শিরোনাম
◈ বজ্রপাতে মৃত্যু থামছেই না, আবারও ১৩ প্রাণহানি ◈ মেঘালয়ের জলবিদ্যুৎ বাঁধ: বাংলাদেশের জন্য নতুন ‘মরণফাঁদ’ ◈ বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কে নতুন গতি: বিনিয়োগ ও জনশক্তি রফতানিতে জোর প্রধানমন্ত্রীর ◈ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কোন দেশ কবে উৎপাদন শুরু করে ◈ সংসদ সচিবালয় কমিশন বৈঠক: ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২৯০ কোটি ৬০ লাখ টাকার বাজেট অনুমোদন ◈ জুলাই সনদ উপেক্ষা করে সংস্কার প্রস্তাব ‘প্রতারণা’: আইন মন্ত্রী ◈ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের চিহ্নিত করে আগামী তিন মাস সহায়তা দেওয়া হব: প্রধানমন্ত্রী ◈ মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া করেছে: মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী ◈ টস করার সু‌যোগও পায়‌নি, টানা বৃষ্টিতে বা‌তিল বাংলা‌দেশ-‌নিউজিল‌্যা‌ন্ডের দ্বিতীয় টি-টো‌য়ে‌ন্টি ◈ পা‌কিস্তান সুপার লি‌গের ফাইনালে খেলতে না‌হিদ রানাকে অনু‌মো‌তি দি‌লো বি‌সি‌বি 

প্রকাশিত : ২৯ এপ্রিল, ২০২৬, ০৯:১১ রাত
আপডেট : ২৯ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

লঘুচাপের প্রভাবে উত্তাল সাগর : স্থবির মোংলা বন্দর ও সুন্দরবন উপকূল টানা বর্ষণে দুর্ভোগে জনজীবন

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি : দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গর্ব, বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় জনপদে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও বৈশাখের মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বিরাজ করছে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া। মোংলা সমুদ্র বন্দরসহ উপকূলীয় এলাকায় গত দুদিন ধরে টানা মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ, দমকা হাওয়া ও নদী-সাগরের অস্বাভাবিক উত্তাল অবস্থায় জনজীবনে নেমে এসেছে স্থবিরতা।

একদিকে টানা বৃষ্টি, অন্যদিকে দমকা হাওয়ার তোড়ে উত্তাল হয়ে উঠেছে বঙ্গোপসাগর ও পশুর নদী। ফলে ব্যাহত হচ্ছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলার স্বাভাবিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম। বন্দরের হাড়বাড়িয়া ও ফেয়ারওয়ে এলাকায় অবস্থানরত বাণিজ্যিক জাহাজগুলো থেকে পণ্য খালাস, লাইটার জাহাজে স্থানান্তর এবং অভ্যন্তরীণ পরিবহন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, বৃষ্টির কারণে বিশেষ করে সার, কয়লা ও সিমেন্ট ক্লিংকারবাহী জাহাজের কার্যক্রম বারবার বন্ধ রাখতে হচ্ছে। খাদ্যশস্য ও সারবাহী কিছু জাহাজে পণ্য খালাস সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে। পণ্য ভিজে যাওয়ার আশঙ্কায় অনেক ক্ষেত্রে জাহাজ থেকে কার্গো জাহাজে লোডিং-আনলোডিং কার্যক্রমও থমকে যাচ্ছে। এতে সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়ছে, পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীরাও।

উপকূলীয় মৎস্যজীবীদের জীবনেও নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা। সুন্দরবন সংলগ্ন দুবলার চর, কানাইনগর, জয়মনি ও আশপাশের নদীপথের জেলেরা জানিয়েছেন, সাগর উত্তাল থাকায় এবং টানা ভারী বর্ষণের কারণে তারা নদী ও সাগরে জাল ফেলতে পারছেন না। ফলে প্রতিদিনের আয় বন্ধ হয়ে পড়েছে বহু জেলের। মাছ ধরতে না পারায় অনেকের সংসারে দেখা দিয়েছে খাদ্য ও অর্থসংকটের আশঙ্কা।

শুধু জেলেরাই নন, বননির্ভর মানুষের জীবনও বিপর্যস্ত। গোলপাতা আহরণকারী বাওয়ালি, মধু সংগ্রহকারী মৌয়াল এবং কাঠ-জ্বালানি সংগ্রহে নিয়োজিত শ্রমজীবী মানুষের কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় তারা বনে প্রবেশ করতে পারছেন না। এতে সুন্দরবন ঘিরে গড়ে ওঠা ক্ষুদ্র অর্থনীতিতেও ধাক্কা লেগেছে।

এদিকে টানা বৃষ্টিতে মোংলা পৌর শহরের নিম্নাঞ্চলগুলোতে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে সড়ক ও গলিপথে পানি জমে সাধারণ মানুষের চলাচল দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। স্কুলগামী শিক্ষার্থী, অফিসগামী কর্মজীবী মানুষ ও ব্যবসায়ীরা পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে। দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যানচালক ও খেটে খাওয়া মানুষ কাজের সন্ধানে বের হতে না পেরে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অল্প সময়ের বৃষ্টিতেই শহরের বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে যায়। এবার টানা বর্ষণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। অনেক বাড়ির আঙিনা ও নিচতলার কক্ষে পানি ঢোকার উপক্রম হয়েছে।

আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, উপকূলীয় এলাকায় ঝড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকায় মোংলা সমুদ্র বন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচলের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

মৎস্যচাষিরাও রয়েছেন দুশ্চিন্তায়। টানা বর্ষণ অব্যাহত থাকলে উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকার চিংড়ি ঘের তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। অতিরিক্ত বৃষ্টির পানিতে ঘেরের লবণাক্ততা কমে গেলে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় চাষিরা।

অন্যদিকে সুন্দরবন সংলগ্ন বেড়িবাঁধগুলোর স্থায়িত্ব নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। পশুর নদীর পানি স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ায় চরাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়া দুর্বল বাঁধগুলোতে চাপ বাড়লে নতুন করে ভাঙনের আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

মোংলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন আক্তার সুমী জানিয়েছেন, পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে। যেকোনো জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের উপপরিচালক মো. মাকরুজ্জামান বলেন, বন্দরের হাড়বাড়িয়া এলাকায় সার, কয়লা ও ক্লিংকারসহ বেশ কয়েকটি জাহাজ পণ্য খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে এলে বন্দরের কার্যক্রম আবারও পুরোদমে চালু করা হবে।

প্রকৃতির এই বৈরী রূপ আবারও মনে করিয়ে দিল—উপকূলীয় বাংলাদেশে আবহাওয়া শুধু ঋতুর পরিবর্তন নয়, এটি মানুষের জীবন-জীবিকা, অর্থনীতি এবং টিকে থাকার লড়াইয়েরও নাম। সুন্দরবন উপকূলের মানুষ এখন তাকিয়ে আছেন আকাশের দিকে—কবে থামবে বৃষ্টি, কবে শান্ত হবে সাগর, কবে ফিরবে স্বাভাবিক জীবন।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়