সুজন কৈরী: মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান এলাকার এক স্বর্ণ ব্যবসায়ী অনুপ বাউলের মরদেহ বালুর ১৬ ফুট নিচ থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
সংস্থাটি জানায়, চলতি বছরের শুরুর দিকে সিরাজদিখানে নিজ বাড়ি থেকে মাদারীপুরে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার পথে নিখোঁজ হন ব্যবসায়ী অনুপ বাউল। তার পরিবারের পক্ষ থেকে করা হয় অপহরণ মামলা। ঘটনার তদন্ত করে পাঁচ মাস পর বালুর নিচে চাপা দেয়া অনুপ বাউলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সেইসঙ্গে হত্যাকাণ্ডে জড়িত অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় চারজনকে। এরা সবাই সম্পর্কে চাচাতো ভাই। তারা হলেন- ভেকুর মালিক রিপন মন্ডল (২৬), নয়ন মন্ডল (২৬), পিযুষ করাতি (২৫) ও দিলীপ চন্দ্র রায়।
পিবিআই জানায়, নয়ন মন্ডলকে ব্যবসা করার জন্য রিপন মন্ডলের মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা ধার দেন স্বর্ণ ব্যবসায়ী অনুপ বাউল। পাওনা টাকা নিয়ে দুজনের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। এই বিরোধকে কেন্দ্র করে অনুপকে হত্যার পরিকল্পনা করেন নয়ন। পরিকল্পনা অনুযায়ী রিপনসহ চারজন অনুপ বাউলকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। হত্যার পর অনুপের মরদেহ মাটি কাটার ভেকু দিয়ে ৪ ফিট গভীর করে বালির নিচে পুঁতে রাখেন রিপন মন্ডল।
বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর ধানমন্ডিতে পিবিআই সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি বনজ কুমার মজুমদার বলেন, গত ৪ জানুয়ারি নিখোঁজ হন অনুপ। পরদিন তার ছোট ভাই বিপ্লব বাউল সিরাজদিখান থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। বিষয়টি চাঞ্চল্যকর হওয়ায় থানা পুলিশের পাশাপাশি র্যাব, ডিবি ও পিবিআই মুন্সীগঞ্জ জেলা তদন্ত শুরু করে। আর বিপ্লব বাউলকে কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় একটি অপহরণ মামলা করার পরামর্শ দেয় পিবিআই।
পরে বিপ্লব বাউল ৪ ফেব্রুয়ারি কেরানীগঞ্জ থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে অপহরণ মামলা করেন। থানা পুলিশের তদন্তে তিন মাসেও রহস্য উদঘাটিত না হওয়ায় পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে গত ২১ এপ্রিল তদন্তভার পায় পিবিআইয়ের ঢাকা জেলা শাখা। দায়িত্ব পান এসআই (নি.) সালেহ ইমরান। তিনি প্রথমে রিপন এবং এক অটোচালককে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। একপর্যায়ে পুরো বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। তারপর অনেকটা নিশ্চিত হয়ে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের দেয়া তথ্যে মরদেহ গুমের স্থান চিহ্নিত করা হয়। এরপর বুধবার অনুপের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃতরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, অনুপ বাউলের স্বর্ণ ব্যবসার অংশীদার নয়ন মণ্ডল। তাদের দুজনের মধ্যে পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধ ছিলো। এ বিষয়কে কেন্দ্র অনুপকে খুন করার পরিকল্পনা করেন নয়ন। বিষয়টি নিয়ে তিনি কথা বলেন চাচাতো ভাই রিপন, পীযূষ ও দিলীপের সঙ্গে। তারা সবাই মিলেই খুনটি করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ৪ জানুয়ারি সকাল ১০টার দিকে অনুপকে পাওনা টাকা দেয়া এবং মাদারীপুরে স্বর্ণের অর্ডার পৌঁছে দেয়ার কথা বলে জয়েনপুরে ডেকে নেন নয়ন। জয়েনপুরে রিপনের গ্যারেজে আগে থেকে অপেক্ষায় ছিলেন রিপন, পীযূষ ও দিলীপ। সেখানে ঝগড়ার একপর্যায়ে চারজন মিলে অনুপকে গ্যারেজের খাটের মধ্যে ফেলে কাপড় দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। এরপর মরদেহ একটি ড্রামে ভরে রাখা হয়। বেলা ৩টার দিকে অধীর নামে একজনের অটোয় করে আসামিরা ড্রামটি সিরাজনিখান থানার বোয়ালখালীতে বিসিক এলাকায় বালুর মাঠের কাছে নিয়ে যায়।
ড্রাম রেখে অটোচালক চলে গেলে আসামিরা ড্রামটিকে মাঠের ভেতর নিয়ে যান। তারপর কাদাযুক্ত একটি স্থানে লাশ পুঁতে ফেলে আসামিরা চলে যান। লাশ পুঁতে রাখার পর নয়ন তার প্রতিবেশী পিংকুর বাসায় গিয়ে গোসল করেন।
পিবিআই প্রধান বলেন, যেহেতু নয়নকে নিয়ে অনুপের মাদারীপুর যাওয়ার কথা ছিলো, তাই অনুপের স্বজনরা নয়নকে জেরা করেন। সে সময় তিনি অনুপের সঙ্গে দেখা হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও নয়নকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি আবারো সবকিছু অস্বীকার করেন।