শিরোনাম
◈ জামায়াতের বিরোধিতা করতে বিএন‌পি নির্বাচনী প্রচারণায় মুক্তিযুদ্ধকেই কেন সামনে আনছে? ◈ বিশ্বকাপের আগে একাধিক পরিবর্তন ক্রিকেটের নিয়মে ◈ ক্যান্টনমেন্টে ব্যক্তিগত অস্ত্র বা গানম্যান নেওয়ার বিধান কী? ◈ মধ্যরাতে তিন গ্রামের সংঘর্ষ, আহত পুলিশসহ ১৫ ◈ চট্টগ্রাম বন্দর বন্ধে রপ্তানি সংকট: কর্মবিরতিতে আটকা ১৩ হাজার কনটেইনার, ঝুঁকিতে ৬৬ কোটি ডলারের বাণিজ্য ◈ আওয়ামী লীগ দুর্গের ২৮ আসন এবার বিএনপির জয়ের পাল্লা ভারী ◈ নিউক্যাসলকে হারিয়ে ম্যানচেস্টার সিটি লিগ কা‌পের ফাইনালে ◈ অ‌স্ট্রেলিয়ান প‌্যাট কা‌মিন্স বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্ট দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার আশায় ◈ ‘খেলার মাঠে রাজনীতি নয়’: বাংলাদেশের পক্ষে সংহতি জানিয়ে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কট করেছি : পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ◈ নাইজেরিয়ায় বন্দুকধারীদের তাণ্ডব: এক গ্রামেই ১৬২ জনকে হত্যা, পুড়িয়ে দেওয়া হলো রাজপ্রাসাদ

প্রকাশিত : ০৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ০৭:২৫ সকাল
আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১১:৪৯ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

চীনে প্রশিক্ষণ নিয়েও চট্টগ্রাম মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে নার্সের বদলে ওয়ার্ডবয়–আয়ার হাতে পোড়া রোগীর ড্রেসিং

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ৩৬ নম্বর বার্ন ইউনিটে প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ জন অগ্নিদগ্ধ রোগী ভর্তি হন। এর মধ্যে চার থেকে পাঁচজন শিশু। অথচ চীনে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরেও আগুনে পোড়া রোগীদের ড্রেসিং ও সেবা দিতে অনীহা দেখাচ্ছেন কর্তব্যরত নার্সরা। সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বার্ন ইউনিটে দগ্ধ রোগীদের ক্ষত পরিষ্কার ও ড্রেসিংয়ের কাজে হাত লাগান না নার্সরা। তাদের বদলে ওয়ার্ডবয়, আয়া, সুইপার ও অবৈতনিক কর্মীরা ড্রেসিং করছেন। এতে রোগীদের ক্ষতস্থানে দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।

প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরেও কাজে অনীহা
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের চিকিৎসক ও নার্সরা নিয়মিত চীনের ইউনান প্রদেশের কুনমিং শহরে ‘ট্রেনিং কোর্স অন বার্ন উন্ড রিপেয়ার স্কিলস ফর বাংলাদেশ’ বা ‘বাংলাদেশের জন্য দগ্ধ ক্ষত মেরামতের দক্ষতা’ বিষয়ক প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশ নেন। আগুনে পোড়া রোগীদের ড্রেসিং ও চিকিৎসা হাতে-কলমে শেখানোর উদ্দেশ্যেই চীন সরকার এ প্রশিক্ষণের আয়োজন করে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পাঁচজন চিকিৎসক, চারজন নার্স ও আরও তিনজন কর্মী ১৫ দিনের প্রশিক্ষণে অংশ নেন। ২০২৪ সালে যান পাঁচজন নার্স ও দুইজন চিকিৎসক।

বার্ন ইউনিটের বিভাগীয় প্রধান ডা. মোহাম্মদ এস খালেদ বলেন, আগুনে পোড়া রোগীর ড্রেসিং ও চিকিৎসা শেখানোর জন্যই এই প্রশিক্ষণ। প্রতিবছরই নার্সদের পাঠানো হয়। কিন্তু প্রশিক্ষণ শেষে তারা রোগীকে ড্রেসিং তো করেনই না, অনেক সময় রোগী ছুঁয়েও দেখেন না।

ওয়ার্ডবয় ও আয়াদের হাতে ড্রেসিং
বার্ন ইউনিটে রোগীদের ড্রেসিং করেন যারা, তাদের একজন ওয়ার্ডবয় সমর। তিনি বলেন, তারাই রোগীদের ড্রেসিং করেন এবং ওয়ার্ড থেকেই কাজ শেখানো হয়েছে। তারা সরকারি বেতনভুক্ত নন। ড্রেসিংয়ের পর রোগীর স্বজনরা খুশি হয়ে যা দেন, সেটাই নেন। ওষুধের জন্য রোগীর স্বজনদের রিকুইজিশনও দেন তারা।

তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, ড্রেসিংয়ের পর অনেক ক্ষেত্রে রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে জোর করেই টাকা আদায় করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী ড্রেসিং করার কথা চিকিৎসক ও নার্সদের। অদক্ষ হাতে ড্রেসিং হলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। বার্ন ওয়ার্ডের রোগীরা সংবেদনশীল হওয়ায় তাদের বিশেষ যত্ন প্রয়োজন।

সংক্রমণ ও জটিলতার ঝুঁকি
এ বিষয়ে ডা. মোহাম্মদ এস খালেদ বলেন, বিষয়টি প্রশাসনিক। এ নিয়ে মন্তব্য পরিচালক করতে পারবেন। তিনি জানান, বার্ন পরবর্তী রোগীদের আরলি ও ডিলে দুই ধরনের জটিলতা হয়।

