প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ফারুক মঈনউদ্দীন: আমাদের পাকিস্তানপ্রেম ও পাকভারত সম্পর্ক

ফারুক মঈনউদ্দীন : এখন থেকে ২৯ বছর আগে ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেটে যখন পাকিস্তান চ্যাম্পিয়ন হয়, তখন ঢাকার একশ্রেণির সংবাদপত্রে (২৬ মার্চ তারিখের স্বাধীনতা দিবস সংখ্যা হওয়া সত্ত্বেও) ব্যানার হেডলাইন দিয়ে এমন সব আবেগ-থরথর সংবাদভাষ্য ছাপা হয়েছিল, সেটা পড়ে ‘ভোরের কাগজ’-এ “বিশ্বকাপ ক্রিকেট ও পাকিস্তান প্রেম” শিরোনামে একটা লেখা লিখেছিলাম , লেখাটা খুঁজে পেলাম না। তাই মাত্র কয়েকদিন আগে ঢাকার মাঠে পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের টি টোয়েন্টি ম্যাচে পাকিস্তানী পতাকা নিয়ে নৃত্য করা এদেশীয় পাকিস্তানপ্রেমীদের উদ্দেশ্যে ‘প্রথম আলো’তে আমার নিয়মিত কলাম ‘মুম্বাইর চিঠি’ থেকে প্রাসঙ্গিক অংশবিশেষ উদ্ধৃত করছি। ফেসবুক থেকে

“প্রায় দেড় যুগ পর ২০০৪ সালে পাকিস্তানের মাটিতে ভারতীয় ক্রিকেট দলের সফরসূচির উদ্বোধনী এক দিনের ম্যাচটি যেদিন হয়, সেদিন ছিল শনিবার। মুম্বাইতে এমনিতেই শনিবারে রাস্তাঘাটে ট্রেনে-বাসে লোকসমাগম কম থাকে। সেদিন স্বাভাবিকের চেয়ে লোকজনের চলাফেরা আরও একটু কম মনে হচ্ছিল। ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচ উপলক্ষে লোকজন কাজকর্ম ফেলে টিভি সেটের সামনে বসে থাকবে, তেমন শহর মুম্বাই নয়। কলকাতার কথা আলাদা, সেখানকার লোকজন রাজনীতি ও ক্রিকেট বলতে অজ্ঞান। কিন্তু মুম্বাই হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য, টাকাপয়সার শহর। এখানে সরস্বতীর চেয়ে লক্ষ্মীর আরাধনা বেশি।

এবার মনে হলো মুম্বাইবাসী হয়তো একটু বেশি মনোযোগী হয়েছে। হতে পারে সেটা বহু আলোচিত ও প্রতীক্ষিত ভারতীয় দলের পাকিস্তান সফরের কারণে। কিংবা হয়তো সেদিন শনিবার বলে কাজের চাপ কম ছিল। বিভিন্ন নামীদামি রেস্তোরাঁ বড় পর্দায় লাইভ খেলা দেখার ব্যবস্থা করে খদ্দের আকর্ষণ করার জন্য বিজ্ঞাপন দিয়েছে কাগজে।

সেদিন মুম্বাইর নিরাপত্তাব্যবস্থায় সারা শহরে বিশেষ পুলিশ পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, বিশেষভাবে স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে। বলা বাহুল্য, এই স্পর্শকাতর এলাকাগুলো মুসলমানঅধ্যুষিত। নগরীর সবচেয়ে বড় মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকা মোহাম্মদ আলি রোড এবং ভেন্ডিবাজারে ছিল রায়ট পুলিশের বড়সড় বন্দোবস্ত। এখানে পুলিশি পাহারার উদ্দেশে নিয়োজিত বাহিনীর সমাগমকে ‘বন্দোবস্ত’ বলা হয়।

বিকেল হতে হতে শহর প্রায় ফাঁকা হয়ে আসে। ততক্ষণে ভারতীয় টিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তাদের সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড তৈরি করে ফেলেছে। সিনেমা হলগুলো ফাঁকা, অনেক অফিস ও কল-কারখানায় আগেভাগে ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়েছে। ট্যাক্সিওয়ালারা সওয়ারি না পেয়ে বিরক্ত ও হতাশ। কিন্তু পুলিশ কর্তৃপক্ষ কোনো ঝুঁকি নিতে নারাজ, তাই প্রায় জনশূন্য রাস্তায় এবং বিশেষ বিশেষ এলাকায় বসিয়ে রেখেছে পুলিশি প্রহরা। এমনকি রাজনীতি ও সাম্প্রদায়িকতা-নিস্পৃহ কাফ প্যারেড-সংলগ্ন জেলেবস্তির সামনের মোড়েও দেখা গেছে কয়েকজন পুলিশ প্লাস্টিকের চেয়ার পেতে বসা। এতদিন পর ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট যুদ্ধের সরাসরি সম্প্রচার দেখা থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে কিছুটা বেজারও বোধ করি।

