শিরোনাম
◈ মার্কিন নাগরিকদের দ্রুত ইরান ত্যাগের নির্দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ◈ নিউইয়র্ক সিটিতে বিক্ষোভ: পাশে দাঁড়ালেন মামদানি ◈ বার্সার কাছে হারের পর জাবি আলোনসোকে বরখাস্ত করল রিয়াল মাদ্রিদ ◈ অস্ট্রেলিয়ায় শিশুদের সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধ: ৫ লাখের বেশি অ্যাকাউন্ট ব্লক করল মেটা ◈ বাংলাদেশি শনাক্তে এআই টুল তৈরি করছে ভারত ◈ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ ঢাকা–করাচি ফ্লাইটের সব টিকিট ◈ ভিসা নিয়ে বাংলাদেশকে বড় দুঃসংবাদ দিল অস্ট্রেলিয়া ◈ নির্বাচনী মাঠ ছাড়ছেন বিদ্রোহীরা, স্বস্তিতে বিএনপি-জোট ◈ মহাকাশ অভিযানে বড় ধাক্কা, যান্ত্রিক ত্রুটিতে ১৬ স্যাটেলাইটের নিয়ন্ত্রণ হারাল ভারত ◈ ‘তিন ভাই মিলে খুন করলেন কেন?’—মুসাব্বির হত্যা মামলায় বিস্মিত আদালত

প্রকাশিত : ১৩ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৮:৪৪ সকাল
আপডেট : ১৩ জানুয়ারী, ২০২৬, ১০:০০ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

গভীর সংকটে দেশের অর্থনীতি

রাজনীতির উত্তাপ, নির্বাচন ঘিরে অস্থিরতা আর নানা আলোচিত ঘটনার আড়ালে নীরবে গভীর সংকটে পড়ছে দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি রপ্তানি খাত। টানা পাঁচ মাস ধরে এই খাতের আয় কমছে, কমছে কার্যাদেশও। উদ্যোক্তাদের ভাষায়, অন্যান্য বছরের তুলনায় বর্তমানে রপ্তানি আদেশ ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। পরিস্থিতি এমনই যে, আগামী জুন মাসের আগেও ঘুরে দাঁড়ানোর স্পষ্ট কোনো লক্ষণ দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা।

বৈশ্বিক চাহিদা সংকোচন, দেশের ভেতরের রাজনৈতিক ও আইন-শৃঙ্খলা অস্থিরতা এবং পর্যাপ্ত নীতি সহায়তার অভাব—সব মিলিয়ে রপ্তানি আয়ে এই ধারাবাহিক নেতিবাচক প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। তাঁদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের প্রাক্কালে দেশের রপ্তানি খাত আরও বড় চাপে পড়তে পারে।

দেশের অর্থনীতিতে রপ্তানির গুরুত্ব অপরিসীম। রেমিট্যান্সের পাশাপাশি রপ্তানি আয়ই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রধান উৎস। অথচ টানা পাঁচ মাস ধরে রপ্তানি আয় কমতে থাকায় সামনে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি সক্ষমতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর মাসে দেশের রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩৯৬ কোটি ডলারে। আগস্ট থেকে শুরু হওয়া এই নিম্নমুখী ধারা এখনো কাটেনি। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে, অর্থাৎ জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট রপ্তানি হয়েছে দুই হাজার ৩৯৯ কোটি ৬৮ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ১৯ শতাংশ বা প্রায় ৫৪ কোটি ডলার কম।

সংখ্যার বিচারে এই ঘাটতি খুব বড় মনে না হলেও বাস্তব চিত্র আরও উদ্বেগজনক। কারণ এই ছয় মাসের মধ্যে একবারের জন্যও রপ্তানি আয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। অক্টোবরে রপ্তানি কমেছে ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ, নভেম্বরে ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং ডিসেম্বরে এসে পতনের হার আরও বেড়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এ ধরনের ধারাবাহিক পতন ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য স্পষ্ট সতর্কসংকেত।

