শিরোনাম
◈ ১০ টাকার নোটের দাম ২০ হাজার, সুন্দরবনে দস্যুদের অভিনব চাঁদাবাজি ◈ সঙ্গীসহ বিনামূল্যে ওমরাহ পালনের সুযোগ, আবেদন করবেন যেভাবে ◈ আট দিন ঝুপড়িতে বন্দি, পালানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ; কাঁচা কদু-ডাল খাইয়ে হাতে-পায়ে শিকল, যেভাবে পাহাড়ে চলত মানবপাচার ◈ এবার হবিগঞ্জে জাতীয় গ্রিডের পাইপলাইন ছিদ্র করে ৪ হাজার ২৯২ লিটার তেল চুরি ◈ পুলিশি হামলার বিচার চেয়ে ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম, অধ্যক্ষকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা শিক্ষার্থীদের ◈ কারাগারের নিরাপত্তা জোরদারে ৭ দফা নির্দেশনা, সিসিটিভি নজরদারি ও আকস্মিক পরিদর্শন বাধ্যতামূলক ◈ সরকারি দপ্তরে ঘুষ-খরচ কমলে শ্রমিকদের ৩০-৪০ হাজার টাকা বেতন দেওয়া সম্ভব: মাসুদুজ্জামান ◈ দুই দশকের বেশি সময়েও থামেনি রাজনৈতিক সহিংসতা, সরকার বদলালেও বদলায়নি সংঘাতের চিত্র ◈ সাধারণ লবণের বদলে পটাশিয়ামসমৃদ্ধ লবণ ব্যবহারে বছরে ৩০ লাখ মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব: গবেষণা ◈ হরমুজ প্রণালির বিকল্প জ্বালানি উৎস হিসেবে বিশ্ববাজারে গুরুত্ব বাড়ছে আফ্রিকার, বাড়ছে বিনিয়োগ!

প্রকাশিত : ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ০৭:২২ বিকাল
আপডেট : ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ০৮:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

সবুজের ক্যানভাসে ফুলের উৎসব, যেন প্রকৃতির বুকে এক বিদ্যাপীঠ

মো. কামরুল ইসলাম, নবীনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি : ক্যাম্পাসজুড়ে সবুজের সমারোহ। কোথাও সোনালি সোনাপাতি, কোথাও গোলাপি বাগানবিলাস, আবার কোথাও বেগুনি জারুল ও রক্তকাঞ্চনের বাহারি রূপ। পুকুরের স্বচ্ছ পানিতে ফুটে আছে লাল শাপলা ও পদ্ম। গাছের ডালে ডালে ফুলের উৎসব, পাতার ফাঁকে প্রজাপতির ওড়াউড়ি, মৌমাছির গুঞ্জন। সকালের সোনালি রোদে ফুলে ফুলে সাজানো ক্যাম্পাসটি যেন প্রকৃতির হাতে আঁকা এক জীবন্ত ক্যানভাস। দেখে মনে হবে, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, যেন ফুল ও সবুজের এক অপূর্ব উদ্যান।

এমনই এক নান্দনিক পরিবেশ গড়ে উঠেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী শ্যামগ্রাম মোহিনী কিশোর স্কুল অ্যান্ড কলেজে। শিক্ষা ও ঐতিহ্যের পাশাপাশি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেও প্রতিষ্ঠানটি এখন স্বতন্ত্র পরিচিতি তৈরি করেছে। ক্যাম্পাসজুড়ে রয়েছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির হাজারেরও অধিক শোভাবর্ধনকারী গাছ। বাহারি ফুল, সবুজ বৃক্ষরাজি, জলজ উদ্ভিদ ও পুকুরের লাল শাপলা-পদ্ম মিলিয়ে পুরো ক্যাম্পাস হয়ে উঠেছে প্রকৃতিপ্রেমীদের আকর্ষণকেন্দ্র। সৌন্দর্য উপভোগ করতে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি দূরদূরান্ত থেকেও ছুটে আসেন দর্শনার্থীরা।

জানা যায়, শ্যামগ্রাম গ্রামের জমিদার মোহিনী কিশোর রায় জনকল্যাণ ও শিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যে ১৯০০ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন। দীর্ঘদিন ধরে এ বিদ্যালয় এলাকার মানুষের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে আসছে। সময়ের পরিক্রমায় শিক্ষার ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবেশবান্ধব ও নান্দনিক ক্যাম্পাসের নতুন পরিচয়। ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তৎকালীন দায়িত্বশীলদের উদ্যোগে, বিশেষ করে গভর্নিং বডির সাবেক সভাপতি মো. খলিলুর রহমানের আগ্রহ, পরিকল্পনা ও প্রত্যক্ষ প্রচেষ্টায় ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যবর্ধনে নেওয়া হয় নানা উদ্যোগ। তাঁর উদ্যোগে বিভিন্ন দেশ থেকে সংগৃহীত ও বিদেশি প্রজাতির শোভাবর্ধনকারী গাছ রোপণ করা হয়। পর্যায়ক্রমে বেড়ে ওঠা এসব গাছ এখন ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ।

