শিরোনাম
◈ অল্প সময়ে বেশি ফলন, কৃষকের আগ্রহ বাড়ছে মুড়িকাটা পেঁয়াজে ◈ শুধু সনদনির্ভর শিক্ষা নয়, গবেষণা ও প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ জনশক্তি গড়তে হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ◈ জাতীয় সংসদ ভবনে সোলার প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে একাধিক সুপারিশ কমিটির ◈ মাইকিং করে বাণিজ্যমেলার মাঠে ভাঙচুর, ভেকু দিয়ে গেট ভাঙছেন শেকৃবি শিক্ষার্থীরা: মাঠ বিশ্ববিদ্যালয়কে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি ◈ মোটরসাইকেলের সামনের অংশে নম্বরপ্লেট নিয়ে যে নতুন সিদ্ধান্ত ◈ এবার বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড আড়াই ঘণ্টা পোশাক শ্রমিকদের অবরোধ ◈ জাতীয় নিরাপত্তা শুধু সামরিক প্রস্তুতি নয়, প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান: রাষ্ট্রপতি ◈ মেসি জাদুতে জয়, চ্যাম্পিয়ন্স কাপে ইন্টার মায়ামি ◈ পোশাকশিল্পে অস্থিরতায় ক্রয়াদেশ হারানোর শঙ্কা, ভাঙচুরে ভাড়াটে লোক ব্যবহারের অভিযোগ; ২৪ ঘণ্টায় আন্দোলন বন্ধের আশ্বাস, গ্রেপ্তার নেতাদের মুক্তি দাবি ◈ আজ রাতেই অন্ধ্র উপকূলে আঘাত হানতে যাচ্ছে ঘূর্ণিঝড় ‘মুরাসু’, বাংলাদেশের ৪ সমুদ্রবন্দরে ২ নম্বর সতর্ক সংকেত

প্রকাশিত : ২০ নভেম্বর, ২০২১, ০৪:০৬ সকাল
আপডেট : ২০ নভেম্বর, ২০২১, ০৪:০৬ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

শিশুর ওপর অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োগ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে দক্ষিণ এশিয়ায়

অনলাইন ডেস্ক: অতিব্যবহার ও অপব্যবহারে কার্যকারিতা হারাচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক। রোগ সংক্রামক জীবাণুগুলো হয়ে উঠছে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম বড় এ সংকটকে বিশেষজ্ঞরা অভিহিত করছেন অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) হিসেবে। বিশ্বব্যাপী ক্রমেই প্রকট হয়ে ওঠা এ সংকট এখন দেশে দেশে চিকিৎসা খাতসংশ্লিষ্টদের মাথাব্যথার বড় কারণ হয়ে উঠেছে। তবে এর মধ্যেও বিশ্বব্যাপী অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বেড়ে চলেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় এ ব্যবহার বৃদ্ধির প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।

অ্যান্টিবায়োটিকের অতিব্যবহার ও অপপ্রয়োগ সবচেয়ে বেশি দেখা যায় শিশুদের ওপর। যদিও শিশুদের ওপর অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের বিষয়ে বরাবরই সতর্কতা অবলম্বনের কথা বলে এসেছেন বিশেষজ্ঞরা। আবার বিশেষজ্ঞের ব্যবস্থাপত্রে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার-সংক্রান্ত যথাযথ পরামর্শ থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই কোর্স শেষ করা হচ্ছে না। এতে সংক্রমণ ঘটানো জীবাণুগুলো হয়ে উঠছে শক্তিশালী। দেশে-বিদেশে শিশুদের দেহে সংক্রমণ ঘটানো জীবাণুর অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে ওঠার তথ্য প্রায়ই নানা মাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে।