রপ্তানি আয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। এই রিজার্ভের ওপর নির্ভর করে আমদানি সক্ষমতা, শিল্প উৎপাদন এবং বাজারে পণ্যের সরবরাহ। বাংলাদেশ খাদ্যশস্য, জ্বালানি ও শিল্পের কাঁচামালের বড় অংশ আমদানিনির্ভর। ফলে রিজার্ভ দুর্বল হলে এলসি খোলায় জটিলতা তৈরি হয়, ডলারের দাম বেড়ে যায় এবং শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয়। ২০২৩ সালের শেষ ভাগ থেকে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে এমন পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা ইতোমধ্যেই হয়েছে দেশের ব্যবসায়ীদের।
রিজার্ভ শক্ত রাখার দুটি প্রধান উৎস রেমিট্যান্স ও রপ্তানি। এর যেকোনো একটিতে বড় ধাক্কা লাগলে পুরো অর্থনীতিতেই তার প্রভাব পড়ে। বর্তমানে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ বাড়ছে, ফলে পর্যাপ্ত ডলার প্রবাহ নিশ্চিত করা সরকারের জন্য ক্রমেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

রপ্তানি আয় কমে গেলে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগে শিল্প খাতে। এর প্রভাব পড়ে পরিবহন, বন্দর, ব্যাংক-বীমা এবং সেবা খাতেও। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে সরাসরি কর্মসংস্থান রয়েছে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের। এই খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত আরও কয়েক কোটি মানুষের জীবিকা। ফলে রপ্তানি খাতে দীর্ঘস্থায়ী মন্দা মানেই কর্মসংস্থানে বড় ধরনের ঝুঁকি।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, আগামী জুন মাস পর্যন্ত রপ্তানি আয় ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা খুবই কম। তাঁর ভাষায়, অন্যান্য বছরের একই সময়ের তুলনায় এ বছর কার্যাদেশ ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম এসেছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং পর্যাপ্ত নীতি সহায়তার অভাব রপ্তানি খাতকে মারাত্মক চাপে ফেলেছে বলে তিনি মনে করেন। প্রতিযোগী দেশগুলো যেখানে নগদ সহায়তা, করছাড় ও সহজ ঋণ সুবিধা দিয়ে রপ্তানি ধরে রাখছে, সেখানে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ও প্লামি ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল হক বলেন, অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক উভয় কারণেই রপ্তানি কমছে এবং এই ধারা আরও চার থেকে পাঁচ মাস অব্যাহত থাকতে পারে। বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাসের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর কারখানায় বর্তমানে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কম কার্যাদেশ পাওয়া যাচ্ছে।

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ইউরোপে চলমান অর্থনৈতিক মন্দা, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাকের চাহিদা কমে যাওয়া এবং ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস—সব মিলিয়ে পাঁচ মাস ধরে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ধারায় রয়েছে। একই সঙ্গে চীন, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার দ্রুত, কম খরচে এবং ব্যবসাবান্ধব রপ্তানি ব্যবস্থার কারণে বৈশ্বিক ক্রেতাদের ঝোঁক সেসব দেশের দিকে বাড়ছে, যা বাংলাদেশের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

চলতি বছরই বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পথে। গ্র্যাজুয়েশনের পর শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ নানা বাণিজ্যিক সুবিধা ধীরে ধীরে উঠে যাবে। যদিও উন্নত দেশগুলো প্রস্তুতির জন্য তিন বছরের সময় দেওয়ার কথা বলেছে, তবু সেই সময়ের জন্য যথাযথ প্রস্তুতি না থাকলে রপ্তানি খাতে বড় আঘাত আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

রাজনৈতিক ও নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেই বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত স্থবির হয়ে পড়েছে। নতুন প্রকল্পে গতি আসছে না, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও থমকে আছে।

সব মিলিয়ে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের ঠিক আগমুহূর্তে রপ্তানি খাতের এই টানা পতন দেশের অর্থনীতির জন্য এক স্পষ্ট সতর্কবার্তা। এখনই গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, ব্যাংকিং খাত সংস্কার, ব্যবসাবান্ধব নীতি সহায়তা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে না পারলে সামনে আরও বড় ধাক্কার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সূত্র: জনকণ্ঠ

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়