প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভূঁইয়া আশিক রহমান: জীবনে যা করতে পারার কথা তা পেরেছি, চেষ্টা করে গেছি, ফাঁকি দিইনি, আমার কোনো আফসোস নেই

ভূঁইয়া আশিক রহমান: [২] তিন বছর আগে এ প্রতিবেদকে দেওয়া মুঠোফোন সাক্ষাৎকারে ‘আগুনপাখি’খ্যাত সদ্যপ্রয়াত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক বলেছিলেন, আমার কোনো আফসোস নেই, অহংকারও নেই। জীবনে কী করতে পেরেছি বলতে পারবো না, তবে যতোটুকু সম্ভব ছিলো করেছি। চেষ্টা করে গেছি। খুব একটা ফাঁকি দিইনি, এটা বলতে পারি। আমাকে দিয়ে কার কী উপকার হয়েছেÑ যারা পাঠক, আমার কাছের মানুষ তারা বলতে পারবেন। জীবনটাকে আমি এমনিই কাটিয়ে দিলাম। লেখালেখিটাকে আমি সেকেন্ড প্রফেশন করিনি।

[৩] জীবনে যা করতে পারার কথা, সেসব আমি করতে পেরেছি। আর যা করতে পারার কথা নয়, আমার সাধ্যের বাইরে ছিলো, তা করা হয়নি। যা করতে চেয়েছিলাম ঠিক তা, তেমনটিই হবে কী করে? কারও হয়েছে কোনোদিন? মানুষের পক্ষে তা সম্ভব? মানুষ কি চাইলেই তার ঠিক ঠিক চাওয়া অনুযায়ী সব সম্ভব করতে পারে?

[৪] হাজার বছরের সাহিত্য আছে। পৃথিবীর সাহিত্য কিছু পড়েছি, আমাদের সাহিত্যও কিছু পড়েছিÑ কে কোথা থেকে কোন ফাঁকে মনের জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে গেছে, সেকি আর বলতে পারবো! তবে প্রত্যেক্ষভাবে ওমুকের মতো করে আমি লিখি, তা মনে হয় না। তবে যখন ১০ বছর বয়স, তখন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে অনুসরণ করার চেষ্টা হয়তো ছিলো। কেউ শরৎ চন্দ্রকে অনুসরণ করার চেষ্টা করে, কেউ রবীন্দ্রনাথকে অনুকরণ করার চেষ্টা করে, সবার ব্যাপারেই এটা হয়। একটা সময় এসে মানুষ স্থির হয়। যখন স্থির হয়েছি তারপর থেকে আমি আর সেভাবে কাউকে গুরু মানিনি। লেখা পছন্দ হয় অসংখ্য মানুষের, কিন্তু আমার একদম সঠিক কোনো গুরু নেই।

[৫] প্রচুর বই আছে, যা আমাকে খুব টানে। এক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্পগুচ্ছই তো আমি বারবার পড়ি। রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলা পড়তে ইচ্ছে করে, তাও পড়ি। বাছাই করা কবিতাগুলো পড়ি। রবীন্দ্রনাথের নাটক আমি কম পড়েছি। তার প্রবন্ধও পড়িÑ মোটকথা রবীন্দ্রনাথের সবকিছুই আমি পড়ার চেষ্টা করি। তার কাছ থেকে আমি কিছু পাই, লোকসান হয়, তা না! মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ আছে। এর বাইরে অনেক বই আছে তার, যা কখনো কখনো আমি পড়ি। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় আছেন, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় আছেন, সতীনাথ ভাদুড়ী আছেন, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ আছেন। যে কাজটা হয় না সেটাই সব থেকে বড় হয়ে থাকে, এটাও মানুষের স্বভাব। আঙুল ফল যতো ওপরে ততোই লাফাতে থাকবে মানুষ। তবে আঙুল ফল টক, এই বলে চলে যাওয়াটা আমার স্বভাবে নেই। আমি কী অর্জন করেছি তা পাঠক বিবেচনা করবেন, তোমরা বিবেচনা করবে। আমি কেন আমার অর্জনের কথা ঘুরে ঘুরে বলে বেড়াবো।

[৬] বাংলা ভাষার ব্যবহার, মর্যাদার কথা বলতে গেলে তো হতাশার কথাই বলতে হয়। আমরা কথায় কথায় বলে থাকি, পৃথিবীতে একমাত্র অথবা অতিশয় বিরল একটি মাত্র রাষ্ট্র, যার ভিত্তি হচ্ছে ভাষা। এই বাংলা ভাষাটাই হচ্ছে এ রাষ্ট্রের মূল ভাষা, আর কোনো ভাষা নেই। এতো বিশুদ্ধভাবে একটা বিশেষ ভাষাকে অবলম্বন করে একটি রাষ্ট্র দাঁড়িয়েছে, এমন নজির পৃথিবীতে নেই। এ রকম নজির যেমন পৃথিবীতে নেই, আবার এ রকম একটা অর্জনের পরে সেই ভাষা নিয়ে আমরা শুধু গলাবাজি করেছি। কিন্তু ভাষার জন্য আমরা তেমন কিছু করিনি। বাংলা একাডেমিতে অল্পকিছু কাজ হয়েছে, তাছাড়া আমরা আর বিশেষ কিছু করিনি।