Advertisement

ক্যাম্পাসের প্রবেশপথ থেকে শুরু করে বিভিন্ন আঙিনা ও পুকুরপাড়—সবখানেই চোখে পড়ে নানা প্রজাতির গাছের সমারোহ। সোনালি হলুদ ফুলের সোনাপাতি, গোল্ডেন লেগুম, গোলাপি বাগানবিলাস, রক্তকাঞ্চন, কনকচূড়া, জারুল, গ্লিরিসিডিয়া, সিল্ক ফ্রস ও নাগাচুয়া গাছ ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যে যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা। পাশাপাশি রয়েছে ক্রিসমাস ট্রি ও এরিকা পামের মতো দৃষ্টিনন্দন উদ্ভিদ।

সোনাপাতির হলুদ ঘণ্টাকৃতির ফুল সবুজ পাতার মাঝে এক অনন্য দৃশ্য তৈরি করে। বাগানবিলাসের রঙিন পুষ্পমঞ্জরি, রক্তকাঞ্চনের গোলাপি-বেগুনি আভা এবং জারুলের বেগুনি ফুল প্রকৃতিকে সাজিয়ে তোলে নিজস্ব রূপে। কনকচূড়ার হলুদ ফুলের দীর্ঘ মঞ্জরি আর সিল্ক ফ্রস গাছের বড় গোলাপি ফুল দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে।

শুধু ফুলের সৌন্দর্য নয়, গাছগুলোর বৈচিত্র্যও শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ। প্রতিটি গাছের রয়েছে আলাদা পরিচয়, বৈজ্ঞানিক নাম, উৎপত্তিস্থল ও বৈশিষ্ট্য। ফলে ক্যাম্পাসের প্রতিটি অংশই যেন উদ্ভিদবৈচিত্র্য জানার একটি উন্মুক্ত পাঠশালা।

ক্যাম্পাসের অন্যতম আকর্ষণ পুকুর। সেখানে ফুটে থাকা অসংখ্য লাল শাপলা ও পদ্ম যেন সবুজের বুকজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে রঙের মেলা। পানির ওপর ভেসে থাকা সবুজ পাতার মাঝে লাল শাপলার প্রস্ফুটন এবং পদ্মের কোমল পাপড়ি তৈরি করেছে মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। বিশেষ করে সূর্যোদয়ের পর সকালের আলোয় পুকুরের ফুলগুলো যখন ফুটে ওঠে, তখন পুরো পরিবেশ হয়ে ওঠে আরও মোহনীয়।

লাল শাপলা ও পদ্মের সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিনই আগ্রহী হন শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। দূরদূরান্ত থেকে আসা প্রকৃতিপ্রেমীরাও ফুলের ছবি তুলতে ভিড় করেন। পুকুরের পানিতে ফুলের প্রতিবিম্ব, পাড়ের সবুজ গাছপালা এবং প্রজাপতি ও মৌমাছির আনাগোনা—সব মিলিয়ে সৃষ্টি হয়েছে এক মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক আবহ।

জানা যায়, তৎকালীন গভর্নিং বডির সভাপতি মো. খলিলুর রহমান নিজ উদ্যোগে লাল শাপলার কন্দ সংগ্রহ করে পুকুরে রোপণ করেন। পরে নিয়মিত পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের ফলে শাপলার বিস্তার ঘটে। এর সঙ্গে পদ্মের উপস্থিতি যুক্ত হয়ে পুকুরটিকে দিয়েছে অনন্য সৌন্দর্য।

একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ শিক্ষার্থীদের মনন, সৃজনশীলতা ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শ্যামগ্রাম মোহিনী কিশোর স্কুল অ্যান্ড কলেজের সবুজ ক্যাম্পাস সেই সম্ভাবনাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। এখানে শিক্ষার্থীরা শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠ গ্রহণ করছে না, বরং প্রকৃতির কাছ থেকেও শিখছে। বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ, ফুলের বৈচিত্র্য, জলজ পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে তাদের তৈরি হচ্ছে নিবিড় পরিচয়।