গত দুই দশকে বিশ্বব্যাপী পরিচালিত বিভিন্ন সমীক্ষা ও জরিপের তথ্যের ভিত্তিতে গবেষণা চালিয়ে গ্লোবাল রিসার্চ অন অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (জিআরএএম) প্রকল্পের বিশেষজ্ঞরা দেখতে পেয়েছেন, এ সময়ের মধ্যে বিশ্বব্যাপী শিশুদের (পাঁচ বছরের কম বয়সী) ওপর অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োগ বেড়েছে ৪৫ দশমিক ৯ শতাংশ। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বৃদ্ধির প্রবণতা উচ্চ আয়ের দেশগুলোর চেয়ে অনেক বেশি। এ দুই দশকে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ৭৬ শতাংশ। এর মধ্যে আবার সবচেয়ে এগিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো। এ অঞ্চলে দুই দশকে শিশুদের ওপর অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ বেড়েছে প্রায় ১১৬ শতাংশ। ল্যান্সেট প্ল্যানেটারি হেলথ জার্নালে এ গবেষণার তথ্য প্রকাশ হয়েছে।

বিশ্বের ২০৪টি দেশে ২০০০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত পরিচালিত বিভিন্ন সমীক্ষা ও জরিপের তথ্য এ গবেষণায় ব্যবহার করা হয়েছে। স্পেশাল মডেলিং স্টাডি পদ্ধতিতে পরিচালিত এ গবেষণায় সব মিলিয়ে মোট ২০৯টি জরিপের তথ্য সন্নিবেশিত হয়েছে। এর মধ্যে এসব জরিপের তথ্য থেকে মোট ২ লাখ ৮৪ হাজার ৪৫ শিশুর পরিসংখ্যান ব্যবহার করেছেন গবেষকরা। এসব শিশুর সবাই শ্বসনতন্ত্রের নিম্নাংশের সংক্রমণে ভুগেছে। এছাড়া গবেষণায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), যুক্তরাষ্ট্রের আইকিউভিআইএ জরিপ, ইউরোপিয়ান সার্ভেইল্যান্স অব অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল কনজাম্পশন নেটওয়ার্ক (ইএসএসি-নেট), বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন উৎসে পাওয়া নানামুখী তথ্যও ব্যবহার করা হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় এএমআর পরিস্থিতি এখন উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। শিশুসহ সব বয়সের মানুষের ক্ষেত্রেই অ্যান্টিবায়োটিকের অতিব্যবহার ও অপব্যবহার দেখা যায়। ল্যান্সেটে প্রকাশিত গবেষণায়ও উঠে এসেছে, ২০১৮ সালে বিশ্বব্যাপী মোট প্রয়োগকৃত অ্যান্টিবায়োটিকের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি প্রয়োগ হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ায়। বিশেষ করে বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার এখন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যথানিয়মে অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স শেষ করে না ৪১ শতাংশ রোগী। তাদের মধ্যে বড় একটি অংশ শিশু। এছাড়া অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক যথেচ্ছ প্রয়োগের প্রবণতাও রয়েছে অভিভাবকদের মধ্যে।

শিশুদের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকসহ যেকোনো ওষুধ প্রয়োগে খুবই সংবেদনশীল হতে হয় বলে মন্তব্য করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) শিশু বিভাগের অধ্যাপক ডা. সুরাইয়া বেগম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ও গাইডলাইন মেনে প্রয়োগ করলে কোনো সমস্যা হয় না। যেমন শিশুদের লোয়ার রেসপিরেটরি ট্র্যাক্ট ইনফেকশনের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের গাইডলাইন মেনে চললে সমস্যা নেই। কিন্তু আমাদের দেশে ওষুধের দোকান থেকে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এছাড়া নানাভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের অপপ্রয়োগ হয়। এতে জীবাণুগুলোর অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী সক্ষমতা তৈরি হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অ্যান্টিবায়োটিক নয়, দেশে সব ধরনের ওষুধের অপ্রয়োজনীয় সেবন বেশি হচ্ছে। এর প্রধান কারণ দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট। দেশে শিক্ষার হার বাড়লেও তার সঙ্গে প্রাত্যহিক জীবনের দূরত্ব রয়ে গিয়েছে। রোগ প্রতিরোধ বা চিকিৎসার চেয়ে ওষুধের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে মানুষের। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ নিজে বা পরিবারের শিশুসহ অন্য কেউ অসুস্থতা বোধ করলে চিকিৎসকের কাছে যায় না। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের মধ্যে ওষুধের দোকানে গিয়ে সমস্যার কথা বলে ওষুধ নিয়ে আসার প্রবণতা দেখা যায়। এক্ষেত্রে তাদের অসচেতনতার পাশাপাশি বিক্রেতাদের অসাধু মনোভাব দায়ী। অনিয়ন্ত্রিত বিক্রি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর তদারকির দুর্বলতার সুযোগে অ্যান্টিবায়োটিকের এমন প্রয়োগ ঘটছে। এতে শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা যেমন কমে যাচ্ছে, তেমনি তৈরি হচ্ছে নানা রোগের ঝুঁকিও।

