জঙ্গলে ভরা রূপপুর গ্রাম এখন আলো ঝলমলে ‘শহর’। পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে যেখানটায় দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে, সেখানটায় একসময় ছিল ধু-ধু বালুচর। মাঠের মধ্যে ছোট্ট এক প্রাচীন স্থাপনা ছিল, যেখানে দিনের বেলাতেও ভয়ে কেউ যেতে সাহস করত না। রূপপুর গ্রামের সেই স্থানে এখন বিশাল কর্মযজ্ঞ। হাজার হাজার মানুষের পদভারে মুখরিত আলো ঝলমলে এক ব্যস্ত ‘শহরে’ পরিণত হয়েছে গ্রামটি।
রূপপুরের পাশেই সাহাপুর গ্রাম, যেখানে ঘন জঙ্গল, বাঁশঝাড়ে বিষধর সাপ, শিয়াল বসবাস করত নির্বিঘ্নে। দিনেও যেতে গা ছমছম করত। সেখানে এখন আধুনিক ২০ তলা ‘গ্রিন সিটি’ ভবনে বসবাস করেন প্রায় পাঁচ হাজার বিদেশি।
সাহাপুরের নতুন হাট নামের বাজারে এখন আধুনিক মার্কেট, অসংখ্য রেস্তোরাঁর পাশাপাশি গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন, যেখানে বসবাস দেশি-বিদেশি হাজারো মানুষের।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম ও ফিজিক্যাল স্টার্টআপ শুরুর মধ্য দিয়ে গতকাল মঙ্গলবার শুরু হয়েছে নতুন অধ্যায়। এ কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশের তালিকায় বিশ্বের ৩৩তম দেশ হলো বাংলাদেশ।
রূপপুর একসময় গাছগাছালিতে ভরা ছিল। আদিবাসীরা সেখানে শিকার করে বেড়াতেন। সেই রূপপুর গ্রামে এখন ভোরে সূর্য ওঠার আগেই হাজার হাজার মানুষ কাজে আসেন। রূপপুর প্রকল্পে কাজ করেন ৫ হাজার বিদেশি ছাড়াও দেশের ২০ থেকে ২৫ হাজার মানুষ।
অর্থনৈতিক অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন
রূপপুর প্রকল্পের কারণে এই এলাকার মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে যারা কয়েক বছর আগেও দিনমজুরি কিংবা কৃষিজমিতে দিন হাজিরায় কাজ করে সংসার চালাতেন, এখন সেসব মানুষ রূপপুর প্রকল্পে বিভিন্ন কাজ করে অথবা ছোটখাটো ব্যবসা করে সচ্ছল জীবনযাপন করছেন। ঈশ্বরদীর যেসব গ্রামে ছন ও টিনের কাঁচা বাড়িঘর ছিল, এখন সেসব গ্রামে ইটের দালান বাড়ি ছাড়া কোনো কাঁচা বাড়ি আর চোখে পড়ে না। অনেক বাড়িতে এসি লেগেছে। যারা বাইসাইকেল কিনে চলাচল করার স্বপ্ন দেখতেন, তারা এখন লাখ টাকার মোটরসাইকেলে ঘুরে বেড়ান। শখ করে যারা কখনও রেস্তোরাঁয় খাওয়ার কথা ভাবতেই পারেননি, তারা এখন চায়নিজ রেস্তোরাঁর শীতল পরিবেশে বিদেশি খাবারের স্বাদ গ্রহণ করেন স্বজন নিয়ে।
বেড়েছে জমির দাম
রূপপুর প্রকল্পের কাজ শুরুর আগে ঈশ্বরদীর গ্রামে জমির মূল্য ছিল বিঘা হিসাবে। এখন সেসব গ্রামে প্রতি শতাংশ হিসাব করে জমির দাম বেড়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, ১০-১৫ বছর আগে যেখানে এক বিঘা জমি বিক্রি হয়েছে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকায়, এখন জমির বিক্রি হচ্ছে প্রতি শতাংশ এক থেকে দেড়-দুই লাখ টাকায়।
ঈশ্বরদী শহর ও রূপপুরের আশপাশের গ্রামে এখন হাজার হাজার মানুষ ভাড়া বাড়িতে বসবাস করেন। স্থানীয়রা ছোটখাটো একটা বাড়ি বানিয়ে ভাড়া দিয়ে প্রতি মাসে আয় করছেন ১০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত।
