শাহাজাদা এমরান, স্টাফ রিপোর্টার,কুমিল্লা : কুমিল্লার চান্দিনায় ধানকাটা শ্রমিকের পরিচয়ে বাড়িতে ঢুকে ছমিরন খাতুন (৬০) নামে এক বৃদ্ধাকে শ্বাসরোধে হত্যার ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গ্রেপ্তার তিনজনই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পিবিআই।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কুমিল্লা নগরের হাউজিং এস্টেট এলাকায় পিবিআই কুমিল্লা জেলা কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মতিয়ার রহমান।
তিনি জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা আগে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ফিশারি ঘাটে একসঙ্গে গার্মেন্টস শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। পরে ধানকাটা শ্রমিকের পরিচয়ে কুমিল্লায় এসে পরিকল্পিতভাবে ওই বাড়িতে অবস্থান নেন। ছমিরনকে হত্যার পর তারা বাড়ি থেকে ৭০ হাজার টাকা ও প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা মূল্যের স্বর্ণালংকার নিয়ে পালিয়ে যান।
গ্রেপ্তার তিনজনের মধ্যে মো. মাসুম বিল্লা ওরফে রবিনকে হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছে পিবিআই।
পিবিআইয়ের তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ মে সকালে চান্দিনা উপজেলার অলিপুর গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে ছমিরন খাতুনের লাশ উদ্ধার করা হয়। তার শয়নকক্ষের দরজা খোলা ছিল। ঘরের কাঠের আলমারি খোলা এবং কাপড়চোপড় এলোমেলো অবস্থায় পড়ে ছিল। বাড়িতে ধান কাটার শ্রমিক হিসেবে অবস্থান করা কয়েকজন শ্রমিক টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে পালিয়ে গেছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা যায়। এরপর ঘটনাটি তদন্তে নামে পুলিশ।
তদন্তে পিবিআই জানতে পারে, ঢাকার কদমতলী এলাকার আবদুর রহীমের ছেলে শরীফুল ইসলাম শান্ত (২৭), কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার কালিরহাট যশপুর কাজীবাড়ির জাফর আলীর ছেলে মো. মাসুম বিল্লা ওরফে রবিন (৩১) এবং কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার মোহাম্মদপুর এলাকার নুরু মিয়ার ছেলে আরাফাত হোসেন (১৪) আগে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ফিশারি ঘাটে একসঙ্গে কাজ করতেন। পরে তারা ধানকাটা শ্রমিকের পরিচয়ে কুমিল্লায় এসে ছমিরন খাতুনের বাড়িতে অবস্থান নেন।
পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন ধান কাটার কাজ ঠিকমতো না জানা এবং ধান নষ্ট হওয়াকে কেন্দ্র করে শ্রমিকদের সঙ্গে ছমিরন খাতুন ও তার স্বামীর কথা-কাটাকাটি হয়। পরে রাতে পরিবারের সদস্যরা ঘুমিয়ে পড়লে ছমিরনকে হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন আসামিরা।
রাত ১টা থেকে দেড়টার মধ্যে তারা ছমিরন খাতুনের ঘরে প্রবেশ করেন। এরপর তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। হত্যার পর তার কাছে থাকা স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা নিয়ে তারা পালিয়ে যান বলে জানিয়েছে পিবিআই।
এ ঘটনায় নিহতের ছেলে মো. বশির আহাম্মদ বাদী হয়ে চান্দিনা থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন। মামলাটি প্রথমে চান্দিনা থানা-পুলিশ সাত দিন তদন্ত করে। পরে মামলাটি পিবিআইয়ের সিডিউলভুক্ত হওয়ায় ১০ মে পিবিআই কুমিল্লা জেলা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তদন্তভার গ্রহণ করে।
মামলাটির তদন্ত করছেন পিবিআই কুমিল্লা জেলার উপপরিদর্শক (নিরস্ত্র) মো. আমিরুল ইসলাম। তদন্তের একপর্যায়ে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত ১২ থেকে ১৫ মে চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে শরীফুল ইসলাম শান্তকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১৪ বছর বয়সী আরাফাত হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ৩ সেপ্টেম্বর ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী মো. মাসুম বিল্লা ওরফে রবিনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মতিয়ার রহমান বলেন, গোয়েন্দা তথ্য ও বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে তদন্তের মাধ্যমে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে। ঘটনায় আরও কেউ জড়িত থাকলে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।
তিনি আরও বলেন, হত্যাকাণ্ডে আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মামলার তদন্ত এখনো চলমান।