এ বিষয়ে বিএসএমএমইউর ইন্টারনাল মেডিসিনের সাবেক অধ্যাপক ডা. মো. জিলন মিঞা সরকার বণিক বার্তাকে বলেন, অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি করা হয়েছিল বিশেষ কারণে। তবে এখন এর প্রয়োগের চেয়ে অপপ্রয়োগই বেশি হচ্ছে। অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং কোর্স শেষ না করার কারণে ওষুধের কার্যকারিতা কমে যায়। বারবার ব্যবহারের কারণে জীবাণুর অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে। আগে যে অ্যান্টিবায়োটিক শরীরে কাজ করত, বারবার প্রয়োগের কারণে তা অনেক ক্ষেত্রেই অকেজো হয়ে পড়ছে। এছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কোর্স সম্পূর্ণ না করাও অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরির অন্যতম কারণ।

নিয়ম অনুযায়ী চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক কিনতে পারার কথা নয়। কিন্তু ওষুধ কোম্পানিগুলোর বিপণন কৌশল এবং বিক্রেতাদের অসচেতনতা ও অসাধুতার কারণে যে কেউ চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক কিনতে পারছে। এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর তদারকি বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ।

তিনি বলেন, অ্যান্টিবায়োটিকের অযৌক্তিক ব্যবহার রোধে কর্তৃপক্ষকে শক্তিশালী হতে হবে। বিশ্বের কোথাও দোকান থেকে ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক কেনা যায় না। বাংলাদেশে এটা প্রতিনিয়তই ঘটছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ায় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাচ্ছে। ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনের তুলনায় বেশি উৎপাদন করছে এবং চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্টদের দিয়ে বিপণনের নানা কৌশল নিচ্ছে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হাসপাতালগুলোয় এখন রোগ নির্ণয় ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক দেয়ার ঘটনাও ঘটছে।

এ স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদের ভাষ্যমতে, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সক্ষমতাও কম। বিশেষায়িত কমিশনের মাধ্যমে ওষুধের মতো জরুরি বিষয় দেখভাল করতে হবে। এক্ষেত্রে কমিশনটি হতে হবে উচ্চপর্যায়ের, স্বতন্ত্র এবং স্বাধীনভাবে কাজ করতে সক্ষম। শক্তিশালী কমিশন হলে প্রভাবশালী কেউই এতে খবরদারি করতে পারবে না।

নানা মাধ্যমে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি হয় প্রায় ৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকার। দেশের বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রীত ওষুধের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের অবস্থান দ্বিতীয়। এসব ওষুধের অপপ্রয়োগ ও অনিয়ন্ত্রিত প্রয়োগের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি ও স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের জাতীয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব।

তিনি বলেন, এ বিষয়ে চিকিৎসকদের যেমন দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি সরকারেরও দায়িত্ব রয়েছে। যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারাটাই এখন অ্যান্টিবায়োটিকের অপপ্রয়োগ ও অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স প্রতিরোধের একমাত্র উপায়। বিষয়টি নিয়ে অনেক সেমিনার বা সম্মেলন হলেও কোনো বাস্তবায়ন নেই। সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই অ্যান্টিবায়োটিকের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অ্যান্টিবায়োটিকের অপপ্রয়োগ বা অনিয়ন্ত্রিত প্রয়োগের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার বিকল্প নেই। অনেক সময় কোর্স শেষ না করা বা অর্ধেক কোর্স চিকিৎসক লেখেন, যাতে মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি হয়। কেননা এতে ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস হয় না। এক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়া ধ্বংসের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক দেয়া হয় ঠিকই। কিন্তু অপর্যাপ্ত প্রয়োগের কারণে সমস্যা আরো বেড়ে যায়। -বণিক বার্তা

  • সর্বশেষ