শিরোনাম
◈ নতুন-পুরনো সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা: এনআইডি ব্লকের প্রস্তুতি, নতুন তালিকা হচ্ছে, নজরদারিতে স্বজনরাও ◈ বিদ্যুৎ দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে আজ সারা দেশে জামায়াতের বিক্ষোভ ◈ বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ডিসেম্বরে নিউজিল্যান্ড সফ‌রে যাচ্ছে ◈ লিও‌নেল মে‌সি স্পেনের মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার জিতলেন, বা‌র্সেলোনার অভিনন্দন ◈ রামিসা ধর্ষণ-হত্যা মামলা: যুক্তিতর্ক শুনানি আজ ◈ মমতার বিস্ফোরক মন্তব্যেও নীরব দিল্লি, বক্তব্য নেই বিজেপির ◈ মরুভূমির দেশ হয়েও কেন বালু আমদানি করে সৌদি আরব? ◈ মাত্র ১৭০ টাকায় অনলাইনে এনআইডি বিক্রি! ◈ বাড়তি মার্কিন শুল্ক কার্যকর হলে রপ্তানিতে বড় ধাক্কার আশঙ্কা ◈ শেখ হাসিনার পক্ষের দাবি নাকচ, জুলাই অভ্যুত্থান প্রতিবেদনের পাশে জাতিসংঘ

প্রকাশিত : ২৮ অক্টোবর, ২০২৫, ০৭:১৫ বিকাল
আপডেট : ২৫ মে, ২০২৬, ০৮:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ফরিদপুরের বেদে সম্প্রদায়ের কষ্টেভরা বৈচিত্র্যময় জীবন, সুখ যেন অধরা

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর প্রতিনিধি: 'বাবু সেলাম বারে বার
আমার নাম গয়া বাইদ্যা, বাবু
বাড়ি পদ্মা পার।’

পল্লীকবি জসিমউদ্দীনের লেখা এই গানের মতো, অনেক চলচ্চিত্রেও বেদেদের বিচিত্র জীবনের গল্প দেখা যায়। তারা ছোট ছোট নৌকায় করে এক ঘাট থেকে আরেক ঘাটে ভেসে বেড়াতো। নদীর পাশে অস্থায়ী বসতি গড়ে তারা লোকজ চিকিৎসা, যেমন দাঁতের পোক বের করা বা শিঙ্গার সাহায্যে বাতের ব্যথা দূর করা, এবং সাপের খেলা দেখিয়ে জীবিকা নির্বাহ করত।

এক সময়ের যাযাবর বেদে সম্প্রদায় এখন ফরিদপুর শহরতলীর মুন্সিবাজারের মতো বিভিন্ন স্থানে স্থায়ী বসতি গড়ে তুলেছে। জীবিকার তাগিদে তাদের ঐতিহ্যবাহী পেশা বদলে গেছে এবং তারা এখন হয়রানিমূলক ভিক্ষাবৃত্তির আশ্রয় নিয়েছে। এই সামাজিক অবক্ষয় রোধে সাধারণ মানুষ শিক্ষার অভাবকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছে।

'মানুষ মানুষের জন্য' নামক একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বেদে শিশুদের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছে, আর ফরিদপুর সদর উপজেলার ইউএনও জন্ম নিবন্ধন ও নাগরিকত্ব পেতে তাদের সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। 

তবে সময়ের সাথে তাদের জীবনযাত্রায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। এখন বেদে পরিবারগুলো দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থায়ী বসতি গড়ে তুলছে। তেমনই একটি উদাহরণ হলো ফরিদপুরের মুন্সিবাজার এলাকা, যেখানে একটি বেদে পল্লী গড়ে উঠেছে। মাত্র চার বছর আগেও এখানে হাতে গোনা কয়েকটি ঝুপড়ি থাকলেও, বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৫৫টিতে দাঁড়িয়েছে।

