ে বিদ্যুৎ খাত পরিচালনায় নতুন সরকার

দেশি–বিদেশি কোম্পানির কাছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা বকেয়া। এই বিশাল দেনার বোঝা নিয়েই বিদ্যুৎ খাতে পথচলা শুরু করছে বাংলাদেশের নতুন সরকার। বিবিসি বাংলা-র একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, রমজানের পরপরই সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুমে বাড়তি চাহিদা সামাল দেওয়া সরকারে জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তের চাহিদা প্রায় ১৩ হাজার মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ বিভাগের ধারণা, এ বছর সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও প্রাথমিক জ্বালানির সংস্থান, আর্থিক সংকট ও বকেয়া পরিশোধ — এই তিনের সমন্বয় এখন সরকারের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা।

নবনিযুক্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ পরিস্থিতিকে সরাসরি ‘ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট’ হিসেবে দেখছেন। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘পরিকল্পনা আছে, তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে বিদ্যুতকে টোট্যালি ফিনান্সিয়ালি ব্যাংকরাপ্ট করে দিছে আরকি। অনেক বকেয়া, অনেক দেনা পাওনা। জ্বালানি নাই, জ্বালানি ইমপোর্ট করতে হবে। মোট কথা হলো ভেরি কমপ্লিকেটেড। কাজ করে এগুলি সমাধান করতে হবে।’

সরকারি হিসাব বলছে, জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আমদানি সক্ষমতা যুক্ত হয়ে মোট স্থাপিত উৎপাদন ক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। বিদ্যুতের গ্রাহক প্রায় ৪ কোটি ৯৪ লাখ। দেশে এক দিনে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ২৩ জুলাই ২০২৫ সালে — ১৬ হাজার ৭৯৪ মেগাওয়াট।

তবু বাস্তবতা ভিন্ন। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতে দেশি–বিদেশি কোম্পানির কাছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। এর মধ্যে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত বেসরকারি কোম্পানিগুলোর পাওনা প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। উদ্যোক্তাদের দাবি, গত সাত–আট মাস ধরে তাঁরা বিল পাননি।

এত বকেয়া কীভাবে জমেছে — এই প্রশ্নে পিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করীম বলেন, ‘এটা ফ্রম দা বিগিনিং কিউমিলিটিভ হারে হতে হতে এ অবস্থায় এসেছে। আমরা যেটা পাচ্ছি সরকারের থেকে – সাবসিডি - সেটা মাইনাস হচ্ছে, এভাবে হতে হতে এ পর্যায়ে আছে। এর মধ্যে আরো কিছু মাইনাস হবে, আমরা সরকার থেকে আরও কিছু টাকা পাবো সাবসিডি।’

বেসরকারি উদ্যোক্তারা মনে করছেন, দীর্ঘদিনের এই বকেয়া নতুন সরকারের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাঁদের ভাষায়, দ্রুত পরিশোধ না হলে উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হয়ে যাবে। কারণ তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানির বড় অংশই উদ্যোক্তাদের নিজস্ব আমদানির ওপর নির্ভরশীল।

বেসরকারি উৎপাদনকারীদের সংগঠন বিপপা সতর্ক করেছে, বিলের বকেয়া চার–পাঁচ মাসে না নামালে তেল আমদানি কঠিন হয়ে পড়বে। এলসি খোলার পর দেশে তেল আসতে ৪০–৪৫ দিন সময় লাগে। ইতিমধ্যে তেলের নিট মজুদ কমেছে বলেও জানিয়েছে সংগঠনটি।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে পিডিবির বকেয়া এক পর্যায়ে তিন মাসে নেমে এসেছিল। তবে ২০২৫ সালের জুলাই মাসের পর থেকে আর কোনো বিল পরিশোধ করেনি বলেও জানায় বেসরকারি উদ্যোক্তারা। তারা বলছেন, এ পরিস্থিতি নতুন সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকার ইচ্ছাকৃত এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে কি না - সে সন্দেহের কথাও জানিয়েছে সংগঠনটি।

তবে সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বলেছেন, টাকার বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের ছাড়ের উপর নির্ভর করে, এখানে ইচ্ছাকৃত বকেয়া রাখার কোনো ইস্যু নেই। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেছেন, সরকারের শেষ পর্যায়ে ২ হাজার কোটি টাকা ছাড় করার একটা ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সরকারের সামনে আরেকটি কঠিন বাস্তবতার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন — ডলারের মজুদ। জ্বালানি আমদানি বাড়ানো মানেই বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, ‘এখন থেকে এক মাস পরে মূল চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। আমরা যদি মনে করি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ব্যবহার করব, এলএনজি ইমপোর্ট করব এবং কয়লা আমদানি করব… কিন্তু প্রশ্ন হলো এটার জন্য যতটুক খরচা হবে, যতটা ডলার লাগবে সেটা কি দেয়া হবে কি না।’

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বেশি। মোট সক্ষমতার ৮৮ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস, কয়লা ও তেলের ব্যবহার হয়। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় এলএনজি আমদানি করতে হয়। তেল ও কয়লার ক্ষেত্রেও আমদানিনির্ভরতা প্রায় পুরোপুরি।

ড. ইজাজ হোসেনের হিসাব অনুযায়ী, ‘আমি একটা হিসেব করেছি… ১৩ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার লাগে যদি আমরা সব এনার্জি আমদানি করি। আমাদের তো আরও বেশি লাগবে। ক্যাপাসিটি পেমেন্টসহ সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ জ্বালানি খাতে ২৫ বিলিয়ন ডলারের মত লাগে। কিন্তু আমাদের এত টাকা নাই।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন সরকারের সামনে মূল প্রশ্ন একটাই — কোন পথ ধরে এগোবে সরকার? জ্বালানি আমদানি বাড়িয়ে চাহিদা মেটানো, নাকি ডলার সাশ্রয়ের দিকে বেশি জোর দেওয়া?

মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ আপাতত স্বল্পমেয়াদি সংকট সামাল দেওয়াকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘এখন প্রায়োরিটি রোজার মধ্যে বিদ্যুৎ চালানো, সেচের সময় বিদ্যুৎ চালানো, মানুষের কষ্ট যাতে কম হয় সেটার জন্য চেষ্টা করব আরকি। কয়লা আনতে হবে। এলপিজি, এলএনজি আনতে হবে। এদিকে পাহাড় পরিমাণে বাকি করে গেছে, বকেয়া করে গেছে… এই সব মিলিয়ে ফিন্যান্সিয়াল একটা চ্যালেঞ্জ আছে বড়।’

সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ খাত এখন এক জটিল সমীকরণের সামনে — চাহিদা, জ্বালানি, ডলার ও বকেয়া। গরম যত এগিয়ে আসছে, এই সমীকরণ ততই কঠিন হয়ে উঠছে।

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়