এত নিখুঁত পুলিশি প্রহরা বসানোর পেছনে কর্তৃপক্ষের মনে কী ধরনের আশঙ্কা কাজ করছিল, কে জানে। ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচকে উপলক্ষ করে কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে, সেটাও নিশ্চয়ই ভাবা যায় না। কারণ, ভারতীয় মুসলমানরা ধর্মে মুসলমান হলেও জাতীয়তায় ভারতীয়, তাই ওরা গর্ব করে বলতে পারে, ‘দিল হ্যায় হিন্দুস্তানি’।

১৯৯২ সালের বিশ্বকাপে যখন পাকিস্তান চ্যাম্পিয়ন হয়, তখন ঢাকার একশ্রেণির সংবাদপত্রে (২৬ মার্চ তারিখের স্বাধীনতা দিবস সংখ্যা হওয়া সত্তে¡ও) ব্যানার হেডলাইন দিয়ে এমন সব আবেগ-থরথর সংবাদভাষ্য ছাপা হয়েছিল, যা পড়ে মনে হচ্ছিল পাকিস্তানের কোনো কাগজের বাংলা অনুবাদ পড়ছি। বাড়াবাড়ির একপর্যায়ে একজন বুদ্ধিজীবীতো(?) এটাকে ‘ইসলামি উম্মাহর বিজয়’ বলেও আখ্যায়িত করেছিলেন। আজ যখন দুই চিরশত্রæ ভারত ও পাকিস্তান ক্রিকেট দিয়ে সম্পর্কোন্নয়ন শুরু করেছে, তখন ভাবতে হবে বাংলাদেশের পাকিস্তানপ্রেমীরা এই নতুন মেরুকরণকে কী চোখে দেখবে। মুম্বাইতে বিনোদন শিল্পবিষয়ক বার্ষিক সম্মেলন ফ্রেমস ২০০৪-এ এবার ৩৮ বছরের মধ্যে প্রথমবার সরকারিভাবে যোগ দিয়েছেন পাকিস্তানের চলচ্চিত্রশিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিত্ববর্গ।

সেদিন রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনার পর পাকিস্তান ধাওয়া করেও যখন ভারতকে ধরতে পারে না, ভারত পাকিস্তানকে এক বলে ছয় রানে ১৯৮৬ সালে জাভেদ মিঁয়াদাদের কীর্তির পুনরাবৃত্তি করতে দেয় না, তখন মুম্বাইর আকাশে ছড়িয়ে যায় আতশবাজির বিচ্ছুরণ। চারপাশ থেকে ভেসে আসে পটকা ফোটার শব্দ। মুসলমান-অধ্যুষিত ‘স্পর্শকাতর’ এলাকার লোকজনও বিজয়ের আনন্দে শামিল হয়। দীর্ঘ শ্মশ্রুমণ্ডিত মধ্যবয়সী মুসলমান লোকটিও বাজি ফোটানোর আনন্দে মেতে ওঠে। পরদিন ভারতের পত্রপত্রিকায় বিজয় মিছিলে মুসলমানদের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণের বহু ছবি ছাপা হয়েছে। ব্যাপারটা নিয়ে পত্রপত্রিকার এই অতিসচেতনতার কারণটি সহজবোধ্য। তবু মুম্বাইর বিশাল মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকজনের এই অনাবিল আনন্দ দেখে উপলব্ধি হয় ‘ফিরভি দিল হ্যায় হিন্দুস্তানি’।”

শাসসুর রাহমান এইসব পাকিস্তানপ্রেমীদের কথা ভেবেই লিখে গিয়েছিলেন,
“আজ এখানে দাড়িয়ে এই রক্ত গোধূলিতে অভিশাপ দিচ্ছি।
হত্যাকে উৎসব ভেবে যারা পার্কে মাঠে ক্যাম্পাসে বাজারে
বিষাক্ত গ্যাসের মতো মৃত্যুর বীভৎস গন্ধ দিয়েছে ছড়িয়ে,
আমি তো তাদের জন্য অমন সহজ মৃত্যু করি না কামনা।”

সর্বাধিক পঠিত