গাছপালা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, বায়ুমান উন্নয়ন, কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি ফুলের গাছ মৌমাছি, প্রজাপতিসহ বিভিন্ন পরাগায়নকারী পতঙ্গের বিচরণক্ষেত্র তৈরি করে। ফলে এমন একটি পরিবেশ শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রকৃতিপ্রেম, বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সংরক্ষণের ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তুলতে সহায়ক।

বর্তমান গভর্নিং বডির সভাপতি ড. মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য শুধু একটি সুন্দর ক্যাম্পাস গড়ে তোলা নয়; শিক্ষার মানোন্নয়নের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটিকে আধুনিক, সৃজনশীল ও যুগোপযোগী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বর্তমান গভর্নিং বডি নিরলসভাবে কাজ করছে। আমরা চাই, শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষার পাশাপাশি একটি সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব শিক্ষাঙ্গনে বেড়ে উঠুক।’

প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ মো. মোস্তাক আহাম্মদ বলেন, ‘শিক্ষার মানোন্নয়নই আমাদের প্রধান অঙ্গীকার। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখে এর অবকাঠামো, পরিবেশ ও শিক্ষার সামগ্রিক মানকে আরও যুগোপযোগী করে গড়ে তুলতে আমরা কাজ করছি। এ ক্ষেত্রে গভর্নিং বডির পাশাপাশি এলাকার সুধীজন ও শিক্ষানুরাগীদের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের প্রত্যাশা, শ্যামগ্রাম মোহিনী কিশোর স্কুল অ্যান্ড কলেজ একদিন শিক্ষা, সৌন্দর্য ও সৃজনশীলতার সমন্বয়ে একটি আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে আরও সুপরিচিত হবে।’

কৃষিবিষয়ক শিক্ষক মোহাম্মদ মুক্তার হোসেন বলেন, ‘এ ক্যাম্পাসের অন্যতম বিশেষত্ব হলো এখানে রোপণ করা শোভাবর্ধনকারী গাছগুলোর অধিকাংশই বিদেশি ও দৃষ্টিনন্দন প্রজাতির। প্রতিটি গাছের রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও সৌন্দর্য। এগুলো শুধু ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য বাড়াচ্ছে না, শিক্ষার্থীদের উদ্ভিদবৈচিত্র্য সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান অর্জনেরও সুযোগ তৈরি করছে। আমি মনে করি, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশকে আকর্ষণীয় ও শিক্ষাবান্ধব করতে বৃক্ষরোপণ এবং নিয়মিত পরিচর্যার বিকল্প নেই।’

প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থী সামসাদ জাহান মাইশা বলে, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার পরিবেশ যেমন সুন্দর, তেমনি ক্যাম্পাসের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও অসাধারণ। এত সুন্দর ফুল, গাছপালা ও শাপলা-পদ্মের মধ্যে প্রতিদিন পড়াশোনা করতে পেরে আমি গর্বিত। এখানে এলে মন ভালো হয়ে যায়। আমরা চাই, আমাদের ক্যাম্পাসের এই সৌন্দর্য আরও বাড়ুক এবং সবাই মিলে গাছগুলো যত্ন করে সংরক্ষণ করি।’

শ্যামগ্রাম মোহিনী কিশোর স্কুল অ্যান্ড কলেজের এই নান্দনিক পরিবেশ কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সৌন্দর্যবর্ধনের গল্প নয়; এটি শিক্ষা, প্রকৃতিপ্রেম ও সম্মিলিত উদ্যোগেরও এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নেওয়া বৃক্ষরোপণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগে গড়ে ওঠা হাজারেরও অধিক গাছের এই সমারোহ প্রতিষ্ঠানটির পরিচয়ে যুক্ত করেছে নতুন মাত্রা।

শতবর্ষের শিক্ষার ঐতিহ্যকে ধারণ করে প্রতিষ্ঠানটি এখন এগিয়ে যেতে চায় আধুনিক, সৃজনশীল ও পরিবেশবান্ধব শিক্ষাঙ্গন হিসেবে। যেখানে শিক্ষার্থীরা বইয়ের জ্ঞানের পাশাপাশি প্রকৃতির পাঠও নেবে, শিখবে পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল হতে। ফুলের সৌরভ, সবুজের স্নিগ্ধতা আর জলাশয়ের শাপলা-পদ্মের সৌন্দর্যে শ্যামগ্রাম মোহিনী কিশোর স্কুল অ্যান্ড কলেজ যেন সত্যিই প্রমাণ করছে—একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চাইলে জ্ঞানের আলো ছড়ানোর পাশাপাশি প্রকৃতির সৌন্দর্যেও হয়ে উঠতে পারে অনন্য।

  • সর্বশেষ