ফারুকুজ্জামান, কিশোরগঞ্জ : কিশোরগঞ্জের হাওরে বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। যদিও এক সপ্তাহ পর থেকে পুরোদমে ধান কাটা ও মাড়াই শুরু হবে। তখন কৃষকদের মনে উৎসব বইবে। তবে যারা বিএডিসি (বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন) থেকে বীজ এনে ব্রি-ধান ৮৮ জাত চাষ করেছিলেন, তারা পড়েছেন দুশ্চিন্তায়। তাদের ক্ষেতে এক জাতের ধান হয়নি। নানা জাতের ধান দেখা যাচ্ছে। বাকি ধানগুলো চার-পাঁচ জাতের হইছে।
বড়হাওরের কৃযক আলী হোসেন বলেন,আমার ক্ষেতের ধান কুনুডা পাইক্যা গেছে, কুনুডার হগলে দুধ আইছে। কুনুডার শীষ অহনও কাঁচা। অহন আমি ধান ক্যামনে কাটবাম। কোনডা কাডবাম। পাকনাডা কাটলে কাচাড়া কাডন যাইতো না। ধারকর্জ কইরা চাষ করছি। কমপক্ষে ৪০০ মণ ধান অইলোঅইলে। অহন ১০০ মণ ফাইয়াম কি-না সন্দেহ। অহন আমার এ ক্ষতিপূরণ কেলা দিবো। হাওর ঘুরে দেখা যায়,
কোনোটা পেকে গেছে, কোনোটা আধাপাকা, আবার কোনোটিতে শীষই বের হয়নি। একই গুচ্ছে কয়েক ধরনের ধান। এ অবস্থায় কীভাবে ধান কাটবেন ভেবে পাচ্ছেন না কৃষক। পাকা ধান কাটার চেষ্টা করলে নষ্ট হবে আধাপাকা ধান। আবার আধাপাকার জন্য অপেক্ষা করলে ঝরে যাবে পাকাগুলো। জেলার করিমগঞ্জ, তাড়াইল, ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও বাজিতপুরের হাওরে ব্রি-ধান ৮৮ চাষে দেখা দিয়েছে এমন অস্বাভাবিকতা। বেশি দেখা দিয়েছে করিমগঞ্জ ও ইটনা উপজেলায়। করিমগঞ্জের বড় হাওরসহ কয়েকটি হাওরে ভয়াবহ অবস্থা। সেখানে কৃষকরা রীতিমতো কাঁদছেন। আরো কিছু এলাকা থেকেও এমন খবর আসছে। তবে সেখানকার অবস্থা এমন শোচনীয় নয়। এ অবস্থায় কৃষকরা তাদের ফসল একসঙ্গে কাটতে পারবে না। ঘরে তুলতে পারবে না ফসল। কৃষকদের অভিযোগ বিএডিসি'র সরবরাহ করা ব্রি-ধান ৮৮- এর বীজে মিশ্রণের কারণে তাঁরা এরকম ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। গত রবিবার জেলার করিমগঞ্জের বড়হাওরে সরেজমিন গিয়ে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। দুপুরে কড়া রোদের মধ্যে নিজের ক্ষেতের পাশে বসে চিন্তায় মগ্ন ছিলেন গুণধর ইউনিয়নের মদন গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান। তিনি বললেন, '১৩ কানি (৩৫ শতাংশে কানি) জমিত বিএডিসির ৮৮ ধান করছিলাম। ধানতো শুরুতে চিনন যায় না। অহন আমার ক্ষেতো অর্ধেকেও ৮৮ধান।
গ্রামের কৃষক ওমর সিদ্দিক তিনি জানান, ১৫ বিঘা জমিতে ব্রি-ধান ৮৮ চাষ করেছেন। এটি কৃষি বিভাগের প্রদর্শনী ক্ষেত। সীড ভিলেজ প্রদর্শনী। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর 'ফ্লাড রিকন্সট্রাকশন ইমারজেন্সি অ্যাসিস্টেন্স প্রজেক্ট (ফ্রিপ)'-এর আওতায় তাকে এ প্রদর্শনী ক্ষেত করতে দেয়। বীজধান সরবরাহ করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এখানেও একই অবস্থা। এ ক্ষেতে বিভিন্ন জাতের ধান হয়েছে। অর্ধেক ধানও তিনি বাড়িতে নিয়ে যেতে পারবেন না বলে জানান। বড় হাওরে বোরো আবাদ করা কৃষক মদন গ্রামের আক্তার মিয়া (৬৫) ও জমির উদ্দিনেরও (৫৫) একই অভিযোগ। তারা জানান, যারা ব্রি-ধান ৮৮ চাষ করেছেন, সবার ক্ষেতেই মিশ্রণ ঢুকে গেছে। ফলে প্রায় সব্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। যারা ঋণ করে চাষাবাদ করেছেন, তাদের পথে বসতে হবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ব্রি-ধান ৮৮ আবাদ হয়েছে ১৮ হাজার ৫৬০ হেক্টর জমিতে। করিমগঞ্জের বড় হাওরসহ কয়েকটি হাওর এবং ইটনা উপজেলায় এ জাতের ধানে অস্বাভাবিকতা দেখা গেছে। কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মো. সাদিকুর রহমান বলেন, মাঠ পর্যায়ে অভিযোগ পাওয়ার পর কৃষি কর্মকর্তাদের পাঠিয়ে বিষয়টি যাচাই করা হয়েছে।
তারা বীজে মিশ্রণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত জমি ও কৃষকের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং বিষয়টি বিএডিসিকে অবহিত করা হয়েছে। তবে এ সমস্যার কারণে সামগ্রিক বোরো উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব না পড়লেও ব্যক্তি পর্যায়ে অনেক কৃষক ক্ষতির মুখে পড়বেন বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। বিএডিসি (বীজ বিপনন) বলছে, বোরোচাষের জন্য মৌসুমের শুরুতে এবার প্রায় ৩৭০ মেট্রিক টন ব্রি-ধান ৮৮ জাতের বীজ সরবরাহ করেছে তারা। পরে আরো ৩১৮ মেট্রিক টন বীজ সরবরাহ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিভিন্ন উৎস থেকে তাদের কাছে বীজ আসে। অভিযোগ পাওয়ার পর ঠিক কোথায় সমস্যাটি হয়েছে, কোথা থেকে এ বীজ এলো-তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
কিশোরগঞ্জ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) উপ-পরিচালক (বীজ বিপনন) মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন বলেন, আমরাও মাঠ পর্যায়ে গিয়ে এমন কিছু সমস্যা দেখতে পেয়েছি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আমরা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি কোথা থেকে এমন বীজ কৃষকদের হাতে গেল। কোনো ডিলার যদি কৃষকদের বিএডিসির প্যাকেটে নকল বীজ দিয়ে থাকে আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব। আর আমাদের নিজস্ব কোনো উৎস থেকে, বিশেষ করে বিএডিসি যেসব জায়গা থেকে বীজ আনে সেসব জায়গা থেকে যদি এমন বীজ এসে থাকে তাহলে আমরা এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেব।