এম আর আমিন, চট্টগ্রাম : দীর্ঘদিনের নিয়োগ জটিলতার কারণে বাংলাদেশ রেলওয়ের নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি)-তে শূন্যপদের হার ৪৬ শতাংশে পৌঁছেছে। প্রয়োজনীয় জনবল সংকটে দেশের গুরুত্বপূর্ণ রেলপথ ও স্টেশনগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একদিকে জনবল সংকটে চরম ক্ষোভ-হতাশা ভর করেছে সদস্যদের কাঁধে। অন্যদিকে বেড়েই চলেছে দায়িত্ব।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, আরএনবির অনুমোদিত জনবল কাঠামোর বিপরীতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে।রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলে ১৩৫২ জন মঞ্জুরীকৃত পদের বিপরীতে আছে ৭৫৩ জন, ৫৯৯ টি পদ শুন্য।পূর্বাঞ্চলে ১৯৯২ জনের বিপরীতে কর্মরত আছে ১০৬১ শুন্য রয়েছে ৯৩১।
নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া বারবার আটকে যাওয়ায় সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। ফলে বিদ্যমান সদস্যদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে, যা তাদের কাজের মান ও মনোবলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এদিকে, ২০২২ সালে আরএনবি সদস্য নিয়োগের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিল রেলভবন। এর জন্য ২ অঞ্চলে ২টি নিয়োগ কমিটিও করা হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ নিয়োগবিধির অযুহাতে একটি কুচক্রীমহল সেই কার্যক্রম স্থগিত করে দেয়।
২০২০ সালের ৮ অক্টোবর মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আব্দুস সালাম স্বাক্ষরিত ডিজি বরাবরে এক পত্রে বলা হয়েছে, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী রিক্রুইটমেন্ট রুলস ১৯৮৫ অধীনে নিয়োগ/পদোন্নতি কার্যক্রম চলমান রাখার বিষয়ে লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ হতে মতামত প্রদান করা হয়েছে। লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের মতামত অনুসারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলা হয়েছে।
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় লজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের মতামতে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে, ”রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী অর্ডিন্যান্স ১৯৭৬” রহিত করে “রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী আইন, ২০১৬ প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে, ২০১৬ সালের ২ নং আইন দ্বারা অর্ডিন্যান্স রহিত করা হলেও এর অধীন প্রণীত বিধি উক্ত আইনের বিধানাবলীর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া সাপেক্ষে, রহিত বা সংশোধিত না হওয়া পর্যন্ত, বলবৎ থাকবে মর্মে উক্ত আইনের ধারা ২৩ এর উপ-ধারা (২) এর দফা (ঘ) তে বিধান রাখা হয়েছে। ফলে ১৯৭৬ সালের অর্ডিন্যান্স রহিত হলেও উক্ত বিধান মোতাবেক ”রেলওয়ে নিরাপত্তাবাহিনী রিক্রুইটমেন্ট ১৯৮৫” বলবৎ আছে এবং ২০১৬ সালের ২ নং আইনের বিধান সাপেক্ষে, উক্ত রুলস এর আওতায় কার্যক্রম পরিচালনা করতে আইনগত কোন বাধা নেই।
তবে পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে, সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে যাতে কোনো আইনী শূন্যতা তৈরী না হয় সেজন্য ২০১৬ সালের ২ নং আইনের ধারা ২৩ এর উপ-ধারা (২) এর দফা (ঘ) তে সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে রহিত অর্ডিন্যান্স এর অধীনে প্রণীত বিধিমালা বলবৎ রাখার জন্য উহাদেরকে হেফাজত করা হয়েছে। সেকারণে, রুলস ১৯৮৫ রহিত করে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে, যত দ্রুত সম্ভব, ২০১৬ সালের ২ নং আইনের অধীনে নতুন করে বিধিমালা প্রণয়ন করা সমীচীন।
গত ২০২০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর স্বাক্ষর করেছেন তৎকালীন আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক এমপি, লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সচিব মইনুল কবির (চ.দা.), যুগ্ন সচিব মো. রফিকুল হাসান, উপ সচিব এস এম সাফায়েত হোসেন ও ড্রাফটম্যান সৌমেন পালিত বাবু।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান সরকার রেলপথকে আধুনিক ভাবে ঢেলে সাজাতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কিন্তু যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর শূন্যপদগুলোতে দ্রুত নিয়োগ না দিলে বিদ্যমান ঝুঁকি থেকেই যাবে।প্রশাসনিক জটিলতা, নীতিমালার পরিবর্তন এবং বিভিন্ন পর্যায়ের দীর্ঘসূত্রতার কারণে সময়মতো নতুন সদস্য নিয়োগ সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে প্রতিদিন জনবল সংকটের কারণে যাত্রীবাহী ট্রেন ও স্টেশনগুলোতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যেখানে পর্যাপ্ত সংখ্যক সদস্য থাকার কথা, সেখানে সীমিত জনবল দিয়েই দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এতে চুরি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধ দমনে বেগ পেতে হচ্ছে আরএনবি সদস্যদের।
আরএনবির কয়েকজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দীর্ঘদিন ধরে একই জনবল দিয়ে অতিরিক্ত দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাবে অনেকেই শারীরিক ও মানসিক চাপে রয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে,রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীতে (আরএনবি) জনবল সংকটের বিষয়টি স্বীকার করেছেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম। তিনি বলেন, আরএনবি সদস্য নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনে (পিএসসি) পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে অনুমোদন পাওয়া গেলে পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করা হবে। আশা করা হচ্ছে, খুব শিগগিরই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে,রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর পূর্বাঞ্চলের চিফ কমান্ডেন্ট মো. জহিরুল ইসলাম এবং পশ্চিমাঞ্চলের চিফ কমান্ডেন্ট মো. আশাবুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে বাহিনীতে ৪৬ শতাংশেরও বেশি পদ শূন্য থাকায় দায়িত্ব পালন করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে যেখানে দায়িত্বে চারজন সদস্য প্রয়োজন, সেখানে অনেক ক্ষেত্রে দুইজনের বেশি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
রেলের বিশাল পরিধির কারণে সীমিত জনবল দিয়ে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সদস্যদের নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দ্রুত জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দরকার।
এ বিষয়ে রেলওয়ে শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক এম আর মনজু বলেন, আইন অনুযায়ী নিয়োগে কোন বাধা নেই।
রেলে যে পরিমান আরএনবি সদস্য আছে তা অনেক কম, কিন্তু কতিপয় অদক্ষ কর্মকর্তার গাফিলতির ফলে ২ বছরেও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এমনকি কমিটিও করতে পারেনি।
অপর একটি সূত্র জানায়, রেলের ডিজি আওয়ামী ফ্যাসিস্ট ঘরানার লোক, আওয়ামী লীগের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে পদ্মাসেতু প্রকল্পের পিডির দায়িত্ব পেয়েছিল। সেই প্রকল্পে পাথর কেলেঙ্কারি সহ নানা অনিয়মের মাধ্যমে রেলের বিপুল অর্থ লোপাট করার অভিযোগ আছে।
তিনি বর্তমানেও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্থবিরতা এনে রেলকে বেকায়দায় ফেলে আওয়ামী লীগের কোন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করছেন অনেকে।