[৭] এখনো পর্যন্ত আদালতে, রায় লেখায়, সুপ্রিম কোর্টের বিচারব্যবস্থায় সচিবরা নোটটোট দেন, সেখানে এক বা আধ লাইন লিখতে হয় বাংলায়। অথবা ইংরেজিতেই করা হয়। গোটা বাংলাদেশের কথা ছেড়ে দিলাম, শুধু ঢাকা শহরে যে অজস্র দোকান আছে, তাদের সাইনবোর্ড কোন ভাষায় লেখা আছে? বাংলা অক্ষরে ইংরেজি অথবা সরাসরি ইংরেজি অক্ষরে লিখেছে, কেউ কেউ বাংলা লিখেছে। এখানে তো রাষ্ট্রের একদম হস্তক্ষেপ দরকার।

[৮] চীনে একটা ইংরেজি জানা লোকও নেই। আমার এক মেয়ে চীনে থেকেছে। সে বলে, চাচাÑ বাইরে গিয়ে ইংরেজিতে কথা বলার উপায় নেই। ওদের ভাষাও তো আমরা জানি না। আমার ছেলে গিয়েছিলো জাপানে। সেখান থেকে ও ডিগ্রি অর্জন করে এসেছে। সে বললো, ওখানে ইংরেজি কেউ জানে না। নিজের ভাষা নিয়ে ওদের মধ্যে অনেক অহংকার। ইংরেজি জানে না বলে কি ওরা পশ্চিমা দেশগুলো থেকে পিছিয়ে আছে? চীন কি যুক্তরাষ্ট্রের পেছনে পড়ে আছে? তা তো নেই।

[৯] সাধারণ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে। তাদের সেই ভাষার প্রচুর উপভাষা আছে। প্রচুর কথ্য ভাষা রয়েছে। এক জায়গার ভাষার সঙ্গে অন্য জায়গার ভাষার কোনো মিল নেই। এটা একা বিচিত্র ব্যাপার। এ রকম পৃথিবীর সব ভাষাতেই আছে। কেউ যদি ইংল্যান্ডে যান, তাহলে দেখতে পাবেন যে, সেখানে এক পাড়ার ভাষার সঙ্গে আরেক পাড়া লন্ডন শহরের ঠিক এক রকম নয়। আবার ইংল্যান্ডের পূব বা পশ্চিমের দেশগুলো একদম আলাদা। দক্ষিণেও আলাদা। ফ্রান্সের দিকে গেলেও দেখা যাবে আলাদা। ইংলিশ চ্যানেল পার হতে একঘণ্টা লাগে। ইংলিশ চ্যানেল পার হয়ে প্যারিসে গেলে একটা লোককে দিয়েও একটা ইংরেজি বাক্য বলাতে পারবেন না। আমার নিজের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, জার্মানির ফ্রাঙ্কফোর্ডে একজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ইংরেজিতে যে, ওমুক পাড়াটা কোথায়? তখন বললো, ইংরেজি জানি, কিন্তু আমরা কেউ ইংরেজিতে কথা বলবো না! ভাষা নিয়ে আমাদের সেই গর্ব, সেই অহংকার নেই।

[১০] ভাষা নিয়ে ভালোবাসা একটা শব্দমাত্র। ভালোবাসতে গেলে দেশকে অনেককেই ছাড়াতে হবে। এই বাংলাদেশে তাহলে পাঁচ ভাগ বা দশ ভাগ বড়লোক থাকলে চলবে না। ষাট-বাষট্টি ভাগ ভূমিহীন থাকা চলবে না অপরের ভাত মেরে। সংস্কৃতিকেও তো তুমি কব্জা করে রেখেছো। তুমি যখন গান শোনো, খেয়াল শোনো অথবা রবীন্দ্রনাথ-নজরুল যখন শোনো, অন্য পাঁচ কবির গান শোনো তখন জনগণ বুঝতে পারে না তাদের… যায়। রবীন্দ্রসংগীত জনগণ বুঝতে পারবে না। কেন, তুমি কী এমন প্রখর প্রতিভাধর ব্যক্তি, তুমি যা বুঝ, সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবে না। তোমার বাবা, তার বাবা তো ওই রকমই ছিলেন। আমাদের বাপ-দাদারা কি এতো বড় ডিগ্রিওয়ালা লোক ছিলেন? তারা কি বাংলা জানতেন না? আমার বাবার মুখের বাংলা কান পেতে শুনতে হতো। ইংরেজি তো জানতেনই না প্রায়। কিন্তু এতো সুন্দর করে বাংলা বলতেন, যেখানে একটা অন্য শব্দ থাকতো না।

[১১] বাংলা ভাষা অর্জন করেছি বটে, কিন্তু তার মর্যাদা রাখতে পারিনি। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাঙালি সংস্কৃতি, বাংলা ভাষা ঢুকিয়ে দিতে পারিনি। ভাষাকে আমরা শ্রদ্ধা করতে পারিনি। বাংলা ভাষার বেহাল দশা হলে, অন্য ভাষাগুলোর বেলায় কী হবে? সাঁওতালদের ভাষা আছে, আছে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর ভাষাও। এসব ভাষার ক্ষেত্রে আমাদের ভাব কী হওয়া উচিত? তুচ্ছাতাচ্ছিল্য করবো? নাকি যথেষ্ট সম্মান করে এ সমস্ত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিকে সংরক্ষণের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করবো। কোনটা করা উচি আমাদের?

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত