চট্টগ্রাম বন্দরে আসা পণ্যের ৮০ শতাংশই খালাস হয় বহির্নোঙরে। এখানে খালাস করা পণ্য লাইটার জাহাজে করে নৌপথে চলে যায় দেশের ৫৬টি ঘাটে। বছরে এভাবে প্রায় পাঁচ কোটি টনেরও বেশি পণ্য খালাস করা হয় বহির্নোঙরে। এসব পণ্য পরিবহনে সচল আছে প্রায় ১ হাজার ২০টি লাইটার জাহাজ। বিপুলসংখ্যক জাহাজ নৌপথে চলাচল করলেও এই সেক্টরে এক দশক ধরে বিরাজ করছে নানা অসেন্তাষ। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সিরিয়াল দেওয়া, লাইটারকে গুদাম হিসেবে মাসের পর মাস ব্যবহার করা, সেক্টরের নিয়ন্ত্রণ নিতে একাধিক সংগঠনের মুখোমুখি অবস্থান ও শ্রমিক অসেন্তাষ নিত্যদিনের চিত্র ছিল দীর্ঘদিন ধরে। এসব সমস্যা দূর করতে ‘লাইটার ভেসেল ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার’ চালু করেছে বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি)।
এ সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে লাইটার জাহাজের সিরিয়াল ও বরাদ্দ ব্যবস্থা পুরোপুরি অটোমেশনের আওতায় আনা হচ্ছে। পরবর্তী ধাপে পাইলটিং, ড্যামারেজ সেটেলমেন্টসহ অন্যান্য জটিল বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে জানিয়েছে বিডব্লিউটিসিসি। গত শুক্রবার বিডব্লিউটিসিসির কার্যালয়ে সফটওয়্যারটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন অধিদপ্তরের চিফ ইঞ্জিনিয়ার ও শিপ সার্ভেয়ার মির্জা সাইফুর রহমান।
অনুষ্ঠানে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও বিডব্লিউটিসিসির সভাপতি কমডোর মো. শফিউল বারী বলেন, দেশের সমুদ্রবন্দরগুলোয় মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসে লাইটার জাহাজের সিরিয়াল ও বরাদ্দ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ ছিল। সম্পূর্ণ ম্যানুয়াল পদ্ধতির কারণে সিরিয়াল বাণিজ্য, বিলম্ব এবং স্বচ্ছতার অভাব তৈরি হচ্ছিল। এসব সমস্যার সমাধান ও লাইটার জাহাজ ব্যবস্থাপনায় গতিশীলতা আনতেই এ সফটওয়্যার চালু করা হয়েছে। এ সফটওয়্যার জাহাজ মালিক, আমদানিকারক ও এজেন্টদের দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট দূর করবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর ছাড়াও দেশের নৌপথে লাইটার জাহাজ চলাচল করে দেশের ৫৬টি ঘাটে। এর মধ্যে আছে– বাঘাবাড়ী, নারায়ণগঞ্জ, আলীগঞ্জ, নিতাইগঞ্জ, এমআই সিমেন্ট ঘাট, সিদ্ধিরগঞ্জ, শিকারপুর, মিরপুর, ধর্মগঞ্জে লাফার্জ এসকো ঘাট, ধাপা ঘাট, আনোয়ার সিমেন্ট ঘাট, মেঘনা ঘাট, সেভেন সার্কেল মাদ্রাসা ঘাট, শাহ সিমেন্ট ঘাট, পায়রা বন্দর, পাগলা ঘাট, এহসান সিমেন্ট ঘাট, ভৈরব, ঝালকাঠি, খুলনার মোংলা ঘাট, নোয়াপাড়া, বরিশাল, ইটিএ ঘাট, রামপাল, ফরিদপুর সিঅ্যান্ডবি ঘাট, আকিজ সিমেন্ট ঘাট, শিরমনি, মাওয়া ঘাট, স্ক্যান সিমেন্ট ঘাট, কাঞ্চন ঘাট, সিটি গ্রুপ ঘাট, দেশবন্ধু ঘাট, হোলসিম মেঘনা ঘাট, ঘোড়াশাল, অলিম্পিক সিমেন্ট ঘাট, বেঙ্গল টাইগার ঘাট, আমান কাঞ্চন ঘাট, পিরোজপুর, মোক্তাপুর, পলাশ ঘাট, মেট্রো সিমেন্ট ঘাট, সিয়াম সিটি ঘাট, মীর সিমেন্ট ঘাট ও পটুয়াখালী ঘাট। এসব ঘাটে লাইটারেজ জাহাজে করে পরিবহন করা হয় চিনির কাঁচামাল, গম, ডাল, পাথর, লাইমস্টোন, ড্যাপ, ইউরিয়া, কাদামাটি, গম, ভুট্টা, লাইমস্টোন, পাথরসহ অন্তত ২০-৩০টি আইটেম। কর্ণফুলী নদীর নাব্য সমস্যার কারণে বন্দরের বহির্নোঙরে আসা বিদেশি জাহাজকে লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে কিছু পণ্য খালাস করে বন্দরের জেটিতে নোঙর করে। বছরে এভাবে প্রায় পাঁচ কোটি টনেরও বেশি পণ্য খালাস করা হয় বহির্নোঙরে। নতুন সফটওয়্যার এসব ঘাটে শৃঙ্খলা ফেরাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই সফটওয়্যারের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে– জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তির মাধ্যমে ‘আগে আসলে আগে পাবেন’ ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয় সিরিয়াল নিশ্চিতকরণ, রিয়েল-টাইম বার্থিং লিস্ট, মাঝসমুদ্রে দুর্ঘটনার জন্য এসওএস অ্যালার্ট, জাহাজ ও স্টাফ প্রোফাইল সংরক্ষণ, দৈনিক অপারেশনাল স্ট্যাটাস ও আবহাওয়া বার্তা, ডিজিটাল ড্যামারেজ সেটেলমেন্ট ও স্মার্ট কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনা।
সফটওয়্যারটি উন্নয়নে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছে দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন খাতের প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান জাহাজী লিমিটেড। প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে সফটওয়্যারটি তৈরি করা হয়েছে। সূত্র: সমকাল