শিরোনাম
◈ মেঘালয়ের জলবিদ্যুৎ বাঁধ: বাংলাদেশের জন্য নতুন ‘মরণফাঁদ’ ◈ বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কে নতুন গতি: বিনিয়োগ ও জনশক্তি রফতানিতে জোর প্রধানমন্ত্রীর ◈ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কোন দেশ কবে উৎপাদন শুরু করে ◈ সংসদ সচিবালয় কমিশন বৈঠক: ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২৯০ কোটি ৬০ লাখ টাকার বাজেট অনুমোদন ◈ জুলাই সনদ উপেক্ষা করে সংস্কার প্রস্তাব ‘প্রতারণা’: আইন মন্ত্রী ◈ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের চিহ্নিত করে আগামী তিন মাস সহায়তা দেওয়া হব: প্রধানমন্ত্রী ◈ মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া করেছে: মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী ◈ টস করার সু‌যোগও পায়‌নি, টানা বৃষ্টিতে বা‌তিল বাংলা‌দেশ-‌নিউজিল‌্যা‌ন্ডের দ্বিতীয় টি-টো‌য়ে‌ন্টি ◈ পা‌কিস্তান সুপার লি‌গের ফাইনালে খেলতে না‌হিদ রানাকে অনু‌মো‌তি দি‌লো বি‌সি‌বি  ◈ খোলা ও বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বৃদ্ধি

প্রকাশিত : ২৯ এপ্রিল, ২০২৬, ০৯:১৩ রাত
আপডেট : ২৯ এপ্রিল, ২০২৬, ১০:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বিধান রায়ের ৩০ বছরের সংগ্রাম, বৃদ্ধ মাকে নিয়ে টোং ঘরে মানবেতর জীবন

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি : দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনপদ বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে মানবজীবনের এক হৃদয়স্পর্শী সংগ্রামের নাম দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বিধান চন্দ্র রায়। জন্ম থেকেই চোখে আলো নেই, জীবনের পথে ছিল না জমি, ছিল না ভিটেমাটি, ছিল না নিরাপদ আশ্রয়। তবুও থেমে নেই জীবনযুদ্ধ। গত তিন দশক ধরে বৃদ্ধ মাকে সঙ্গে নিয়ে রাস্তার পাশে সরকারি জায়গায় একটি টোং ঘরে কাটছে তার জীবন।

“জন্ম থেকে জলছি মাগো তোমার এই ভাঙা সংসারে”—এই কথাতেই যেন ফুটে ওঠে তার জীবনের সমস্ত বেদনা। দুঃখ যার সঙ্গী, তার আবার সুখ কোথায়! তবুও হাল ছাড়েননি বিধান। অভাব, অনিশ্চয়তা আর অন্ধকারকে সঙ্গী করেই লড়ে যাচ্ছেন প্রতিটি দিন।

মঙ্গলবার সরেজমিনে উপজেলার জিউধরা ইউনিয়নের পালেরখণ্ড গ্রামে গিয়ে জানা যায়, মৃত লক্ষীকান্ত রায়ের ছেলে বিধান চন্দ্র রায় (৬০) জন্ম থেকেই দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। পিতার কোনো পৈত্রিক ভিটেমাটি না থাকায় তিনি দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে রাস্তার পাশে সরকারি জায়গায় একটি ছোট টোং ঘর তৈরি করে বসবাস করছেন। তার সঙ্গী একমাত্র ৮৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ মা শান্তি রানী রায়।

মা-ছেলের এই ছোট সংসারে নেই কোনো বিলাসিতা, নেই স্বস্তি। টোং ঘরের সামনেই ছোট্ট দোকান সাজিয়ে শিশুদের জন্য চকলেট, বিস্কুটসহ কিছু ক্ষুদ্র পণ্য বিক্রি করেন বিধান। সেই সামান্য আয় দিয়েই কোনোমতে চলে দু’জনের সংসার। কোনো দিন দু’বেলা খাবার জোটে, আবার কোনো দিন অভুক্ত থেকেও কাটাতে হয় দিন।

