শাহাজাদা এমরান, স্টাফ রিপোর্টার,কুমিল্লা : গ্রেফতারের পর প্রকৃত নাম-ঠিকানা গোপন করে ভুয়া পরিচয় দেওয়ার সুযোগ নিচ্ছে মাদক কারবারি, ডাকাত ও আন্তঃজেলা অপরাধী চক্রের সদস্যরা। থানায় গ্রেফতারের পর আদালত পর্যন্ত একই ভুয়া পরিচয় বহাল থাকায় অনেক ক্ষেত্রে তাদের পুরোনো অপরাধের তথ্য সামনে আসছে না। পরে জামিনে বেরিয়ে আত্মগোপনে চলে যাচ্ছে এসব অপরাধী। এতে মামলার তদন্ত, চার্জশিট ও বিচার কার্যক্রম যেমন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতাও অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না।
পুলিশ ও কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লায় মাদক, ডাকাতি ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন মামলায় প্রতি মাসে বিপুলসংখ্যক আসামি গ্রেফতার হয়। তাদের মধ্যে আন্তঃজেলা অপরাধীও রয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায়। বিশেষ করে কক্সবাজার থেকে ঢাকামুখী মাদক পাচারকারী চক্রের সদস্যদের একটি অংশ গ্রেফতারের পর নিজেদের প্রকৃত পরিচয় গোপন করে ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করছে বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দিদের বায়োমেট্রিক যাচাই করতে গিয়ে এমন প্রতারণার বিষয়টি সামনে আসে। কারা কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত কুমিল্লা কারাগারে ভুয়া পরিচয় ব্যবহারকারী ২৩ জন ভয়ংকর অপরাধীকে শনাক্ত করা হয়েছে। শনাক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ডাকাত ও মাদক মামলার আসামি রয়েছে। বিষয়টি পরে আদালত ও জেলা পুলিশকে অবহিত করা হয়েছে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, নাঙ্গলকোটের ইউসুফ নামে এক ব্যক্তি বুড়িচং থানায় মাদক মামলায় গ্রেফতারের পর নিজের পরিচয় পরিবর্তন করে ‘আসিফ’ নাম ব্যবহার করেন। মায়ের নাম অপরিবর্তিত রাখলেও বাবার নাম নুরুল আমিনের পরিবর্তে কামাল হোসেন উল্লেখ করেন। পাশাপাশি বদলে দেন নিজের ঠিকানাও। পরে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়ার পর বায়োমেট্রিক যাচাইয়ে তার প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত হয়।
একইভাবে মাদক মামলার আরেক আসামি নাইমা নিজের নাম-ঠিকানা পরিবর্তন করে ‘রুমি আক্তার’ পরিচয় ব্যবহার করেন। কারাগারে বায়োমেট্রিক যাচাইয়ের সময় তার প্রকৃত পরিচয়ও বেরিয়ে আসে। কারা কর্তৃপক্ষের হিসাবে, এ ধরনের ভুয়া পরিচয় ব্যবহারকারীদের মধ্যে অনেকেই গুরুতর অপরাধের সঙ্গে জড়িত।
পুলিশ সূত্র বলছে, একজন অপরাধী নিজের প্রকৃত নাম-ঠিকানা গোপন করতে পারলে তার বিরুদ্ধে থাকা পুরোনো মামলা, গ্রেফতারি পরোয়ানা কিংবা অন্য থানায় থাকা অপরাধের তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অনেক সময় ওই আসামি নতুন পরিচয়ে আদালতে হাজির হয় এবং তার পূর্বের অপরাধের ইতিহাস বিচারিক প্রক্রিয়ায় যথাসময়ে সামনে আসে না। এতে জামিন পাওয়ার সুযোগও তৈরি হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে থানাপর্যায়ে গ্রেফতার ব্যক্তির পরিচয় যাচাইয়ে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ও নির্বাচন কমিশনের সার্ভারের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু সব ক্ষেত্রে দ্রুত যাচাই সম্ভব হয় না। থানাগুলোতে কেন্দ্রীয় ডাটাবেজের সঙ্গে সংযুক্ত বায়োমেট্রিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যবস্থার অভাব এ ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, প্রতিটি থানায় জাতীয় পরিচয়পত্র ও পুলিশ ডাটাবেজের সঙ্গে সংযুক্ত ডিজিটাল বায়োমেট্রিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট ডিভাইস থাকলে গ্রেফতারের পরপরই একজন ব্যক্তির প্রকৃত পরিচয়, পূর্বের মামলা ও অপরাধের ইতিহাস যাচাই করা সম্ভব হবে। এতে ভুয়া পরিচয় দেওয়ার সুযোগ যেমন বন্ধ হবে, তেমনি পলাতক ও আন্তঃজেলা অপরাধীদের শনাক্ত করাও সহজ হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশেষ অভিযানে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক অপরাধী গ্রেফতার হলেও পরিচয় যাচাইয়ের দুর্বলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে সেই সাফল্য ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। গ্রেফতারের পর ভুয়া পরিচয়ে জামিন নিয়ে অপরাধীরা এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে গেলে মামলার তদন্ত ও
সাক্ষ্যগ্রহণও বাধাগ্রস্ত হয়।
ফলে অপরাধী শনাক্ত ও গ্রেফতারে পুলিশের পাশাপাশি বিচারপ্রক্রিয়াও দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে। কুমিল্লা কারাগারে বায়োমেট্রিক ব্যবস্থায় ইতোমধ্যে ২৩ জনের ভুয়া পরিচয় শনাক্ত হওয়ার ঘটনা বিষয়টির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, শুধু কারাগারে নয়, গ্রেফতারের শুরুতেই থানাপর্যায়ে বায়োমেট্রিক পরিচয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালু করা গেলে ভুয়া পরিচয়ের এই ফাঁক বন্ধ করা সম্ভব হবে। এতে অপরাধীর প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি তার অতীত অপরাধের তথ্যও দ্রুত সামনে আসবে এবং কুমিল্লায় অপরাধ দমন ও বিচারপ্রক্রিয়া আরও কার্যকর হবে।