এই স্থায়ী নিবাস গড়ার কারণে তাদের চিরাচরিত পেশা এখন আর তাদের প্রধান জীবিকা নয়। পুরুষ সদস্যরা এখন প্রায়শই বেকার থাকে, আর নারীরা শিশুদের নিয়ে শহরের পথে পথে এক ভিন্ন ধরনের ভিক্ষাবৃত্তির আশ্রয় নিয়েছে। তারা সরাসরি হাত পেতে ভিক্ষা না করে, পথচারীদের হয়রানি করে টাকা আদায় করে, যা সাধারণ মানুষের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে। এভাবে, একসময়ের ঐতিহ্যবাহী পেশার ধারক এই সম্প্রদায়টি এখন দারিদ্র্য ও সামাজিক প্রান্তিকতার এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে।

সাধারণ পথচারীদের মতে, বেদেদের বর্তমান হয়রানিমূলক ভিক্ষাবৃত্তির প্রধান কারণ হলো শিক্ষার অভাব। তারা মনে করেন, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন এবং নাগরিক সুবিধা বঞ্চিত এই সম্প্রদায়ের অবক্ষয় রোধে সরকারের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। পথচারীরা বিশ্বাস করেন যে, নতুন প্রজন্মকে শিক্ষিত করতে পারলে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব।

ফরিদপুরের কুমার নদের তীরে মুন্সিবাজারে বসবাসকারী বেদে পল্লীর প্রায় ৩০০ মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছে। মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় অনেকেই ভিক্ষাবৃত্তি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এখানকার শিশুরা শৈশব থেকেই মাদকাসক্ত এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। অধিকাংশ শিশুই অসুস্থ, এমনকি পোলিও টিকাও পায়নি। 

শিশুদের আচরণও কিছুটা অস্বাভাবিক, অনেকের মধ্যে মানসিক প্রতিবন্ধিতার লক্ষণ দেখা যায়। এমন করুণ পরিস্থিতিতে 'মানুষ মানুষের জন্য' নামক একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং 'প্রজন্মের আলো' নামে একটি স্কুল স্থাপন করেছে। এই স্কুলটি বেদে শিশুদের শুধু অক্ষরজ্ঞানই নয়, বরং একটি সুস্থ ও সুন্দর জীবনের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। 

সংগঠনটি আশা করে, তাদের এই প্রচেষ্টা সবার জন্য অনুপ্রেরণা হবে এবং সরকারসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের পাশে দাঁড়াবে, যাতে এই শিশুরা আর কখনো ভিক্ষাবৃত্তি করতে বাধ্য না হয়।  

ফরিদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসরাত জাহান জানিয়েছেন, যাযাবর বেদে সম্প্রদায় জন্ম নিবন্ধন না থাকায় বিভিন্ন সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাদের পাশে দাঁড়াতে উপজেলা প্রশাসন এরই মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণ করেছে।

ইউএনও আরও জানান, বর্তমানে শিক্ষা ও মেডিকেল ক্যাম্পের মতো সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা না থাকলেও, বেদে সম্প্রদায়ের কল্যাণে কাজ করার ব্যাপারে তিনি আশাবাদী এবং তাদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন। তিনি এই কাজে আগ্রহী বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।

এছাড়াও, যদি বেদে সম্প্রদায়ের সদস্যরা জন্ম নিবন্ধন ও নাগরিকত্ব পেতে আগ্রহী হন, তবে প্রশাসন তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।

বেদেদের এই বঞ্চনা দূর করতে এবং তাদের হয়রানিমূলক ভিক্ষাবৃত্তির অবসান ঘটাতে প্রশাসনের আশ্বাস এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রচেষ্টা এক নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। সম্মিলিত উদ্যোগে হয়তো তাদের সামাজিক অবক্ষয় দূর হবে এবং নতুন প্রজন্ম মূলধারার সমাজে ফিরে আসার সুযোগ পাবে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়