‘আরলি’ জটিলতায় সেপসিস, শ্বাসনালী পুড়ে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, কিডনি ড্যামেজ, শকে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট ঠিক না হলে রোগী শকে চলে যায়। অ্যাকিউট রেসপিরেটরি ডিসট্রেস সিনড্রোম হলে ফুসফুসে তরল জমে রক্তে অক্সিজেন পৌঁছানো কমে যায়, তখন আইসিইউ সাপোর্ট লাগে।

অন্যদিকে ‘ডিলে’ জটিলতায় হাত-পা বেঁকে যাওয়া, কন্ট্রাকচার বা পেশী শক্ত হয়ে যাওয়া দেখা দেয়। অনেক রোগীর ক্ষত দীর্ঘদিন শুকায় না, সামাজিকভাবে মিশতে সমস্যা হয় এবং মানসিক চাপ বাড়ে। এসব ক্ষেত্রে প্লাস্টিক সার্জারির প্রয়োজন হয়।

ডা. খালেদ বলেন, প্রাথমিক অবস্থায় দক্ষ হাতে ড্রেসিং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অদক্ষ হাতে ড্রেসিং হলে সংক্রমণ বাড়ে এবং চিকিৎসা জটিল হয়ে পড়ে। নার্সরা ড্রেসিং করলে এই সমস্যা হতো না। তারা না করলেও অন্তত রোগীর পাশে থাকা উচিত।

রোগীর চাপ, জনবল সংকট
ওয়ার্ড সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পোড়াজনিত কারণে ভর্তি রোগী ছিলেন ১ হাজার ৪৪২ জন। বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩ হাজার ৫৭০ জন। ভর্তি না হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ১ হাজার ৪০২ জন। একই বছরে পোড়াজনিত রোগীর মৃত্যু হয়েছে ১২৩ জনের। ঢাকায় পাঠানো হয়েছে ৫৮ জনকে।

বর্তমানে বিভাগীয় প্রধান একজন, সহযোগী অধ্যাপক একজন, সহকারী অধ্যাপক একজন, সহকারী রেজিস্টার তিনজন ও ইন্টার্ন চিকিৎসক দুজন দায়িত্বে রয়েছেন। নার্স আছেন ১৪ জন, তিন শিফটে।

২৭ জানুয়ারি ৩৬ নম্বর বার্ন ইউনিটে ভর্তি রোগী ছিলেন ৫১ জন। সকালের শিফটে বেশি নার্স থাকলেও ড্রেসিং রুমে গিয়ে দেখা গেছে, কোনো নার্স ড্রেসিং করতে আসেন না। সকালের শিফটে সমর ও বিকেলে জহির রোগীদের ড্রেসিং করেন। তাঁদের সঙ্গে আরও দুই থেকে তিনজন থাকেন। নারী রোগীদের ড্রেসিং করেন আয়ারা।

ওয়ার্ডে আয়া আছেন তিনজন। বিকেলের শিফটে থাকা রিনা আক্তার সাত মাস আগে আত্মীয়ের মাধ্যমে এখানে কাজ নেন। তিনি অবৈতনিক। প্রতিটি ড্রেসিংয়ের জন্য ওয়ার্ডবয় ও আয়া রোগীর কাছ থেকে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা নেন বলে জানা গেছে।

নার্সরা কেন ড্রেসিং করেন না, জানতে চাইলে কর্তব্যরত ব্রাদার পলাশ বলেন, সময় নেই। নিজের কাজ সামলাতেই হিমশিম খেতে হয়।

রোগীদের অভিযোগ
রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্যাস্ট্রিক ও জ্বরের ওষুধ ছাড়া অন্য ওষুধ তারা পান না। ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন শোভা বলেন, ভর্তি হওয়ার পর থেকে শুধু গ্যাস্ট্রিক ও জ্বরের ওষুধ পেয়েছেন। স্যালাইনসহ বাকি সব ওষুধ ভাইকে বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়েছে।

প্রতিদিন বাড়ছে দগ্ধ রোগী
ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, সিলিন্ডার বিস্ফোরণ, গরম পানি পড়ে যাওয়া ও দুর্ঘটনায় দগ্ধ রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। দক্ষিণ রাউজানের গহিরার বাসিন্দা মো. সৈকত (২০) রেস্টুরেন্টে কাজ করতেন। রেস্টুরেন্টের সেফটি ট্যাংক বিস্ফোরণে গত ২৪ জানুয়ারি তিনি অগ্নিদগ্ধ হন। বিস্ফোরণে তাঁর পুরো শরীর ঝলসে গেছে।

সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ডের বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম (২২) কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ভর্তি হন। উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মামুনুর রশিদ (৩৫) অফিসে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দগ্ধ হন। ফেনীর ফুলগাজীর ইয়াকুব চৌধুরী (৩১) সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আহত হন।

১৪ মাস বয়সী আলভি গরম তরকারির হাঁড়িতে পড়ে দগ্ধ হয়। তার বাবা মামুনুর রশিদ বলেন, সোমবার (২৬ জানুয়ারি) দুপুর সাড়ে তিনটার দিকে খাটের নিচে রাখা তরকারিতে পড়ে গিয়ে শিশুটির শরীর ঝলসে যায়। অন্যদিকে তিন বছর বয়সী জান্নাত চুলার পাশে খেলতে গিয়ে জামায় আগুন ধরে গেলে দগ্ধ হয়।

যা বললেন পরিচালক
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দীন বলেন, ‘নার্সদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়ে চীন থেকে আনা হয়েছে। এরপরও কেন তারা ড্রেসিং করবেন না, তা খতিয়ে দেখা হবে। বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়