সাহাপুর গ্রামের জুলমত হায়দার নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমার জীবনযাপন ছিল অতি সাধারণ। এখন বাড়ি করে ভাড়া দিয়ে প্রতি মাসে প্রায় ৫৫ হাজার টাকা আয় করি। আগের তুলনায় স্বাচ্ছন্দ্যে আছি।’
বদলেছে ব্যবসার ধরন
রূপপুর, সাহাপুর, জয়নগর, মানিকনগর প্রভৃতি গ্রামে ১০ বছর আগেও মানুষের আয়ের পথ ছিল কৃষিকাজ, লেবু, হলুদের ব্যবসা ও লিচুর আবাদ। ব্যবসা ও পেশাগত ধরন পাল্টে এখন এসব গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ হোটেল, রেস্তোরাঁ, গার্মেন্ট, ফলের দোকানসহ বিদেশিদের ব্যবহারের জিনিসপত্র বেচাকোনা করেন। সাহাপুরের গ্রিন সিটি এলাকার আলো ঝলমলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গ্রামের এসব মানুষই রাশিয়ান নাগরিকদের ‘বন্ধু’তে পরিণত হয়েছেন। গ্রামের এসব প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডে বাংলা, ইংরেজির পাশাপাশি রাশিয়ান ভাষা দেখা যায়।
রূপপুর প্রকল্পের কারণে এখন রূপপুর মোড় একটি পরিচ্ছন্ন এলাকা। বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশে ঘিঞ্জি অবস্থা নেই। রূপপুরের পাশের অন্ধকার গ্রাম সাহাপুরে হয়েছে আরও বড় পরিবর্তন। একসময় জায়গাটিতে ছিল অনেক ধানের চাতাল। বড় বড় ট্রাক ও ধুলাবালুতে পূর্ণ থাকত পুরো এলাকা। বর্তমানে তৈরি হয়েছে বড় বড় ভবন, শপিং মল, সুপারমল, বার, রেস্তোরাঁসহ নানা স্থাপনা।
ঈশ্বরদী উপজেলার আনাচে-কানাচেও উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। রাশিয়ানদের চাহিদার কথা বিবেচনা করে নতুন করে চারটি রিসোর্ট, প্রায় ২০টি রেস্তোরাঁ, ১৫টি বেসরকারি হাসপাতাল, পাঁচটি মল তৈরি হয়েছে।
‘নতুন হাট’ এখন প্রতিদিনের বাজার
দিয়াড় সাহাপুরে ‘নতুন হাট’ নামের একটি হাটে সপ্তাহের রোববার ও বুধবার দুই দিনের হাট বসত। গ্রামের মানুষ এ হাটে তাদের উৎপাদিত ফল-ফসল বেচাকেনা করতেন। এখনও সেই হাট আছে, কিন্তু রূপান্তর হয়েছে হাটের। হাটের সামনে গ্রিন সিটিতে বসবাস করেন প্রায় ছয় হাজার রাশিয়ান নাগরিক। যারা রূপপুর প্রকল্পে কর্মরত। তাদের চাহিদার কারণে নতুন হাটে এখন প্রতিদিন বাজার বসে। শাকসবজি, ফল, মাছ-মাংস নিয়ে প্রতিদিন বসেন স্থানীয়রা। বাজারটির চারপাশে স্যালুন, রেস্তোরাঁ, সুপারশপ, ক্যাফে, ক্লাবসহ আধুনিক সব দোকানপাট।
বাজারের ব্যবসায়ী আজমল হোসেন বলেন, রাশিয়ানরা এখানে আসার পর থেকে বাজারের পরিধি বেড়েছে। এখন প্রতিদিনই বাজার বসছে। গ্রামের মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে থাকতে সাহাপুর-রূপপুরসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে রাশিয়ান ও বাংলাদেশিদের মধ্যে বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছে। অনেক রাশিয়ান দু-চারটি বাংলা কথাও রপ্ত করে ফেলেছেন। আবার গ্রামের এসব বাংলাদেশিরাও শিখেছেন রাশিয়ান ভাষা।
বাজারের সবজি বিক্রেতা জহুরুল আলম বলেন, ‘আমি লেখাপড়া জানি না; কিন্তু এখন সহজেই রাশিয়ানদের কাছে জিনিস বিক্রি করতে পারি। প্রথম প্রথম খুব সমস্যা হতো। রাশিয়ানদের কথা কিছুই বুঝতে পারতাম না।’
সূত্র: সমকাল