প্রায় দুই দশক ধরে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির থানচি এলাকার একটি ১১০ ফুট উঁচু পাহাড়ের ওপর বসবাস করছিলেন আবদুল করিমের পরিবার। গত বছরের ২৪ আগস্ট কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টির পর পাহাড়ের একটি অংশ ধসে তাদের বাড়ির ওপর পড়ে। এতে করিমের আট মাস বয়সী ভাতিজা মোহাম্মদ ইউসুফ মাটি ও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে যায়। সূত্র: টিবিএস প্রতিবেদন
করিম বলেন, 'টানা বৃষ্টি যে ভূমিধসের কারণ হতে পারে, তা আমরা জানতাম না।'
এর আগের রাতে ছোট একটি ধসে বাড়ির একাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কয়েক ঘণ্টা পর বড় একটি অংশ ধসে পড়ে, যখন ইউসুফ ঘুমিয়ে ছিল।
তিনি বলেন, 'মাটি ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে এবং ধসে পড়া কাঠামোর নিচে তাকে চাপা দেয়।'
পরিবারের সদস্যরা শিশুটিকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও তার মাথায় আঘাত লাগে। এরপর থেকে টানা বৃষ্টি শুরু হলে পরিবারটি আর বাড়িতে থাকে না।
করিম বলেন, 'স্বেচ্ছাসেবক বা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিধস সতর্কবার্তা জানালে আমরা নিরাপদ স্থানে চলে যাই।'
তার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় ক্রমবর্ধমান এক ঝুঁকির প্রতিচ্ছবি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাড়তে থাকা চরম বৃষ্টিপাত, বন উজাড় এবং অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পাহাড় ও পাহাড়ের পাদদেশের বসতিগুলোকে ক্রমেই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের এক গবেষণায় দেখা গেছে, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে অন্তত ১০ লাখ মানুষ ভূমিধসপ্রবণ এলাকায় বসবাস করছে।
গবেষকদের মতে, গত দুই দশকে এ অঞ্চলে ভূমিধসে প্রায় ৪০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২০০৭ ও ২০১৭ সালের ভয়াবহ ভূমিধসেই প্রাণ হারান ২৫০ জনের বেশি মানুষ।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইকবাল সারওয়ার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাওয়ায় ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
তিনি বলেন, 'টানা অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি বন ধ্বংস এবং বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে গত তিন দশকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভূমিধসের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।'
আবহাওয়ার পূর্বাভাস থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে
দীর্ঘদিন ধরে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষ দুর্যোগের আগে কোনো সতর্কবার্তা পেত না। তবে ২০২৪ সালের জুন থেকে ইউরোপিয়ান সিভিল প্রোটেকশন অ্যান্ড হিউম্যানিটারিয়ান এইড অপারেশন্সের অর্থায়নে একটি প্রকল্প এ বাস্তবতা বদলাতে কাজ করছে।
সেভ দ্য চিলড্রেনের সহযোগিতা এবং রিজিওনাল ইন্টিগ্রেটেড মাল্টি-হ্যাজার্ড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেমের কারিগরি সহায়তায় ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশন (ইপসা) ও আশিকা প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।
এর আওতায় চট্টগ্রাম সিটির ভূমিধসপ্রবণ তিনটি ওয়ার্ড—পশ্চিম ষোলশহরের ৭ নম্বর ওয়ার্ড, পাহাড়তলীর ৯ নম্বর ওয়ার্ড এবং লালখান বাজারের ১৪ নম্বর ওয়ার্ড—এবং বান্দরবানের লামা ও নাইক্ষ্যংছড়ি এবং বাঁশখালী উপজেলার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এ ব্যবস্থায় আবহাওয়ার পূর্বাভাস, প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক, স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি, বহুভাষিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং আগাম নগদ সহায়তা একত্রে ব্যবহার করা হয়, যাতে দুর্যোগের আগেই মানুষ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মোমেনুল ইসলাম বলেন, ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসের ভিত্তিতে প্রায় তিন বছর ধরে তারা ভূমিধসের সতর্কবার্তা দিয়ে আসছেন।
তিনি বলেন, 'আগে এসব সতর্কবার্তা মূলত আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হতো এবং সরকারি দপ্তরগুলোতে পাঠানো হতো। কিন্তু দুর্গম পাহাড়ি এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ মানুষ সেগুলো সহজে পেত না।'
তার ভাষ্য, এখন প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক ও স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি সেই বার্তা সরাসরি জনগণের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।
প্রথম সাড়াদানকারী হিসেবে স্বেচ্ছাসেবক
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, শুধু চট্টগ্রাম শহরের প্রকল্পভুক্ত তিনটি ওয়ার্ডেই প্রায় দুই লাখ মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় ও পাদদেশ এলাকায় বাস করে।
ইপসার কর্মসূচি কর্মকর্তা আবদুর রহমান জিহাদ বলেন, প্রকল্প শুরুর সময় মানুষের সচেতনতা খুবই কম ছিল এবং ওয়ার্ড পর্যায়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটিগুলোও প্রায় নিষ্ক্রিয় ছিল।
