রাজধানীর বসুন্ধরায় একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে সেটিকে ভেজাল মদ তৈরির কারখানা বানিয়ে ফেলা একটি চক্রের তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।
পৃথক অভিযানে রাজধানীর ওয়ারীর এক বাসায় মাদক ‘কুশ’ উৎপাদনের খোঁজও পেয়েছে অধিদপ্তর। ওই বাসায় পাওয়া ‘ল্যাবে’ এ মাদক তৈরি করা হত, যেটির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা হত বিদেশ থেকে।
বৃহস্পতিবার বিকালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে সংস্থার পরিচালক (অপারেশনস) মো. বশির আহমেদ এ দুই অভিযানের তথ্য দেন।
অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মেহেদী হাসান ও সহকারী পরিচালক মোস্তাক আহমেদের নেতৃত্বে গত বুধবার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সেখানে ভেজাল মদ তৈরির পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো ও সরঞ্জামসহ বিপুল পরিমাণ অবৈধ মদ, ভেজাল মদ তৈরির রাসায়নিক উদ্ধার করা হয়। এসময় রিপন হিউবার্ট গোমেজ (৪৮) ও আবদুর রাজ্জাক (৪০) নামে দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরে তাদের তথ্য অনুযায়ী জোয়ার সাহারার একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে মজুত করা মদ ও সরবরাহসংক্রান্ত আলামত উদ্ধার করার পাশাপাশি ডমিনিক পিরিছ (৩৭) নামের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মেহেদী হাসান বলেন, চক্রটি ভারত থেকে অবৈধ পথে সংগ্রহ করা বিভিন্ন বিদেশি মদ ব্যবহার করে সেগুলোতে রাসায়নিক মিশিয়ে (টিউনিং) ভেজাল মদ তৈরি করত। পরে দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বোতলে ভরে সিল ও স্টিকার লাগিয়ে বাজারজাত করত।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, এ দুই জায়গা থেকে ৭৯ বোতল মদ, ১৬৬ ক্যান বিয়ার এবং ১৩২ লিটার ভেজাল মদ তৈরির বিভিন্ন রাসায়নিক উদ্ধার করা হয়।
ওয়ারীর বাসায় ‘কুশ’ ল্যাব
সংবাদ সম্মেলনে পরিচালক বশির আহমেদ বলেন, দেশের বাইরে ইয়াবা পাচারের চেষ্টার সময় অধিদপ্তরের গোয়েন্দা নজরদারির মধ্যে গাজীপুরের টঙ্গীতে একটি কুরিয়ার সার্ভিসের কার্যালয়ে গত ৩ জানুয়ারি অভিযান চালানো হয়। সেখানে সন্দেহজনক একটি পার্সেল জব্দ করে বেশ কিছু ইয়াবা পাওয়া যায়। সেই সূত্র ধরে একজন নারীকে শনাক্ত করা হয়।
পরে রাজধানীর খিলগাঁও এলাকায় অভিযান চালিয়ে সুমেহরা তাসনিয়া ওরফে তাসনিয়া হাসান (২০) নামের ওই নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রে থাকা তৌসিফ হাসান (২২) নামে এক বন্ধুর জন্য তিনি ইয়াবা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পাঠাচ্ছিলেন।
পরে ওয়ারীতে তৌসিফের বাসায় মাদক কুশ চাষের তথ্য দেন ওই নারী। সেখান থেকে বাসার তত্ত্বাবধায়ক রাজু শেখকে (৩৯) গ্রেপ্তার করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক রাজু মাদক সংগ্রহ ও সরবরাহে সহায়তা করত। পরে ওই ফ্ল্যাট থেকে বিশেষ পদ্ধতিতে ল্যাবে চাষ করা এবং অঙ্কুরিত ‘কুশ প্ল্যান্ট’, চাষের সরঞ্জাম, ২০ গ্রাম কুশ, এটির বীজ, ক্যানাবিনয়েড রেজিন, সীসা ও তা সেবনের সরঞ্জামসিহ মদ ও ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।
এ সময় ওই ফ্ল্যাটে কুশ চাষের জন্য কৃত্রিম আলো, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের যন্ত্রপাতিও দেখতে পান কর্মকর্তারা।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ইংরেজি মাধ্যমে লেখাপড়া করা তৌসিফ উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। সেখান থেকেই
নিজের ফ্ল্যাটে ল্যাব তৈরি করে মাদক ‘কুশ’ উৎপাদন করতেন। মাদক উৎপাদন ও সংরক্ষণের একটি গোপন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। এক্ষেত্রে তাকে সহায়তা করত সুমেহরা তাসনিয়া।
তৌসিফ ইন্টারনেট নির্ভর দূরনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তির মাধ্যমে কুশ চাষের কার্যক্রম তদারকি করতেন বলে জানান মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা বশির আহমেদ।
তিনি বলেন, “বাসার ছাদে টিন ও ফয়েল পেপার দিয়ে তৈরি একটি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত বিশেষ ঘরে একাধিক টবে কুশ গাছ চাষ করা হচ্ছিল। তার সহযোগীরা স্থানীয়ভাবে মাদক সংরক্ষণ, পরিচর্যা ও পরিবহনের কাজে যুক্ত ছিলেন।”
বিদেশে থাকা ওই যুবককে ফিরিয়ে আনতে পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি এ চক্রের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত আছে কি না তা তদন্ত করে দেখা হচেছ বলে তুলে ধরেন তিনি।
এ ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং উদ্ধার করা আলামত রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম