এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি: জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলা। তেল না পাওয়ায় পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত শত শত লাইটার জাহাজ অলস বসে থাকায় বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে পণ্য খালাস ব্যাহত হচ্ছে। এতে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে এবং আমদানিকারক ও শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লাইটার জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বহির্নোঙরে অবস্থানরত মাদার ভেসেল থেকে খাদ্যশস্য, সার ও শিল্পকারখানার কাঁচামাল খালাস প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে জাহাজগুলোর নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত অবস্থান (টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম) বেড়ে যাচ্ছে এবং অতিরিক্ত ডেমারেজ চার্জ গুনতে হচ্ছে আমদানিকারকদের।
লাইটার জাহাজ মালিকদের অভিযোগ, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পর থেকেই চট্টগ্রামের ডিপোগুলো থেকে প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল পাওয়া যাচ্ছে না। রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পদ্মা, যমুনা ও মেঘনা পেট্রোলিয়াম থেকে সীমিত পরিমাণ তেল সরবরাহ করা হচ্ছে, যা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। সংকট নিরসনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার আবেদন জানানো হলেও এখনো কার্যকর সমাধান মেলেনি বলে দাবি তাদের।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, মোংলা বন্দরের পশুর নদীতে গত কয়েকদিন ধরে শত শত খালি লাইটার জাহাজ আটকে আছে। একই অবস্থা খুলনা-রূপসা এলাকার চার ও পাঁচ নম্বর ঘাটেও। জ্বালানি সংকটে এসব জাহাজ চলাচল করতে না পারায় মাদার ভেসেল থেকে পণ্য স্থানান্তর প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
এমভি আর রশিদ-১ লাইটার জাহাজের মাস্টার মোহাম্মদ রেজাউল ইসলাম বলেন, “জ্বালানি তেল না পাওয়ায় বন্দরে আসা বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করতে যেতে পারছি না। এক সপ্তাহ ধরে পশুর নদীতে জাহাজ নিয়ে অপেক্ষা করছি, কিন্তু তেল মিলছে না।”
এমভি মিমতাজ লাইটার জাহাজের মালিক মো. খোকন জানান, মোংলা বাজারের তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এসকে এন্টারপ্রাইজ ডিপো থেকে পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় জাহাজে সরবরাহ করতে পারছে না। একই পরিস্থিতির মুখে পড়েছে প্রায় সব লাইটার জাহাজ।
জ্বালানি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিল্প উৎপাদনেও। রূপসা এলাকায় সেভেন সার্কেল সিমেন্ট কারখানার উৎপাদন বিভাগের কর্মকর্তা মো. মামুন বলেন, “লাইটার জাহাজ সংকটের কারণে কাঁচামাল খালাস করতে পারছি না। প্রতিদিন বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য প্রায় ১৭ হাজার মার্কিন ডলার অতিরিক্ত মাশুল গুনতে হচ্ছে। কারখানায় কাঁচামালের সংকট দেখা দিয়েছে।”
শেখ সিমেন্ট কারখানার এজিএম আজাদুল হক জানান, কাঁচামাল বন্দরে পৌঁছালেও লাইটার জাহাজ না থাকায় তা কারখানায় আনা যাচ্ছে না। ফলে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে এবং শ্রমিকরা কর্মহীন অবস্থায় রয়েছেন।
মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের মোংলার মেরিন ডিলার নুরু অ্যান্ড সন্সের মালিক এইচ এম দুলাল বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প বৃদ্ধি ও বাণিজ্যিক জাহাজের সংখ্যা বাড়ায় জ্বালানির চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু ডিপো থেকে প্রয়োজনীয় সরবরাহ না পাওয়ায় তারা জাহাজে তেল দিতে পারছেন না।
এ বিষয়ে মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের মোংলার ম্যানেজার (অপারেশনস) প্রকৌশলী প্রবীর হীরা বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সীমিত পরিসরে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাবে জ্বালানির প্রাপ্যতা কম থাকায় চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত জ্বালানি সংকট সমাধান না হলে মোংলা বন্দরের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে এবং এর প্রভাব দেশের শিল্প উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থায়ও পড়তে পারে।