প্রথমে সচেতনতা বৃদ্ধি ও স্বেচ্ছাসেবক প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়। এখন ভারী বৃষ্টির সতর্কবার্তা জারি হলে স্বেচ্ছাসেবকেরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে সতর্ক করেন।
সেভ দ্য চিলড্রেনের তথ্য অনুযায়ী, ৩৮ শতাংশ মানুষ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সতর্কবার্তা পান। বাকি ৬২ শতাংশ মানুষের কাছে মাইকিং, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশনের ঘোষণা, কারবারি, হেডম্যান ও স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম নগরের জালালাবাদ এলাকার মিয়া পাহাড়ের স্বেচ্ছাসেবক মনোয়ারা বেগম বলেন, 'এখন মানুষ অনেক বেশি সচেতন। সতর্কবার্তা পেলেই তারা ঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যায়।'
জিহাদ জানান, ২০২৩ সালের জুলাইয়ে পরিচালিত একটি পাইলট কার্যক্রমে আগাম সতর্কবার্তার গুরুত্ব স্পষ্ট হয়। সতর্কবার্তা পেয়ে রাউফাবাদের মিয়া পাহাড় এলাকার বাসিন্দারা নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পর দুটি বাড়িতে ভূমিধস হয়। তবে আগে থেকেই সরিয়ে নেওয়ায় কোনো প্রাণহানি ঘটেনি।
দুর্গম ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো
দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া শহরের তুলনায় বেশি চ্যালেঞ্জিং। বিশেষ করে লামা ও নাইক্ষ্যংছড়ির অনেক বাসিন্দা বাংলা ভাষা বোঝেন না।
এ সমস্যা সমাধানে আশিকা অনুবাদক দল এবং কারবারি ও হেডম্যানদের যুক্ত করে বহুভাষিক সতর্কবার্তা ব্যবস্থা চালু করেছে।
নাইক্ষ্যংছড়ির লেকপাড়া এখন এ নেটওয়ার্কের আওতায় রয়েছে। সেখানে ২২টি মারমা পরিবার একটি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাস করে।
ভূমিধসের সতর্কবার্তা জারি হলে স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি চাকমা ও মারমা ভাষায় ভয়েস মেসেজ পাঠায়। পাশাপাশি কারবারি ও হেডম্যানরা সরিয়ে নেওয়ার কাজ সমন্বয় করেন।
এরপর বাসিন্দারা স্কুল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নেন।
আশিকার কর্মসূচি কর্মকর্তা উকায়া হাইং মারমা বলেন, 'প্রতিটি পাড়ায় স্থানীয়দের নিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি ও অনুবাদক দল গঠন করা হয়েছে।'
যেসব এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল, সেখানে স্বেচ্ছাসেবক, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং ঐতিহ্যবাহী সম্প্রদায় নেতাদের মাধ্যমে সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়।
দুর্যোগের আগেই নগদ সহায়তা
শুধু সতর্কবার্তা দিয়েই থেমে নেই উদ্যোগটি।
আগাম সতর্কবার্তার কারণে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হওয়া ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে পাঁচ হাজার টাকা করে নগদ সহায়তা দেওয়া হয়।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এ অর্থ পরিবারগুলোকে স্থানান্তর ও অস্থায়ীভাবে অন্যত্র থাকার খরচ মেটাতে সহায়তা করে।
ভূমিধসপ্রবণ এলাকায় বসবাসকারী পরিবার, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, নারীপ্রধান পরিবার এবং আগে ভূমিধসে স্বজন হারানো পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা প্রশাসনের অনুমোদিত মূল্যায়নের মাধ্যমে উপকারভোগী নির্বাচন করা হয়।
আশিকার তথ্য অনুযায়ী, এ পদ্ধতি অর্থনৈতিকভাবেও লাভজনক প্রমাণিত হয়েছে।
জিহাদ বলেন, 'আগাম নগদ সহায়তার ব্যয়-সুবিধা অনুপাত প্রায় ১:১৫।'
অর্থাৎ, এ খাতে ব্যয় করা প্রতি ১ টাকার বিপরীতে প্রায় ১৫ টাকার ক্ষতি এড়ানো ও অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া গেছে।
জলবায়ু অভিযোজনের সম্ভাবনাময় মডেল
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বাংলাদেশের ভূমিধসপ্রবণ পাহাড়ি অঞ্চলে দুর্যোগ ঝুঁকি কমাতে এ উদ্যোগ কার্যকর মডেল হতে পারে।
সমাপ্তির পথে থাকা প্রকল্পটি আবহাওয়ার পূর্বাভাস, স্থানীয় প্রশাসন, কমিউনিটি প্রস্তুতি এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে একত্র করেছে, যাতে দুর্যোগের আগেই মানুষ ব্যবস্থা নিতে পারে।
সেভ দ্য চিলড্রেনের অ্যান্টিসিপেটরি অ্যাকশন ম্যানেজার ফাতেমা মেহেরুননেসা বলেন, প্রকল্পটি প্রায় ৩০ হাজার পরিবার বা এক লাখ ২০ হাজার ৪৫০ জন মানুষের কাছে পৌঁছেছে।
তার মতে, প্রকল্পভুক্ত ৮৭ দশমিক ১ শতাংশ পরিবার এখন আগাম পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং ৯৩ দশমিক ৩ শতাংশ উপকারভোগী সতর্কবার্তায় আস্থা রেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়।
তিনি জানান, ভবিষ্যতে ভূমিধস ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য জাতীয় পর্যায়ের একটি 'আর্লি অ্যাকশন প্রটোকল' গড়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য, যা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ও প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
আবদুল করিমের পরিবারের মতো মানুষের কাছে এ উদ্যোগের গুরুত্ব আরও সহজ। ভূমিধসে ভাতিজার জীবন প্রায় হারাতে বসার আগে পাহাড়ে ভারী বৃষ্টি ছিল তাদের কাছে স্বাভাবিক ঘটনা। এখন সতর্কবার্তা এলেই তারা নিরাপদ স্থানে সরে যান।
চারপাশের পাহাড় আগের চেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ হয়নি। তবে আগাম সতর্কবার্তা তাদের এমন একটি জিনিস দিয়েছে, যা আগে ছিল না—তা হলো সময়।