চোখে দেখতে না পারলেও বিধানের মেধা ও অনুভূতির শক্তি বিস্ময়কর। হাতে টাকা নিয়ে স্পর্শেই বুঝে ফেলতে পারেন কত টাকার নোট। মানুষের মুখ না দেখেও অনুভব করেন তাদের কণ্ঠ, আচরণ ও মন। জীবনের কঠিন বাস্তবতাই যেন তাকে দিয়েছে অন্য এক দৃষ্টি।

বিধান চন্দ্র রায়ের জীবনের আরেকটি করুণ অধ্যায় তার মা। ছোটবেলায় মায়ের আঁচল ধরে বড় হওয়া সেই সন্তান আজও বৃদ্ধ মায়ের হাত ছাড়েননি। বয়সের ভারে ন্যুব্জ মা শান্তি রানী এখন নিজের চলাফেরাতেই কষ্ট পান, তবুও ছেলেকে আগলে রেখেছেন স্নেহে, মমতায়, সংগ্রামে। মা-ছেলের এই সম্পর্ক যেন দারিদ্র্যকেও হার মানায়।

স্থানীয়রা জানান, আগে টোং দোকানে কিছুটা বিক্রি হলেও এখন আর তেমন বেচাকেনা নেই। সংসার চালানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় সমাজসেবক আলী আমীন মানবিক সহায়তা হিসেবে প্রতি মাসে ২৫ কেজির এক বস্তা চাল দিয়ে আসছেন। সরকারি সহায়তা হিসেবে মা শান্তি রানী বয়স্ক ভাতা এবং বিধান প্রতিবন্ধী ভাতা পান। তবে তা দিয়ে নিত্যপ্রয়োজন মেটানো প্রায় অসম্ভব।

সম্প্রতি খাল খনন প্রকল্পের কাজ শুরু হলে যেখানে তারা বসবাস করতেন সেই টোং ঘরটি ভেঙে দেওয়া হয়। এরপর থেকে আরও অনিশ্চয়তায় পড়ে যায় পরিবারটি। স্থানীয়দের সহযোগিতায় পাশেই পলিথিন টানিয়ে অস্থায়ীভাবে রাত কাটাচ্ছেন মা-ছেলে। ঝড়, বৃষ্টি বা বন্যা এলে কোথায় যাবেন—এই আতঙ্কেই কাটছে প্রতিটি দিন।

বিধান রায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “বাবার কোনো ভিটা মাটি পাইনি। সরকারি জায়গায় ৩০ বছর ধরে এভাবেই থাকি। জন্ম থেকে যুদ্ধ করে দিন পার করছি। নিজের সুখের কথা ভাবি না। শুধু চাই, বৃদ্ধ মাকে নিয়ে যদি একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই পেতাম, তাহলে আর চিন্তা থাকত না।”

তার এই আকুতি শুধু একটি ঘর নয়, এটি নিরাপত্তার আবেদন, মর্যাদার আবেদন, শেষ বয়সে মায়ের মুখে একটু নিশ্চিন্ত হাসি দেখার আবেদন।

স্থানীয় গ্রামবাসীরা বলেন, ভূমিহীন এই পরিবারটির জন্য সরকারি অর্থায়নে একটি ঘর নির্মাণ এবং স্থায়ীভাবে বসবাসের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি। সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদেরও এগিয়ে আসা উচিত।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার হাবিবুল্লাহ বলেন, “জিউধরা ইউনিয়নে খাল খনন প্রকল্প চলমান থাকায় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বিধান রায়ের বসবাসকৃত ঘরটি সরানো হয়েছে বলে তথ্য পেয়েছি। আমরা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করছি।”

বিধান রায়ের গল্প কেবল একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ বাস্তবতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। যেখানে এখনো একজন সন্তান বৃদ্ধ মাকে নিয়ে তিন দশক ধরে টোং ঘরে থাকে, অথচ স্বপ্ন দেখে শুধু একটি ঘরের।

মানবিক রাষ্ট্র, মানবিক সমাজ এবং মানবিক মানুষের কাছে আজ প্রশ্ন—বিধান রায়ের মাথা গোঁজার ঠাঁই কি হবে না?

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়